Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আর কতদিন অন্ধ হয়ে থাকব আমরা?

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ প্লেনাম সেশনে অনুমোদিত হয়েছে চীনের পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কী কী করা হবে দেশের উন্নতির লক্ষ্যে।

আর কতদিন অন্ধ হয়ে থাকব আমরা?
  • ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ প্লেনাম সেশনে অনুমোদিত হয়েছে চীনের পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কী কী করা হবে দেশের উন্নতির লক্ষ্যে। আর স্থির হয়েছে, আগামী পাঁচ বছর চীনের সংসদে অথবা পার্টি সম্মেলন কিংবা যে কোনও প্রাদেশিক সম্মেলন কিংবা সভা সমাবেশে এই বিষয়গুলিকেই সবথেকে বেশি জোর দেওয়া হবে। 

Advertisement

কী কী আছে সেই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়? চীনে এই মুহূর্ত থেকে সরকার, বাণিজ্য সংস্থা, নাগরিক সংগঠনের মধ্যে কোন বিষয়গুলি প্রাধান্য পাচ্ছে? প্রথমত, প্রযুক্তি  ও অর্থনীতিকে সর্বাধুনিক পর্যয়ে নিয়ে যাওয়া। সেমিকন্ডাকটর,আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং, গ্রিন টেকনোলজি, রেয়ার আর্থ মিনারেলস। দ্বিতীয়ত, এজিং পপুলেশন সমস্যাকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। অর্থাৎ চীনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে যুবসমাজের তুলনায়। এই অংশের জন্য দরকার রাষ্ট্রের সুরক্ষা। কর্মক্ষেত্রে এদের সরাসরি যুক্ত করা যাবে না। তাহলে কীভাবে এদের প্রাসঙ্গিক করে রাখা যায়? সেই ভাবনার বিশেষ প্ল্যান হচ্ছে চীনে। তৃতীয়ত, সব মেড ইন চায়না হবে। অর্থাৎ অন্য কোনও দেশের উপর কোনও ক্ষেত্রেই যেন সামান্যতম নির্ভরতা না থাকে। চতুর্থত, ডুয়াল সার্কুলেশন। এর অর্থ হল চীনের নাগরিকরা যেন প্রচুর ক্রয় করতে সক্ষম হন। নি঩জেই উৎপাদন করবে কোনও পণ্য বা পরিষেবা। আর সেই টাকায় অন্য পরিষেবা বা পণ্য নিজের ইচ্ছামতো ক্রয় করবে। অর্থাৎ চীন কিন্তু যাই করছে পরিণতমনস্ক ম্যাচিওরড একটি রাষ্ট্রের মতো আচরণ দেখাচ্ছে। 
ঠিক এই সময় ভারতে কী হচ্ছে? বদ্ধ সমাজ আবর্তিত হয়ে চলেছে একইভাবে। হিন্দু বনাম মুসলমান নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আলোচনা। হঠাৎ কেউ একজন বলছে আমি মসজিদ তৈরি করব। সেই কথায় সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ তাঁর সভা সমাবেশে ছুটে যাচ্ছে। আবার সেটা নিয়ে গোটা সমাজ আলোচনাও করছে। কখনও একদল কর্মহীন ও অশিক্ষিত মানুষ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক গরিব চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে মারধর করে ওঠবোস করায়। খ্রিস্টমাস এলেই কাজকর্মহীন এবং শিক্ষাদীক্ষাহীন লুম্পেন সমাজের প্রতিনিধিরা দলবল জোগাড় করে চার্চে, মিশনারি স্কুলে, শপিং মলে হামলা করে। আর পরদিন সকালে মোবাইলে দেখতে পায় দেশের প্রধানমন্ত্রী  দিল্লির চার্চে গিয়ে প্রার্থনায় যোগ দিয়ে যত মত তত পথের শান্তির বার্তা দিয়েছেন। সেই প্রধানমন্ত্রীর দলকেই এরা ভোট দেয়। একবারও ভাবে না তাহলে আমরা কেন ওসব করতে গেলাম? 
অসমের নলবাড়ি, ছত্তিশগড়ের রায়পুর, কেরলে, উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে স্কুল, চার্চের সামনে হাজির হয়ে সান্তাক্লজ ধ্বংস করা, বাচ্চাদের ক্যারল গান বন্ধ করে গুন্ডাগিরি করা হিন্দুত্ববাদীদের নিয়ে এই দেশের কী উপকার হবে? কী কাজে লাগে মুসলিম সমাজের ঩সেইসব অংশ যারা বাংলার এক স্কুলের জলসায় ‘জাগো মা’ গান গাওয়া যাবে না জানিয়ে সেকুলার গান গাওয়ার ফতোয়া দেয়? চীন বরাবর বুদ্ধিমানের মতো আচার আচরণ করছে। ভারতে নির্বুদ্ধিতা, ধর্মান্ধতা, ব্যর্থতার চাষ হচ্ছে জোরদারভাবে। ব্যর্থতা কেন? কারণ, আধুনিক নগর সভ্যতা তৈরির মতো মুন্সিয়ানা, যোগ্যতা, পরিকল্পনা বর্তমান রাজনৈতিক ক্লাসের নেই। সেই কারণে দেশজুড়ে সব বড় শহরে সিংহভাগ সময় রাস্তায় যানজট, দূষণ মাত্রাহীন, ফুটপাত জবরদখল, প্রতিদিন বাড়ছে কর্মহীনতা, শিক্ষার হাল তলানিতে। ডাইনে ও বাঁয়ে অবলোকন করলে দেখা যায় শৃঙ্খলাহীনতা, অসৌজন্য এবং অশালীন শব্দের অবাধ ব্যবহারের উৎসব। আইনশৃঙ্খলার চরম দুর্বলতা, প্রশাসন চালাতে না জানা এবং ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার সম্যক উদাহরণ হল ভারতের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ। ভারত থেকে যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং পরবর্তীকালে সুষ্ঠুভাবে প্রশাসন চালানো কিংবা আর্থ সামাজিক পরিকল্পনা নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়ে যাদের একাংশের ধ্যানজ্ঞান হয়েছে ভারত বিরোধিতা তথা ধর্মান্ধতা। ঠিক সেইসব দেশকেই গ্রাস করেছে চিরকালীন অশান্তি। ১৯৩৭ সালে বার্মা অধুনা মায়ানমার ভারত 
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। ব্রিটিশরাজ ওই প্রথম ভারতভাগ করলেও চেয়েছিল বার্মিজরাই। তার আগে ও পরে তামিল, বিহারি ও বাঙালিদের উপর অত্যাচার, হত্যা, বিতাড়ন চলছিল। সেই মায়ানমার আজও স্থায়ী গণতন্ত্র পায়নি। যাদের সামরিক শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করা জাতি হিসেবে থেকে যাওয়া ভবিতব্য। মায়ানমার নামক কোনও দেশ বিশ্বরাজনীতি কিংবা অর্থনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক? রোহিঙ্গাদের মাঝে মধ্যে গণহত্যা করা কিংবা তাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া মায়ানমার নিয়ে বিশ্ববাসী কী আলোচনা করে? কিছুই না। ভারতে অন্তর্ভুক্ত থাকার সময় কিন্তু বার্মা ছিল এক বৃহত্তর বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। আজ সেই বার্মা উধাও। ভারত বিচ্ছেদে কোনও লাভ হয়নি। 
মহম্মদ আলি জিন্নাকে মুখের উপর বলতে পারেনি পূর্ব পাকিস্তান, যে আমরা আপনাদের ওই পাকিস্তানব প্রজেক্টে নেই। আমরা ভারতেই থাকব এবং অখণ্ড বাংলা হয়েই থেকে যেতে চাই, বাঙালি হিসেবে বৃহত্তম ভারতীয় ভাষাগোষ্ঠী হয়ে। সেকথা বলেন঩নি শেখ মুজিবুর রহমানরা। তাঁরা মুসলিম লিগেরই নেতা ছিলেন। এবং ভারত ভাগে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিণতি কী হয়েছে আজও বাংলাদেশের দিকে তাকালে লক্ষ করা যাচ্ছে। শান্তি কোথায়? স্বস্তি কোথায়? উন্নতি কোথায়? আর পাকিস্তানের কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। পাকিস্তান, বার্মা, বাংলাদেশ সকলেই ভারত থেকে বিচ্ছিন্নতা চেয়েছিল। বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কিন্তু ৮০ বছর পরও তারা কোনও রাষ্ট্রের কাছে বা বিশ্ব মানচিত্রে সমীহ আদায় করে নিতে পারেনি। তাদের প্রসঙ্গে আন্দোলন, হত্যা, শাসককে দেশছাড়া করা, নির্বাচনে কারচুপি, স্বৈরাচার, অরাজকতা, অনিশ্চয়তা ইত্যাদি ছাড়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলি আলোচনাই করে না।
ঠিক এই আবহে ভারতবাসী এবং ভারত সরকারের মধ্যে নিজেদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও আগ্রহ, লক্ষণ দেখা যাচ্ছে? যাচ্ছে না। বরং ভারতের মধ্যে একটা গয়ংগচ্ছ মনোভাব দেখা যায়। যেমন চলছে এভাবেই চলুক। এর কারণ হল ভারতবাসীর মধ্যে বিভাজন করা হচ্ছে। ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার কোনও চেষ্টা দেখা যায় না সরকারের মধ্যে। বিভাজন সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাই নেই। চীন অনেক এগিয়ে রয়েছে। এবং আরও এগিয়ে যাচ্ছে। চীনের জনসংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ভারত সেই পথে হাঁটছে না। ভারত সরকারের সবথেকে বড় চিন্তা হওয়া উচিত যে বিপুল সংখ্যক প্রথাগত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ না পাওয়া কর্মপ্রার্থী তৈরি হচ্ছে দেশজুড়ে তাদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া। সেটা কি হচ্ছে? একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমান লন্ডনে যাওয়ার সময় ভেঙে পড়ে। ২৫০ জনের মৃত্যু হয়। হইচই হয়। কিন্তু তার তদন্ত আর শেষ হয় না। ৬ মাস পরও জানা যায় না যে, কেন হয়েছিল সেই দুর্ঘটনা। 
কোটি কোটি টাকা প্রতি বছর ব্যয় করে অ্যান্টি ফগ ডিভাইস কেনা হয় এবং ঘোষণা করা হয় এবার থেকে কোনও দূরপাল্লার ট্রেন লেট করবে না কুয়াশার কারণে। অথচ প্রত্যেক শীতকালে আবার কুয়াশার জন্য ১০ ঘণ্টা করে লেট হয় ট্রেন। সেইসব টাকা কাদের পকেটে গেল কেউ জানতে পারে না। গঙ্গা ও যমুনার বিশুদ্ধকরণের জন্য হয়তো ১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গিয়েছে বছরের পর বছর ধরে। অথচ দুই নদীর দূষণ কমে না। বেড়ে চলে। সেইসব টাকা কাদের কাছে গেল? কেউ জানে না। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরও আবার ম্যানেজমেন্ট পড়ার প্রবণতা কবে থেকে চালু হল? সেটায় অর্থনীতি ও ইন্ডাস্ট্রির কী লাভ হয়েছে? এই ম্যানেজমেন্ট পড়ার ফি ২০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা কেন? কে ঠিক করল এই টাকার পরিমাণ? প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার বিপুল টিউশন ফি নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কারা অনুমোদন দেয়? কেন এই বিপুল টাকা দরকার একজনকে ডাক্তারি পড়াতে তার হিসাব কাকে দেওয়া হয়? কার কার কাছে যায় সেই টাকার অংশ? 
কোনও চিকিৎসা কিংবা অপারেশনের জন্য কত টাকা খরচ হবে সেটা কীভাবে ঠিক হয়? কাদের কমিশন দিয়ে অনায়াসে রোগীদের থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় হয়? চেনাজানা থাকলে নিমেষের মধ্যে সেই অঙ্ক কমিয়ে দেওয়া হয় কীভাবে? বছরে ২৬ লক্ষ কোটি টাকা ট্যাক্স আদায় করে সরকার। ২২ লক্ষ কোটি টাকা জিএসটি আদায় করে। এসব টাকা কিন্তু প্রত্যেকের কষ্টার্জিত আয়ের। বিনিময়ে সরকার কতটা সুখস্বাচ্ছন্দ্য স্বস্তি দেওয়ার কথা ভাবে? সরকার কি আন্তরিকভাবে ভারতকে শিক্ষিত, আধুনিক, উন্নতির পথে নিয়ে যাচ্ছে? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধ করে রাখছে? যাতে লুটপাট করা যায় জনতার টাকা! হিন্দু মুসলমান, ব্রাহ্মণ দলিত, এই দল সেই দল, পাকিস্তান বাংলাদেশ এসব নানারকম জুজু দেখিয়ে আমাদের বোকা বানানো চলছে না তো? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ