


নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: ভগ্নদশা নিয়ে মৃত্যুঘণ্টা শুনছে হেরিটেজ ঘোষিত হওয়া ২১২ নম্বর পঞ্চাননতলা রোডের দ্বিতল বাড়িটি। আশপাশে গজিয়ে উঠেছে আধুনিক ফ্ল্যাট। হাওড়ার এই বাড়িতে বসেই নাকি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন— ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’। বাড়ির সামনে থাকা মাঠ, থুড়ি পার্কটি এখন বেআইনি পার্কিং ও ডেকরেটারের জিনিসপত্র রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছে। লাটে উঠেছে বঙ্কিম মেলা। বৃহস্পতিবার সাহিত্য সম্রাটের ১৮৭ তম জন্মদিবসে মাঠের সামনে তাঁর আবক্ষ মূর্তিতে ফুলের মালা পড়ল বটে, কিন্তু পিছনে থাকা বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে হাওড়ার ইতিহাসের এই অধ্যায় ক্রমশ অন্ধকারের পথে। বন্দেমাতরম স্রষ্টার স্মৃতিকে সংরক্ষণের জন্য আট বছর আগে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল রাজ্য সরকার। কোথায় গেল সেই টাকা? প্রশ্ন তুলছে নাগরিক সংগঠনগুলি।
১৮৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে হাওড়ায় এসেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পঞ্চাননতলা রোডের এই বাড়িতেই থাকতেন তিনি। শোনা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে মুচিরাম গুড়ের গল্প শুনতে একদিন সেখানে হাজির হয়েছিলেন যুবক রবীন্দ্রনাথ। সকাল প্রায় ১০টা। কালেক্টরেট অফিসে সময়মতো পৌঁছতে হবে বলে রবীন্দ্রনাথকে একপ্রকার নিরাশ করেই বেরিয়ে যেতে হয় বঙ্কিমচন্দ্রকে। এই বাড়িতে পা পড়েছে বহু মণীষীর। কিন্তু উদাসীনতার আড়ালে সেই সমস্ত ইতিহাস থেকে বর্তমান প্রজন্ম এখন বিচ্যুত। একসময় ডাঃ নিশীথ কর, উপাচার্য নিমাইসাধন বসু, ডাঃ ভোলানাথ চক্রবর্তী, অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, ডঃ শঙ্করীপ্রসাদ বসুর মতো বিশিষ্টরা বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাসকে জিইয়ে রাখার দাবি তুলেছিলেন বহুবার। ওই বাড়ির সামনে থাকা ১৭ কাঠার মাঠকে বঙ্কিম পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে সাহিত্যসম্রাটের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে এই মাঠেই বঙ্কিম মেলার আয়োজন হয়ে আসত। করোনাকালের পর সেই মেলা বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৬ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে হাওড়া পুরসভা। এরপর হেরিটেজ সংরক্ষণে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করে রাজ্য সরকার। বাড়ি সংস্কার করে সেখানে বঙ্কিম সংগ্রহশালা, লাইব্রেরি, সেমিনার হল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি বঙ্কিম পার্ককে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনাও হয়। ঘটা করে টেন্ডার ডাকে পুরসভা। কিন্তু তারপর এক শতাংশও কাজ এগয়নি। হাওড়া সিটিজেন ফোরামের সম্পাদক শ্যামল কর, বঙ্কিম মেলা কমিটির কো-অর্ডিনেটর নিশীথ সরকাররা বলেন, ‘কোথায় গেল পাঁচ কোটি? বহুবার আমরা পুরসভার কাছে জানতে চেয়েছি। সদুত্তর মেলেনি।’ বর্তমানে লাল ইটের এই দোতলা বাড়ি তার ইতিহাস মুছে যাওয়ার দিন গুনছে। বাড়ির সামনে টাঙানো রয়েছে ডেঙ্গু নিয়ে পুরসভার সচেতনতা বোর্ড।
এদিকে, মেলা বন্ধ হতেই বঙ্কিম পার্ক পরিণত হয়েছে বেআইনি পার্কিং এরিয়ায়। একপাশে ডাঁই করে রাখা ডেকরেটারের বাঁশ। বিয়েবাড়িও ভাড়া দেওয়া হয় এখানে। এদিন সকালে এখানেই বঙ্কিমচন্দ্রের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান করেন সিটিজেন ফোরাম, বঙ্কিম মেলা কমিটির সদস্যরা। এসেছিলেন হাওড়া পুরসভার মুখ্য প্রশাসক ডাঃ সুজয় চক্রবর্তীও। তিনি বলেন, ‘এই বাড়িটি সংস্কারের ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তারপর কী হয়েছিল, তা তাঁর জানা নেই। বঙ্কিম পার্ক সাজিয়ে তোলার ভাবনাচিন্তা রয়েছে আমাদের।’