Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস ভুলব কী করে!

আমি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে পাঁচ থেকে আট আউন্স প্রস্রাব পান করি— মোরারজি দেশাইয়ের এমন মন্তব্যে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস-এর সাংবাদিক ড্যান রাথার।

বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস ভুলব কী করে!
  • ৫ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: আমি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে পাঁচ থেকে আট আউন্স প্রস্রাব পান করি— মোরারজি দেশাইয়ের এমন মন্তব্যে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস-এর সাংবাদিক ড্যান রাথার। 

Advertisement

সালটা ১৯৭৮। ইন্দিরা জমানায় আমেরিকার সঙ্গে যে টানাপোড়েন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধার করতে রাতারাতি ওয়াশিংটন উড়ে গিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই। শুধু আমেরিকা-ই নয়, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সরকারি ভাষায় জোটনিরপেক্ষতার সঙ্গে ‘প্রকৃত’ শব্দটিও যুক্ত করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন, ‘ভারত তার প্রতিবেশীদের আর ‘বিরক্ত’ করতে চায় না। আমরা তাদের অনুভূতিতে আঘাত না করার চেষ্টা করব। বন্দুক বা ব্ল্যাকমেলের মাধ্যমেও নয়।’ দেশাই তাঁর আত্মজীবনী, ‘দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’-এ লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী একবার আমাকে বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য তারা নেহরুর কাছ থেকেও আমার মতো এত সাহায্য পায়নি।’
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর শীর্ষকর্তা বি রমন তাঁর ‘দ্য কাও বয়েস অব র: ডাউন মেমোরি লেন’ বইয়ে লিখেছেন, জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীদের বিরুদ্ধে আইবির পাশাপাশি ‘র’-কেও ব্যবহার করেছিলেন— এই ভুল ধারণার ভিত্তিতে, মোরারজি দেশাই ‘র’-এর বাজেট ৩০ শতাংশ ছেঁটে ফেলেছিলেন এবং ‘র’-এর প্রতিষ্ঠাতা আর এন কাওকে ছুটিতে যেতে বাধ্য করেছিলেন। এরপর কাও-এর উত্তরসূরি কে শঙ্করন নায়ারকেও বহিষ্কার করেছিলেন। অথচ, ‘র’-এর তখন মূল টার্গেট ছিল পাকিস্তান এবং দ্বিতীয় চীন। কারণ, চীন ছিল পাকিস্তানের কৌশলগত মিত্র। আর এই সময়ই ‘র’-কে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া ছিল দেশাইয়ের একমাত্র লক্ষ্য। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সাউথ ব্লকে বসে পাক প্রেসিডেন্টকে ফোন করে পাকিস্তানে ভারতের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্য শেয়ার করছেন? ঠিক তাই হয়েছিল ১৯৭৮ সালে!
এই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’-র গল্পের শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জনতা পার্টির কাছে ইন্দিরা গান্ধীর হেরে যাওয়ার ঠিক আগে। ‘র’-কে দ্রুত পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্র খুঁজে বের করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী গান্ধী। কাহুটার পারমাণবিক প্রকল্পে পাকিস্তান সত্যিই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে কি না, সেই বিষয়ে প্রথমে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল ‘র’। এজন্য তারা কাহুটা ল্যাবরেটরিতে কাজ করা এক পাকিস্তানি বিজ্ঞানীর উপর নজরদারি চালাতে থাকে। একদিন সেই বিজ্ঞানী চুল কাটানোর জন্য সেলুনে যান। চুল কাটানোর পর ‘র’-এর এজেন্টরা সেই বিজ্ঞানীর চুল কুড়িয়ে নিয়ে আসে। সেই চুল পরীক্ষা করে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, পাকিস্তান গোপনে কাহুটা কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৭৫ সালে ভারতের জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের কাছে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ অথবা ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর মধ্যে যেকোনও একটির ঘাটতি থাকার কারণে তাদের পক্ষে আগামী চার বছরের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এর এক বছর পরেই তাদের রিপোর্টে জানা যায় যে, পাকিস্তান অল্প সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে সক্ষম। এর মধ্যে ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের খুড়তুতো ভাই আবদুল ওয়াহিদ জার্মানি থেকে নিউক্লিয়ার ইকুইপমেন্ট কেনার একটি রাস্তা তৈরি করেন। কানাডা ও জার্মানি থেকে প্রযুক্তি নিয়ে পাকিস্তান ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড তৈরি করার পদ্ধতি বের করে ফেলে। বাধ্য হয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী বিকল্প পন্থা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। এর মধ্যে সরাসরি পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্পে হামলা চালানোর মতো সিদ্ধান্তও ছিল। শুরুতেই ‘র’ পাকিস্তানের মাটিতে প্রচুর সংখ্যক এজেন্ট নিয়োগ করে। তাদের মাধ্যমে ‘র’ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করত। পাশাপাশি বিভিন্ন কূটনীতিক চ্যানেল থেকেও ভারত তথ্য সংগ্রহ করত। এক্ষেত্রে কানাডা ও রাশিয়া তাদের সাহায্য করেছিল। 
১৯৭৮ সালের শুরুর দিকে কাহুটা প্ল্যান্টের ভিতরে ‘র’ এজেন্টদের ফুটপ্রিন্ট খুঁজে পায়। যারা ঘুষের বিনিময়ে পাকিস্তানি পারমাণবিক প্রকল্পের নীলনকশা পেতে ইচ্ছুক। কাহুটা নিউক্লিয়ার প্লান্টের ভিতরের সব তথ্য সরবরাহ করতে চেয়েছিল ‘র’-এর এজেন্টরা। এর বিনিময়ে তাদের দাবি ছিল মাত্র ১০ হাজার ডলার। তবে এজন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ততদিনে ইন্দিরাকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসে গিয়েছে জনতা পার্টি। তখন ‘র’ প্রধান এন এফ সানতুক অনুমতি নিতে মোরারজি দেশাইয়ের কাছে যান। তিনি যুক্তি দেখান, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ভুল হবে। সানতুক দেশাইকে জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে এই অপারেশনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দেশাই নিজের সিদ্ধান্তে অটল এবং ‘র’ এর প্রস্তাব বাতিল করে দেন। একই সময়ে এবং একই যুক্তিতে, দেশাই ইজরায়েলের বিমান হামলায় কাহুটা কেন্দ্র ধ্বংস করার পরিকল্পনাও ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। মুম্বইয়ে ইজরায়েলি বিদেশমন্ত্রী মোশে দায়ানের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে তিনি পাকিস্তানে হামলা চালানোর জন্য ইজরায়েলি বিমানে জ্বালানি সরবরাহের সুবিধা দিতে চাননি।
‘র’-এর সন্ত্রাস দমন বিভাগের প্রধান, প্রয়াত বি রমন লিখেছেন, তৎকালীন সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউল হক প্রায়ই মোরারজি দেশাইকে ফোন করতেন এবং ইউরিন থেরাপি সম্পর্কে তাঁর কাছ থেকে নির্দেশ নিতেন। ধূর্ত জিয়া মাঝেমাঝেই প্রশ্ন করতেন, ‘মহামান্য, দিনে কতবার প্রস্রাব পান করা উচিত? এটা কি সকালের প্রথম প্রস্রাব হওয়া উচিত, নাকি দিনের যেকোনও সময় হতে পারে?’ জিয়ার এসব প্রশ্নে ছাতি ফুলে উঠত দেশাইয়ের। আর এভাবেই একদিন অসাবধানতাবশত জিয়ার কূটনৈতিক খেলার কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানে ‘র’ নেটওয়ার্কের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনাদের পারমাণবিক প্রকল্পের সব তথ্যই আমাদের কাছে। ভারত এই সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। জেনারেল জিয়াউল হকের বুঝতে অসু্বিধা হয়নি কারা ভারতকে এসব তথ্য সরবরাহ করছে। তিনি গোয়েন্দা বাহিনীকে ‘র’-এর এজেন্টদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে আইএসআই প্রত্যেক এজেন্টকে খুঁজে বের করে তাদের নির্মমভাবে খুন করে। ফলে পাকিস্তানে গোটা নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে যায়। কাহুটা প্রকল্প সম্পর্কে ‘র’ এর কাছে তথ্য আসাও বন্ধ হয়ে যায়। একইসঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কমপক্ষে এক দশক পিছিয়ে যায়। অথচ, সেই সময় মোরারজি দেশাইয়ের এই বিরাট ভুলের বিরোধিতা করেননি অন্যতম ‘শরিক’ ভারতীয় জনসঙ্ঘের জাতীয়তাবাদী সদস্যরাও। অটলবিহারী বাজপেয়ি ছিলেন দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারের বিদেশমন্ত্রী এবং লালকৃষ্ণ আদবানি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। তখন তাঁরা ছিলেন নীরব দর্শক। হয়তো সেই কারণেই আজও অনেকে প্রশ্ন তোলেন, সেই ভুলের দায় কি বিজেপি এড়িয়ে যেতে পারে?
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কে এই জেনারেল জিয়া, যাঁর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এত মাখামাখি ছিল? জিয়াউল হকের পরিচয় শুধু গোঁড়া দেওবন্দি মুসলিম নন, যিনি পরবর্তীকালে তালিবানের মতো দেওবন্দি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। আফগানিস্তানে রাশিয়ার হস্তক্ষেপকে একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অপারেশন টোপাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ভারতের মাটিতে পাক সন্ত্রাসবাদীদের রক্তপাত শুরু। সেই জেনারেল জিয়াই ১৯৮৮ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে মোরারজি দেশাইকে ‘নিশান-এ-পাকিস্তান’ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। ‘পাকিস্তানের চূড়ান্ত প্রতীক’। 
এই পুরস্কার দেশাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলিকে আরও উস্কে দিয়েছিল। তবে তা নিয়ে ভারতে বিতর্কের সৃষ্টি থেকে শুরু করে কয়েকদিন পর এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যু পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে মুম্বইয়ে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে মোরারজি দেশাইকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ভারতে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানের হাইকমিশনার আব্দুল সাত্তার বলেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিবেশী সম্পর্ক উন্নয়নে দেশাইয়ের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
মজার কথা, বহু বিতর্কের পরও মোরারজি দেশাইয়ের পাক-প্রীতি সমর্থন পেয়েছিল গেরুয়া শিবির থেকেই। অর্গানাইজারের প্রাক্তন সম্পাদক এবং বিজেপি ও আরএসএসের প্রবীণ নেতা কে আর মালকানি লিখেছিলেন, দেশাইকে সম্মান জানিয়ে পাকিস্তান ‘নিজেকে সম্মানিত করেছে’। এবং মোরারজি দেশাইয়ের বিদেশ নীতিকে ‘দুর্দান্ত সাফল্য’ বলে প্রশংসা করে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের আশা, আমরা উভয়ই র‍্যাডক্লিফ লাইনের ওপারে আরও বেশি সংখ্যক নেতাদের বিশ্বাস করব।’ পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার টিসিএ রাঘবনের লেখা ‘দ্য পিপল নেক্সট ডোর: দ্য কিউরিয়াস হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া'স রিলেশনস উইথ পাকিস্তান’ বইয়ে এর বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। 
কিন্তু দেশাইয়ের পাক-প্রীতির ফল কী হয়েছিল? ১৯৮১ সালে ইসলামাবাদ থেকে ভারতীয় দূতাবাসের পাঠানো রিপোর্টে জানা যায়, পাকিস্তান সেই বছরই পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে। এজন্য তারা সিন্ধু, বালুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনওয়ায় মাটির নীচে গোপন সুড়ঙ্গ তৈরি করে ফেলেছে, যা রুশ স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে। এরপর ইন্দিরা গান্ধী ফের ক্ষমতায় আসার পর ইজরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসের ছক কষেছিল ভারত। কিন্তু, ১৯৮২ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ১৯৮৪ সালে এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে ভারত ও ইজরায়েলের যৌথ অপারেশনে পাক পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। কাহুটা ধ্বংসের পরিকল্পনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখনই বাদ সাধে আমেরিকা। পাকিস্তানের কাছে সব কিছু ফাঁস করে দেয় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ।
ফলে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস বুকে চাপা দিয়ে আজও ভারতকে সহ্য করতে হয় পাক পরমাণু বোমার নির্লজ্জ হুমকি। সেই ইতিহাস ভুলব কী করে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ