Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মানবসম্পদ সৃষ্টিই সমাধান

জনসংখ্যা নিয়ে জেরবার ভারত। অনেক দশক যাবৎ। জনসংখ্যা হ্রাসের অনেক উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র বিশেষ সফল হয়েছে বলে মনে করে না।

মানবসম্পদ সৃষ্টিই সমাধান
  • ১২ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

জনসংখ্যা নিয়ে জেরবার ভারত। অনেক দশক যাবৎ। জনসংখ্যা হ্রাসের অনেক উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র বিশেষ সফল হয়েছে বলে মনে করে না। তার মধ্যে চীনকে হারিয়ে ‘বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ’-এর তকমাও দখল করেছে। চীনকে অন্যকিছুতে পরাস্ত করতে পারলে ভারত উদ্বাহু নৃত্যই করত, সেখানে এই খেতাবে যার পর নাই বিমর্ষ! এখানেই শেষ নয়, চলতি বর্ষশেষে ভারতের লোকসংখ্যা ১৪৬ কোটি ছাপিয়ে যাবে! জানিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের জনসংখ্যা বিষয়ক দপ্তর ইউএনএফপি। তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে বলছে, ২০২৫-এ মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ থাকবে ০-১৪ বছর বয়সিরা। ১০-১৯ বছর বয়সিদের শতাংশ হার হবে ১৭ এবং ১০-২৪ বছর বয়সি নবীন প্রজন্মের মানুষ থাকবে ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রবীণ নাগরিকের চিত্রটিও ঊর্ধ্বমুখী হিসেবেই দেখানো হয়েছে। কেননা ৬৫ ঊর্ধ্ব জনসংখ্যা হতে চলেছে ৭ শতাংশ। ভারতবাসীর গড় আয়ু বৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে আগামী দশকগুলিতে বয়স্ক মানুষের উপস্থিতি হার চওড়া হবে। চলতি বর্ষের ভিতরে ভারতে পুরুষদের গড় আয়ুষ্কাল হবে ৭১। সংখ্যাটি মহিলাদের ক্ষেত্রে হবে আরও বেশি—৭৪ বছর। 

Advertisement

ভারতের লোকসংখ্যা আগামী ৪০ বছরের মধ্যে ১৭০ কোটি ছোঁবে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, তবে ভারতের জনসংখ্যা ওটাই হবে সর্বোচ্চ। তারপর থেকে এই গ্রাফ হবে নিম্নমুখী। ২০১১ সালের পর ভারতে সেন্সাস হয়নি। তবে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ২০২৩ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা বিষয়ক যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে তাতে শীর্ষস্থান থেকে চীনকে সরিয়ে ভারতকে রাখা হয়। সে-সময় আমাদের দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৪২ কোটি ৮৬ লক্ষ। অর্থাৎ দু’বছরের মধ্যে বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি। তবে সামগ্রিকভাবে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসের বার্তাও দিয়েছে ‘বিশ্ব জনসংখ্যার অবস্থা’ (এসএডব্লিউপি) শীর্ষক রিপোর্ট। প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের পূর্বাভাস রয়েছে রিপোর্টের ‘দ্য রিয়্যাল ফার্টিলিটি ক্রাইসিস’ শীর্ষক অধ্যায়ে। তাতে জন্মবৃদ্ধির হার হ্রাসের দাবি করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, গড় ভারতীয় নারী এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে জনসংখ্যার সামগ্রিক আকার বজায় রাখার জন্য কম সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। ভারতে মহিলা প্রতি প্রজননের হার ২.১ থেকে ১.৯-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ আগে একজন ভারতীয় নারী গড়ে দুটি সন্তানের জন্ম দিতেন। এখন সেই গড় কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯-এ। ভারতে নিযুক্ত ইউএনএফপিএ মুখপাত্র আন্দ্রিয়া এম ওজনার বলেছেন, ‘প্রজনন হার হ্রাসের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। গত শতাব্দীর সাতের দশকেও তা ছিল মহিলা পিছু পাঁচটি সন্তান। সেটা এখন দুইয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কমেছে প্রসূতি মায়েদেরও মৃত্যুহার। তবে বিভিন্ন রাজ্য এবং জাতির মধ্যে সামাজিক বৈষম্যটি লক্ষণীয়।’ এই সমস্যাকে ‘দ্য রিয়েল ফার্টিলিটি ক্রাইসিস’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সন্তানধারণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, দুর্বল স্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাসহ একগুচ্ছ কারণ রয়েছে এর নেপথ্যে। প্রবণতাটি অবশ্য শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, এই ট্রেন্ড বস্তুত সারা বিশ্বের। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায়ও বাতলেছেন তিনি। তাঁর মতে, ‘সঠিক প্রজননের অধিকার এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই হতে পারে এর সুরাহা।’ 
রাষ্ট্রসঙ্ঘ ২০২২-এ জানিয়েছিল, বিশ্ব জনসংখ্যা ৭০০ থেকে ৮০০ কোটিতে পৌঁছতে ১২ বছর নিয়েছিল। কিন্তু ৯০০ কোটিতে পৌঁছতে লাগবে সাড়ে ১৪ বছর। সারা বিশ্বে জন্মহার হ্রাসই এর কারণ। ২০৮০ সাল নাগাদ বিশ্ব জনসংখ্যা সর্বোচ্চ হবে এবং ১০০০ কোটি অতিক্রম করবে। আলোচ্যমান সময়টি এখনও অনেক দূরে। ওই সময়কালের মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃত্ব অবশ্যই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেবেন। তবে আজকের পরিস্থিতিও সুখকর নয়। বিশেষত ‘জনবিস্ফোরণ’ নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রতিটি মানুষকে মানবসম্পদে পরিণত না করতে পারলে জনসংখ্যা কমিয়েও খুব লাভ হবে না। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি মানুষ একটি মুখের সঙ্গে দুটি হাত নিয়েও জন্মায়। হাতে হাতে কাজ দেওয়া গেলে একজন মানুষ যে সম্পদ সৃষ্টি করতে সক্ষম তা অনেক মানুষের ভোগ্য। মানুষকে মানবসম্পদে পরিণত করার প্রধান বাধা রকমারি বৈষম্য। বৈষম্য হ্রাসের দিকেই নজর দিতে হবে রাষ্ট্রকে। আর দেরি নয়, তার জন্যই দ্রুত প্রস্তুত হতে হবে ভারতকে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ