সৌমিত্র দাস, কাঁথি: বর্তমানে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে খেজুরির ইতিহাস বিজড়িত ‘নীলকুঠি’। ঝোপজঙ্গল, আগাছায় ঢাকা ভগ্নদশার একটি ঘর ও পোড়া ইটের কয়েকটি ভাঙা দেওয়াল এখন নীলকুঠির শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এককালের জাঁকজমকপূর্ণ নীলকুঠি আজ গা-ছমছমে পোড়োবাড়ি ও সাপখোপের নিশ্চিন্ত আস্তানা। খেজুরির প্রাচীন বন্দরের ধ্বংসাবশেষ সংলগ্ন বালিবস্তি গ্রামে রয়েছে এই নীলকুঠি। গ্রামের জনবসতির মাঝে বাঁশের জঙ্গলের পাশে গেলেই নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়বে। এলাকার বাসিন্দা ও ইতিহাসবিদগ্ধ মানুষজনের দাবি, অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করা হোক। নয়তো কালের নিয়মে একদিন তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭০০ সালের মাঝামাঝি খেজুরিতে বন্দর গড়ে ওঠে। ১৮৫৯ সালে বাংলায় তখন নীলচাষ শেষের দিকে। নীল বিদ্রোহের জেরে ক্রমশ নীলকর সাহেবরা ব্যবসার পাট চুকিয়ে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। এমন একটা সময়ে, খেজুরিতে পরীক্ষামূলকভাবে নীলচাষ শুরু হয়। প্রান্তিক খেজুরিতে গড়ে ওঠে নীলকুঠি। তৈরি হয় নীলচাষের ভ্যাট। খেজুরি বন্দরের কর্মচারীদের একাংশ নীলচাষ শুরু করে। নীলকুঠি সংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েক বিঘা জমিতে নীলচাষ হতো। নীল প্রসেসিংয়ের জন্য তিনটি পুকুরও ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে নীলকুঠিটি ‘নীল হাউস’ বলে পরিচিত ছিল। চারদিকে তখন নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের প্রতিবাদে নীল বিদ্রোহ চলছে। তাই প্রতিকূল আবহাওয়ায় খেজুরিতে নীলচাষ সেভাবে সফল হতে পারেনি। একটা সময় নীল বিদ্রোহ জোরদার হয়ে ওঠে। বাজারে আসে কৃত্রিম নীল। পাশাপাশি, ১৮৬৪ সালের ৫ অক্টোবর ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ও বিধ্বংসী বন্যায় খেজুরি বন্দরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নীলকুঠিটিও ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাহেবরা বন্দর ছেড়ে চলে যায়। বাধ্য হয়ে নীলকর সাহেবরাও খেজুরি ছেড়ে চলে যায়। পরিত্যক্ত হয়ে যায় নীলকুঠি। আজ বালিবস্তিতে খেজুরির নীলচাষের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে রয়েছে ভগ্নপ্রায় নীলকুঠি, নীল তৈরির ভ্যাট ও ইতস্তত কিছু নীলগাছের চারা। কুঠি সংলগ্ন নীলচাষের জমিতে এখন ধানচাষ হয়। এখনও নীল প্রসেসিংয়ে ব্যবহৃত সেই তিনটি পুকুর রয়েছে। খেজুরিতে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভগ্ন নীলকুঠিটি দেখতে আসেন।
খেজুরি হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতির যুগ্ম সহ-সম্পাদক সুমননারায়ণ বাকরা ও সুদর্শন সেন বলেন, আমরা বহুদিন ধরেই সরকারি উদ্যোগে নীলকুঠিটির সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছি। এবিষয়ে জেলা প্রশাসন ও হেরিটেজ কমিশন সহ বিভিন্ন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। খেজুরিতে নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। অনেকেই তা জানেন না। তাই সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যায়নের পাশাপাশি মূল রাস্তায় নীলকুঠির তথ্য-সম্বলিত বোর্ড টাঙানোর ব্যবস্থা করলে খুবই ভালো হয়। বিডিও উদয়শঙ্কর মাইতি বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। তারপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিজস্ব চিত্র