Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এপারের হিন্দুদেরও রক্ষায় ব্যর্থ হিন্দুত্ববাদী শাহ

‘দেশটা তোমার একার নাকি করছ ছলকলা/ সুযোগ পেলেই চালিয়ে যাচ্ছ হিন্দুর উপর হামলা।/ মনে রেখো, হিন্দুরাও দেশ বাঁচাতে পাশে ছিল,/ দেশে দেশে দেশ বাঁচাতে রক্ত তারাও দিয়েছিল।/ তবে ধর্ম নিয়ে কেন এই ঝামেলা?/ ও দেশবাসী, বন্ধ কর হিন্দুর উপর হামলা।’

এপারের হিন্দুদেরও রক্ষায় ব্যর্থ হিন্দুত্ববাদী শাহ
  • ২৩ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: ‘দেশটা তোমার একার নাকি করছ ছলকলা/ সুযোগ পেলেই চালিয়ে যাচ্ছ হিন্দুর উপর হামলা।/ মনে রেখো, হিন্দুরাও দেশ বাঁচাতে পাশে ছিল,/ দেশে দেশে দেশ বাঁচাতে রক্ত তারাও দিয়েছিল।/ তবে ধর্ম নিয়ে কেন এই ঝামেলা?/ ও দেশবাসী, বন্ধ কর হিন্দুর উপর হামলা।’ এক দল ছাত্র বাংলাদেশে শুরু করেছিল ‘বৈষম্য বিরোধী’ আন্দোলন। তার রাশ দ্রুত চলে যায় উগ্র মৌলবাদী মুসলিমদের হাতে। এই সুযোগে তারা শুরু করে নির্বিচারে হিন্দু-নিপীড়ন। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ঝড় তুলেছিল ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গান। নিপীড়নে শঙ্কিত হিন্দুরা পরে ওই গানেরই কলি ও সুর ধার করে বেঁধেছিল পাল্টা এই গান।

Advertisement

কিন্তু এমন আবেদন নিবেদনে কাজ না-হওয়ায় পড়শি দেশের হিন্দুরাও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। তা অবশ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অল্প কয়েকটি জায়গায়। নিতান্ত বিক্ষিপ্তভাবে হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর এমন প্রতিবাদ আন্দোলন সেটাই ছিল সম্ভবত প্রথম। এর আগে প্রতিবাদে রাস্তায় নামার কথা, চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার কথা তারা ভাবেনি। সেই সাহসই হয়নি তাদের। সব সরকারের আমলেই, এর আগে তারা মার খেয়েছে এবং অপূরণীয় ক্ষতির স্বীকার হয়েছে একতরফা ভাবে। অত্যাচারীরা জানত, মালাউনরা (অমুসলিমকে মৌলবাদীরা এই ভাষাতেই সম্বোধন করে) মার খাবে আর সবকিছু ফেলে রেখে ইন্ডিয়ায় (ওরা ‘ভারত’ বলে না) পালাবে। ‘বেওয়ারিশ’ মালামাল আত্মসাৎ করবে তারা। কিন্তু এই প্রথম হিন্দুরা রুখে দাঁড়াল! 
সাহস জোগাতে নিপীড়নের শিকার মানুষগুলিকে সংগঠিত করার চেষ্টা নেন ইসকনের সন্ন্যাসী প্রভু চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। এতে প্রমাদ গুনল এবং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল বাংলাদেশের উগ্র মৌলবাদী মুসলিমরা। বিড়াল প্রথম রাতেই মারার সিদ্ধান্ত নিল তারা। প্রতিবাদী হিন্দুদের থামাতে প্রথমেই চিন্ময়কৃষ্ণকে গ্রেপ্তার করা হল। দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। এক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। প্রতিবাদী সন্ন্যাসী যাতে আইনের আশ্রয়টুকুও নিতে না পারেন তার জন্য বর্বরোচিত কায়দায় সচেষ্ট ছিল মৌলবাদী শক্তি। মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারও দুষ্টদের পক্ষ নেয় পরোক্ষে। অত্যাচারীদের কাউকেই আইনের আওতায় নেওয়া হয়নি এবং আজও জামিন পাননি চিন্ময়কৃষ্ণ। গত ৩১ অক্টোবর ঢাকায় চিন্ময়কৃষ্ণ দাসসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা জুড়ে দেওয়া হয়। চিন্ময় প্রভুসহ গ্রেপ্তার হন কয়েকজন। আপাতত তাঁরা সকলেই জেলবন্দি। চিন্ময় প্রভুকে রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলে। 
এবারের খবর, ইউনুসের ‘দ্বিতীয় স্বাধীন’ বাংলাদেশে অপহরণ করে পিটিয়ে খুন (১৮.০৪.২৫) করা হয়েছে এক হিন্দু নেতাকে। ভারতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে দিনকয়েক আগেই লম্বা-চওড়া কথা বলেছিল ইউনুসের সরকার। পাল্টা ঢাকাকে ঘর সামলানোর বার্তা দিয়েছিল দিল্লি। এবার বাংলাদেশেই এক সংখ্যালঘু হিন্দু নেতাকে খুনের অভিযোগ উঠল। ক্ষমতায় আসার পর ইউনুস সাহেবের কণ্ঠে ‘সংস্কার’ শব্দটি বারবার শোনা গিয়েছে। আর তাঁরই জমানায় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট চলেছে অবাধে। তাঁকে ক্ষমতায় আনতে ইতিমধ্যেই মুছে ফেলা হয়েছে সে-দেশের প্রতিটি কোণ থেকে একাত্তরের যাবতীয় অভিজ্ঞানসহ স্বাধীনতার চেতনা। এবার ‘সাফল্যের মুকুটে’ যোগ হল হিন্দুনিধনের নয়া ‘কীর্তি’! বাংলাদেশে মৃত ওই ব্যক্তির নাম ভবেশচন্দ্র রায় (৫৫)। তিনি দিনাজপুরের বাসুদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই ঘটনায় হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
পরদিন কড়া বার্তা দিয়েছে দিল্লি। বলেছে, অজুহাত নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিক ইউনুসের সরকার। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের অভিযোগ, বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ‘পরিকল্পনা মাফিক নির্যাতন’ করা হচ্ছে। সরকারের মুখপাত্র এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু নেতা ভবেশচন্দ্র রায়ের অপহরণ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের উপর উদ্বেগের সঙ্গে নজর রেখেছি আমরা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের অন্যতম উদাহরণ এই হত্যাকাণ্ড। অতীতের এই ধরনের ঘৃণ্য ঘটনার সঙ্গে যুক্ত দোষীরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ 
বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘও। আরএসএসের অভিযোগ, হিন্দুনিধনকারী উগ্র মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ইউনুসের সরকার কোনও ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। তাই বাংলাদেশের উপর চাপসৃষ্টি করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছেও আর্জি রেখেছে তারা। কিন্তু এই ব্যাপারে মোদি সরকারের কোনও তৎপরতা নজরে পড়ে না। শুধু বাংলাদেশকে ‘কড়া বার্তাতেই’ খতম দিল্লির ভূমিকা! গতমাসে মার্কিন সেনেটরের উদ্বেগের জবাবে ইউনুসের সরকার দাবি করেছিল, গত আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে ধর্মীয় কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনও ঘটনাই ঘটেনি। যা-কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা সামনে আনা হয়েছে সেগুলি নিছকই রাজনৈতিক। মোদি সরকারও কি তাই মনে করে? 
যাই হোক, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের দিকে না-হয় পরে তাকাবেন মোদিবাবুরা। অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক মোদি সরকার। গেরুয়া শিবির দাবি করে থাকে, পশ্চিমবঙ্গ নাকি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টি। স্বাধীনতার সন্ধিক্ষণে চরম অশান্ত পরিস্থিতিতে উপমহাদেশে বাঙালি হিন্দুর ভবিষ্যৎ যখন গভীর প্রশ্নের মুখে তখন তাদের জন্য শ্যামাপ্রসাদ নাকি ‘হোমল্যান্ড’ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ আদায় করেছিলেন। যদি তাই হবে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গেও কেন বাঙালি হিন্দুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না মোদি সরকার? তারা তো শ্যামাপ্রসাদেরই উত্তরসূরি। বাঙালি হিন্দু বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার। এপার বাংলাতেও তাদের একটি অংশ বিপন্ন—বাংলাদেশি মৌলবাদী জঙ্গি বাহিনীর হামলার শিকার তারা। দেশের তখতে যখন একটি হিন্দুত্ববাদী সরকার আসীন তখন এই ঘটনা উলটপুরাণ বইকি! 
গোয়েন্দা রিপোর্টে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, মুর্শিদাবাদে সংঘটিত বেনজির অশান্তি কাকতালীয় কিছু নয়, রীতিমতো চক্রান্ত করেই ঘটানো। শেখ হাসিনা উৎখাত পর্বে ঢাকাসহ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে জেল পালানো জঙ্গিদের একটা বড় অংশই মুর্শিদাবাদে হাঙ্গামার নেপথ্যে। কমপক্ষে ২০ জঙ্গির ওই দল তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে সামশেরগঞ্জ, সুতি ও ধুলিয়ানে হাঙ্গামার পুরোভাগে ছিল। সুতি সীমান্ত দিয়ে এপারে ঢুকেছিল বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিমের (এবিটি) ক্যাডাররা। বোরখা পরে সীমান্ত পেরয় তারা। নোবেলজয়ী ইউনুস ক্ষমতা নেওয়ার পরেই ওপার বাংলা মৌলবাদী ও পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিদের কী ভয়াবহ লীলাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, তা সারা দুনিয়া জানে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ লাগোয়া এলাকাগুলিতে কায়েম হয়েছে জঙ্গিরাজ। মুর্শিদাবাদে হাঙ্গামার নির্দেশাবলি এসেছে সীমান্তের ওপার থেকেই। হাঙ্গামার ধরন আমাদের মুম্বই হামলার কৌশলই মনে পড়ায়। ষড়যন্ত্রের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল গত জানুয়ারিতে। ৪ জানুয়ারি ধুলিয়ানের একাংশে দাপিয়ে বেড়িয়েছিল ‘বহিরাগত’ যুবদের বাইক বাহিনী। বাছাই করা কিছু বাড়িতে ইট-পাটকেলও ছুড়েছিল তারা। রেকি করতেই ওই অশান্তি ঘটিয়েছিল জঙ্গিরা। তখন স্থানীয় কতিপয় যুবককে ‘মগজ ধোলাই’ করে জঙ্গিদের টিমে জুড়ে নেওয়া হয়। উল্লেখ করা দরকার যে, গত জানুয়ারিতে রেকি করা এলাকাতেই এবার ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে। ওয়াকফ ইস্যুতে রঘুনাথগঞ্জ ও ধুলিয়ানের কয়েকটি জায়গায় সভা করে প্রয়োজনে ‘বাংলাদেশ লাইন’ প্রয়োগের হুমকিও দেওয়া হয়। বাংলাদেশ থেকে যে হাঙ্গামাকারীরা এসেছিল, তাদের উপর নির্দেশ ছিল—রেল স্টেশন, বিডিও অফিস, থানা, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের মতো সরকারি সম্পত্তি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও আক্রমণ চালাতে হবে। সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগও করা চাই। প্রয়োজনে খুন করতে হবে কর্তব্যরত পুলিসকে। সেইমতোই নষ্টামি করার চেষ্টা দুষ্কৃতীরা করেছিল। 
উপযুক্ত তথ্য থাকা সত্ত্বেও আগাম সতর্ক হতে না-পারাটা নিশ্চয় বড় ব্যর্থতা। সতর্ক হওয়ার অনেক কারণই ছিল। ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যে ভারত বিরোধিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে তৎপর, তা প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বুঝিয়ে দিয়েছেন নানাভাবে। তিনি চীন সফরে গিয়ে তো ভারত বিরোধিতায় রেকর্ড গড়েছেন! তার আগে কলকাতা দখল, সেভেন সিস্টারস ছিনিয়ে নেওয়া প্রভৃতি হুংকারও একাধিকবার শোনানো হয়েছে সীমান্তের ওপার থেকে। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, পশ্চিমবঙ্গে বড়সড় অশান্তি পাকাবার চেষ্টা তারা করবেই। ওয়াকফ ইস্যু ওই শক্তিকে হঠাৎই সেই মওকা হাতে তুলে দেয়। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না—সম্প্রতি হিংসা, রক্তপাত, অগ্নিসংযোগ আর পাথরবৃষ্টি—কোনোটাই স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ থেকে নয়, সম্পূর্ণ পরিকল্পনা মাফিক। এর পিছনে কোনও রাষ্ট্রশত্রুর সক্রিয়তা অবশ্যই রয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে যে বিএসএফ, সেটি নিয়ন্ত্রণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। স্বভাবতই ক্ষমার অযোগ্য এই ব্যর্থতার মূল দায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের উপরেই বর্তায়। 
সিএএ সুড়সুড়িতে এপার-ওপার কোনও দিকেরই হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিন্দুমাত্র লাভ নেই। বিদেশি দুষ্কৃতী-জঙ্গি অনুপ্রবেশ রোধে সক্রিয় হোক অমিত শাহের মন্ত্রক। তাদের অপদার্থতার মাশুল কেন বইবে বাংলা? মুর্শিদাবাদ ইস্যুতে রাজ্যজুড়ে বিদ্বেষ-বাষ্প ছড়াবার যে কদর্য পরিবেশ রচিত হচ্ছে, সেটিও অবাঞ্ছিত। এতে সার্বিকভাবে ক্ষতি হতে পারে বাংলার বহু আকাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন উদ্যোগ এবং অর্থনীতির। এই ক্ষতি দিনের শেষে দেশেরও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ