সমৃদ্ধ দত্ত: মুম্বইয়ে ভারতের মধ্যে প্রথম টেসলা ইলেকট্রিক গাড়ির শোরুম চালু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ভারত সরকার উচ্ছ্বসিত। মহারাষ্ট্র সরকারও পাল্লা দিয়ে গৌরবকাহিনি প্রচার করছে। টেসলা হল বিশ্বের সবথেকে খ্যাতনামা বিদ্যুৎ চালিত গাড়ির কোম্পানি। বিশ্বের ধনীতম মানুষ ইলন মাস্কের সংস্থা। কিন্তু টেসলা ভারতে এসেছে, এই বার্তাকে ছাপিয়ে দেশজুড়ে যে চর্চা প্রবলভাবে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, সেটি হল, ট্যাক্স স্ট্রাকচারের একটি চিত্র। টেসলা গাড়ির দাম বেসিক প্রাইস হিসেবে ৩০ লক্ষ টাকা। আর ট্যাক্স ৩১ লক্ষ টাকা! অর্থাৎ ৬১ লক্ষ টাকা বেস প্রাইসের মধ্যে অর্ধেকই যাবে সরকারের কাছে। এই তথ্যটি দেখলে মনে হতেই পারে আমরা আদার ব্যাপারী। আমাদের জাহাজের খবর দিয়ে কী দরকার? আমরা তো আর কিনতে যাচ্ছি না ওসব দামি দামি বিদেশি গাড়ি। বিদেশি গাড়ি যদি অন্য দেশ থেকে এদেশে এক্সপোর্ট করা হয়, তাহলে ভারত সরকার ইমপোর্ট ট্যাক্স নেয়। ইলন মাস্ক বলেছেন, ভারতের এই ট্যাক্স বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের স্বপ্ন একটা ছোটখাটো গাড়ি কেনা। তাও আজীবন হবে কি না জানা নেই। সুতরাং তাদের মোটরবাইক, স্কুটিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু তার মানে কি সেইসব মধ্যবিত্তের গাড়িতে কম ট্যাক্স দিতে হয়? একেবারেই না। দেখা যাক কীভাবে মধ্যবিত্তের রক্ত শোষণ করে নেওয়া হচ্ছে নিরন্তর সামান্য প্রয়োজনের জিনিস কিনতে গেলেও।
১৫০০ সিসি পর্যন্ত যে কোনও গাড়ির জিএসটি ২৮ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কমপেনসেশন সেস। ৩ শতাংশ। দিতে হবে রোড ট্যাক্স। গাড়ি কিনতে গেলে বিমা করাতে হয়। অর্থাৎ তখনও বিমায় প্রতিবার জিএসটি দিতে হয়। কত? ১৮ শতাংশ। একটি গাড়ির দোকানে গিয়ে শুধুমাত্র খোঁজ করতে হবে গাড়ির মূল দাম কত। আর শেষ পর্যন্ত রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে কত টাকা দিতে হয়। বাকি সবটাই চলে যায় সরকারের ঘরে। কিন্তু গাড়ির দামই বা এত কেন? কারণ গাড়ির মধ্যে যে উপকরণগুলি রয়েছে, সেগুলির প্রতিটি যন্ত্রাংশ থেকে জিএসটি আদায় করা হয়। ক্লাচ কেবল থেকে ব্রেক প্যাড, সব ২৮ শতাংশ জিএসটি। এ তো গেল গাড়ির কথা। বাইকে কি কোনও ছাড় আছে? মোটরবাইক তো সিংহভাগ মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারের একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় বস্তু। সকলে যে বিলাসিতার জন্য কেনে তা ভুল ধারণা। প্রয়োজনে কেনে। ৩৫০ সিসি মোটরবাইকের জিএসটি সর্বোচ্চ জিএসটি। অর্থাৎ ২৮ শতাংশ। তারপর ৩ শতাংশ কমপেনসেশন সেস। ৩ শতাংশ। অর্থাৎ যে বড়লোক মানুষ একটি সেডান অথবা এসইউভি কিনছে, আর যে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মোটরবাইক কিনছে, প্রত্যেকের ট্যাক্স একই হারে দিতে হয়।
এই যে মাঝে মধ্যে শোনা যায় জিএসটি রেট র্যাশনালাইজেশন হবে। করাও হয়। এই গালভরা কথাটির মানে কী? মানে হল, কিছু কিছু পণ্যের জিএসটি কমিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু অন্য পণ্যকে ঊর্ধ্বস্তরে জিএসটির আওতায় নিয়ে আসা হয়। অক্সফ্যাম নামক বিখ্যাত সমীক্ষক সংস্থা তাদের রিপোর্টের নাম রেখেছে ‘সারভাইভাল অফ দ্য রিচেস্ট: দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি।’ সেই রিপোর্ট মহাবিস্ময়কর। রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতে আর্থিকভাবে সবথেকে নিম্নস্তরে বাস করে যারা তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ দেশের সরকারকে সবথেকে বেশি জিএসটি দেয়। ৬৪ শতাংশ। এরপরের স্তরের জিএসটি দেয় ৪০ শতাংশ মধ্যবিত্ত। আর ১০ শতাংশ ধনীতম ভারতবাসী জিএসটি দেয় ৩ শতাংশ।
এই যে ৫০ শতাংশ নিম্নবিত্ত সম্মিলিতভাবে সবথেকে বেশি জিএসটি দেয়, তাদের আয়ের সবথেকে বেশি ট্যাক্স দিতে হয় কী ব্যাপারে? খাদ্য ক্রয় করতে।
শহরে তো বটেই, গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়ন ও আধুনিকতার নবতম উদাহরণ এবং ল্যান্ডমার্ক কী? শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স এবং রেস্তরাঁ। যে ঠিকানায় নতুন শপিং মল খোলে, স্থানীয় মানুষ খুব খুশি হয়। ঠিকানা জানাতে বলতে হয় ওই যে দেখবে অ্যাডভার্ট মল, তার পিছনের পাড়ায় চলে আসবে। ঠিক মলের পিছনেই আমাদের বাড়ি। একটু গর্ব অনুভব হয়। এই কারণেই সরকারও চায় সর্বত্র বেশি বেশি শপিং মল খুলুক। ভারতে প্রতি বছরে যত শপিং মল খোলে, সেই সংখ্যায় কি পার্ক কিংবা খেলার মাঠ অথবা সাধারণ মানুষের শরীরচর্চার জন্য কমিউনিটি জিম ইত্যাদি চালু করে কোনও সরকার? করে না। কেন? কারণ শরীর চর্চা মানুষ বেশি করলে নার্সিংহোমে কম ভর্তি হবে। সেগুলির বিলে জিএসটি বিপুল পরিমাণ আসে। হেলথ ইনসিওরেন্সের প্রিমিয়ামের জিএসটি ১৮ শতাংশ। শহর মফস্সলে ভারতের কোনও সরকার নির্বিঘ্নভাবে ফুটপাত ধরে হেঁটে চলার নিশ্চয়তা দেয় করদাতা ভারতবাসীকে? দেয় না। না হাঁটা গেলে কীভাবে যেতে হয়? টোটো কিংবা অটোয়। টোটো এবং অটো এত বেড়ে যায় কেন? কারণ টোটোর লিথিয়াম ব্যাটারি এবং অটোর ডিজেল এবং ইঞ্জিন কম্পোনেন্টের জিএসটি সর্বোচ্চ স্তরে। যত টোটো বিক্রি হবে, তত আয় সরকারের।
আর সর্বোপরি শপিং মল মানেই হল মানুষকে লুট করার ফাঁদ। বেসরকারি সংস্থা লুট করতেই পারে। সে না হয় বোঝা গেল। কিন্তু আসলে তো সরকার লুটছে। কারণ শপিং মলে প্রিমিয়াম গুডস পাওয়া যায়। যে প্রিমিয়াম পণ্যের সিংহভাগ ২৮ শতাংশ অর্থাৎ সর্বোচ্চ জিএসটির আওতায়। শপিং মলে অবশ্যই একটি করে মাল্টিপ্লেক্স থাকে। সেখানে সিনেমা টিকিট এবং কফি পপকর্নের উপরও কত টাকা জিএসটি খোঁজ নিলে আঁতকে উঠতে হবে। রেস্তরাঁয় জিএসটি কত? বিলে চোখ বোলালে আর ইচ্ছা করে না যেতে।
বছরে ভারত সরকারের কাছে জিএসটি সংগ্রহ কত হয়? গড়ে ২২ লক্ষ টাকা। কিন্তু ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না যে, কর্পোরেট, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ কত টাকা জিএসটি দেয় এই ২২ লক্ষের মধ্যে। মনে রাখতে হবে কর্পোরেট ও ব্যবসায়িক সংস্থা যখন ব্যবসার লক্ষ্যে পণ্য ক্রয় করে, তারা ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট দাবি করে সরকারের কাছে। অর্থাৎ একাংশ ফেরত পায়। অতএব আদতে জিএসটির সিংহভাগ অংশ আসছে জনগণের থেকে।
২০১৪ সালে যারা আয়কর দিয়েছে এরকম সাধারণ মানুষেব সংখ্যা কত ছিল? ১ কোটি ৬৯ লক্ষ। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা কত হয়েছে? ৩ কোটি। কিন্তু ছাড় কারা পেয়েছে? ২০১৯ সালে বেস কর্পোরেট ট্যাক্স ৩০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২২ শতাংশ। নতুন কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৫ থেকে কমে হয়েছে ১৫ শতাংশ। তার ফলে কী হয়েছে? কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স আদায়ের তুলনায় সাধারণ করদাতাদের ইনকাম ট্যাক্স দেওয়ার সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে? ২০২০ সালে কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স আদায় হয়েছিল সাড়ে ৫ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সেটা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ১০ লক্ষ কোটি টাকার বেশি।
কিন্তু সাধারণ করদাতাদের ক্ষেত্রে কী হয়েছে? ২০২০ সালে সাধারণ কতদাতাদের থেকে পাওয়া ইনকাম ট্যাক্সের পরিমাণ ছিল ৪ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালে হয়েছে ১১ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ ৭ লক্ষ কোটি টাকা বেশি ইনকাম ট্যাক্স দিয়েছে সাধারণ মানুষ। কোন মানুষ? মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত।
হেয়ার অয়েল, সাবান, টুথপেস্ট, কর্নফ্লেকস, আইসক্রিম। এসব ব্যবহার করতে হলে কি বড়লোক হতে লাগে? সবথেকে বেশি কারা ব্যবহার করে? প্রায় সবাই। অর্থাৎ আম জনতা। অথচ জিএসটি ১৮ শতাংশ। ঘড়ির জিএসটি কত? ২৮ শতাংশ। কেন? কারণ সরকারের তালিকায় ঘড়ি বিলাসদ্রব্য।
এসব নিয়ে আমাদের রাগ হচ্ছে না কেন? প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করে না কেন? কারণ আমাদের সামনে বৃহত্তর দায়িত্ব আছে। আমাদের সদা জাগ্রত থাকতে হয় হিন্দু বনাম মুসলিম নামক রাজনীতির খেলায় কবে আমাকেও অংশ নিতে হবে, সেই আগ্রহে। আমাদের আলমারিতে আলাদা ফাইল রাখতে হয় নাগরিকত্বের একের পর এক প্রমাণ জমা করতে।
আমরা নিজেদের নৈপুণ্যে, স্কিলে ফোকাসড থাকি না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপ্রয়োজনীয় ইস্যুতেই সবথেকে বেশি ব্যস্ত থাকি দিনভর। শুভমান গিলরা কিন্তু এরকম নয়। তাঁরা জানেন তাঁদের উন্নতির শিখরে উঠতে হলে সবদিক থেকে মন ফিরিয়ে নিয়ে শুধুই নিজের বৈশিষ্ট্য ও কাজেই মনোনিবেশ করতে হবে। তাই একটি ডাবল সেঞ্চুরি করেই শুভমান গিলদের ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়! অন্তত ৩৫ কোটি টাকা বার্ষিক এনফোর্সমেন্ট হতে চলেছে তাঁর ওই একটিমাত্র দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে!
সরকার আমাদের জন্য বছরভর নানাবিধ ব্যস্ততা সাপ্লাই করে। কখনও বলে নাগরিকত্বের প্রমাণ দাও। কখনও বলে আইপিএলের টিকিট কাটো! কিন্তু ট্যাক্স ফাঁকি দিও না। রাজকর দেওয়া চাই!