ইন্দ্রজিৎ রায়, বোলপুর: পরিচারিকা থেকে রাতারাতি বিশাল সম্পত্তির মালকিন! সৌজন্যে জালিয়াতি। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কোটি টাকার সেই সম্পত্তি নিজের ভোগদখলে না রেখে মাত্র ৩০ লক্ষ টাকায় হাতবদলও করে দেয় ওই পরিচারিকা। নজিরবিহীন এমন জালিয়াতির ঘটনাটি নিয়ে এখন সরগরম শান্তিনিকেতনের অ্যান্ড্রুজপল্লি। বিদেশে থাকা বাড়ির প্রকৃত মালিকের অভিযোগের ভিত্তিতে চন্দনা মাহারা নামে ওই পরিচারিকাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিস।
জানা গিয়েছে, অ্যান্ড্রুজপল্লির ওই বাড়িটি বিশ্বভারতীর ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক প্রয়াত সৌরীন্দ্রনাথ মিত্র ও দেবশ্রী মিত্রের। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সকলেই কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। বোলপুরের শ্রীনিকেতনের বাসিন্দা মন্টু মাহারা ও তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী মাহারা তাঁদের বাড়িতে মালি ও পরিচারিকার কাজ করতেন। সেই সূত্রেই তাঁদের বড় মেয়ে চন্দনা মাহারার ওই বাড়িতে যাতায়াত ছিল। মায়ের সঙ্গে পরিচারিকার কাজও করত। ১৯৮৯ সালে সৌরীন্দ্রনাথবাবুর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী দেবশ্রী মিত্র ওই বাড়িতে বসবাস করতেন। চন্দনাই তাঁর দেখাশোনা করত। ২০২১ সালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেবশ্রীদেবী মারা যান। সেই থেকেই চন্দনা ও তাঁর স্বামী ওই বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করে।
সৌরীন্দ্রনাথবাবুর ছেলে সৌম্যশঙ্কর মিত্র আমেরিকায় থাকেন। তাঁর দুই বোন মধুশ্রী ও ভাস্বতী মিত্রও কর্মসূত্রে দেশের বাইরে থাকেন। চন্দনাকে বিশ্বাস করে বাড়ির চাবি সহ যাবতীয় নথিপত্র নিয়ে খুব একটা খোঁজখবর রাখতেন না সৌম্যশঙ্করবাবু। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগায় চন্দনা। কীভাবে? নিজের মাহারা পদবি বদলে ‘মিত্র’ করে। পদবি পরিবর্তনের হলফনামাকে অস্ত্র করে বানিয়ে ফেলে একটি নকল আধার কার্ড। তারপরই বোলপুর পুরসভা থেকে চন্দনা নিজেকে অধ্যাপক সৌরীন্দ্রনাথ মিত্রের একমাত্র কন্যা দাবি করে শংসাপত্রও বাগিয়ে ফেলে। তাতেই কেল্লাফতে! বাড়িটির কাগজপত্র নিজের নামে বানিয়ে বিক্রি করে দেয় একেবারে জলের দরে। তদন্তকারীরা জেনেছেন চন্দনার স্কুলের শংসাপত্রে অবশ্য ‘মাহারা’ পদবি রয়েছে। আমেরিকা থেকেই সৌম্যশঙ্করবাবু বাড়ি বিক্রির খবর জানতে পারেন। ফিরে এসে শান্তিনিকেতন থানায় অভিযোগ করেন। তার ভিত্তিতে পুলিস চন্দনাকে গ্রেপ্তার করেছে। মঙ্গলবার তাকে বোলপুর আদালতে তোলা হলে বিচারক ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। সৌম্যশঙ্করবাবু বলছিলেন, ‘পরিচারক, পরিচারিকারা এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করবে, ভাবতে পারছি না। শান্তিনিকেতনে ফিরে না এলে আমাদের পৈত্রিক বাড়িটি বেহাত হয়ে যেত। আমি হতবাক।’ বোলপুর শান্তিনিকেতনে জমি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও রবি ঠাকুরের কর্মভূমিতে জমি হাত বদলের বহু ঘটনা সামনে এসেছে। তবে, বাড়ির মালিকের মেয়ে সেজে পরিচারিকার বাড়ি বিক্রি করার ঘটনা এই প্রথম।