Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রূপায়ণ চাই স্বচ্ছতার সঙ্গে

ক্যান্সার একটি অতিপ্রাচীন মারণ ব্যাধি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, এই রোগ মানুষসৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই আছে। প্রাচীন ফলিস বা জীবাশ্মেই আবিষ্কৃত হয়েছে ক্যান্সার বা কর্কটরোগের অস্তিত্ব।

রূপায়ণ চাই স্বচ্ছতার সঙ্গে
  • ১৭ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ক্যান্সার একটি অতিপ্রাচীন মারণ ব্যাধি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, এই রোগ মানুষসৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই আছে। প্রাচীন ফলিস বা জীবাশ্মেই আবিষ্কৃত হয়েছে ক্যান্সার বা কর্কটরোগের অস্তিত্ব। ক্যান্সারের শিকার কে নয়—গরিব নারী-পুরুষ তো বটেই, রাজপুরুষ, এমনকী অনেক সাধক-মনীষীও। এই কিছুদিন আগেও বলা হতো যে, ‘ক্যান্সার হ্যাজ নো আনসার’—অর্থাৎ ‘ক্যান্সার হওয়া মানেই মৃত্যু অবধারিত’ বলে ধরে নেওয়া হতো। তবে হাত গুটিয়ে বসে নেই মানবসভ্যতা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গেই চলছে ক্যান্সারকে জয় করার লড়াই। এই চ্যালেঞ্জে মানুষ ইতিমধ্যে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। নানাধরনের ক্যান্সারের সফল চিকিৎসা চলছে। ওইসঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ বা টিকাকরণ। ক্যান্সারের চিকিৎসা কতখানি ব্যয়বহুল তা সকলেরই জানা। বস্তুত কোনও পরিবারে একজনেরও দেহে ক্যান্সারের প্রবেশ মানে তাদের সর্বস্বান্ত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওইসঙ্গে উদ্বেগ তো ফ্রি! এর পাশাপাশি যে টিকা মেলে তাও বেশ দামি, সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নয়।   

Advertisement

ভারতে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম মহিলা। কিন্তু ক্যান্সার রোগীর সংখ্যায় মহিলারাই উপরে। মেয়েদের সবচেয়ে বেশি ক্যান্সার হয় স্তন (ব্রেস্ট) এবং জরায়ু-মুখের (সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার)। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সারে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়। তারপরের বিপদটিরই নাম সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার। ভারতকে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের ‘রাজধানী’ বলা চলে। প্রতিবছর বিশ্বে যত মহিলা এই কঠিন অসুখে মারা যান, তাঁদের চারভাগের একভাগই ভারতের বাসিন্দা। ২০২৩ সালে সারা দেশে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন প্রায় ১.২৪ লক্ষ জন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার মহিলার মৃত্যুও হয়। অর্থাৎ এই রোগে আক্রান্ত মহিলাদের বেশিরভাগের পক্ষেই বেঁচে ফেরা সম্ভব হয়নি। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) নামে একধরনের ভাইরাস এই রোগের কারণ। প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা জরুরি এবং ওইসঙ্গে টিকাও নেওয়া দরকার। অপরিচ্ছন্ন জায়গায় শৌচকর্ম এড়িয়ে চলারই পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। এই রোগের ভ্যাকসিন আছে ঠিকই কিন্তু তা এখনও সরকারের সার্বিক টিকাকরণ কর্মসূচির অন্তর্গত নয়। ফলে সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের টিকা মেলে না। জরায়ু-মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি আটকাতে এখন যাঁরা টিকা নিতে ইচ্ছুক তাঁদের নিতে হয় বেসরকারি ব্যবস্থা থেকে। বলা বাহুল্য, বেশিরভাগ গরিব বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের পক্ষে এই টিকা নেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ তাঁদের সংসারে নুন আনতে পানতা ফুরোয় দশা যে কাটেই না। সাধারণ অসুখবিসুখেও তারা সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভরসায় থাকে। ফলে বড় বিপদ এবং বিকল্প ব্যবস্থা আছে জেনেও লক্ষ লক্ষ পরিবার নির্বিকার থাকতে বাধ্য হয়। 
আর এখানেই মিলেছে সুখবর, এই সমস্যার দিন এবার অতীত হতে চলেছে। রাজ্য পরিবার কল্যাণ দপ্তর জানাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার দেশজুড়েই সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের টিকাকরণ শুরু করতে চলেছে। রাজ্যের স্কুলে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের টিকা বিনামূল্যেই দেবে সরকার। এই কর্মসূচি বাংলায় শুরু হবে ২০২৭ সালে। তার প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি। তাই রাজ্যগুলির কাছে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। তবে কোন বয়সসীমা বা কোন কোন ক্লাসের ছাত্রীরা ওই টিকা পাবে, তা এখনও স্থির হয়নি। আশা করা যায়, প্রস্তুতি দ্রুততার সঙ্গেই সেরে ফেলবে প্রশাসন। সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের বিনামূল্যে টিকাকরণ কর্মসূচিও চালু হবে যথাসময়ে। দেখতে হবে প্রত্যেক রাজ্যকেই যেন সমান সুযোগ দেওয়া হয় এবং কোনও উপযুক্ত মেয়ে বাদ না পড়ে। ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’, ‘ডাবল ইঞ্জিন’ নামক গেরুয়া ব্যাধির সংক্রমণ যেন এই মহৎ উদ্যোগের উপর কোনও কালো ছায়া না ফেলে। তাহলে কিন্তু কোটি কোটি মানুষের বিরাট স্বস্তির প্রত্যাশা জলাঞ্জলি যাবে। চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্ধেক মানুষ, যারা সমাজকে দেশকে সবচেয়ে বেশি দেয় নীরবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ