Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গুন্ডাতন্ত্রে হিন্দুধর্ম সিলমোহর দেয় না

সফলতা কার্তিক বিএড পাশ করেছেন। শিক্ষকতা করবেন... এটাই তাঁর অ্যাম্বিশন। বাধা কম ছিল না তাঁর। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার, পড়াশোনায় হোঁচট এবং সবথেকে বড় কথা, সফলতা দৃষ্টিহীন।

গুন্ডাতন্ত্রে হিন্দুধর্ম সিলমোহর দেয় না
  • ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: সফলতা কার্তিক বিএড পাশ করেছেন। শিক্ষকতা করবেন... এটাই তাঁর অ্যাম্বিশন। বাধা কম ছিল না তাঁর। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার, পড়াশোনায় হোঁচট এবং সবথেকে বড় কথা, সফলতা দৃষ্টিহীন। তাও হার মানেননি তিনি। জব্বলপুরের প্রিন্স অব পিস গির্জায় প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন হয়। সফলতা সেখানে যান। ছ’বছর ধরে। একেবারে শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠান। এবারও দুপুরে সবার সঙ্গে খেতে বসেছিলেন সফলতা। হঠাৎ কানে এল তুমুল হট্টগোল। আট বছরের ভাইঝি পাশেই খেতে বসেছিল। তাঁর দিকে সিঁটিয়ে এল সে। এক মহিলা তার হাত ধরে টানছে। বলছে, ‘এখানে কেন এসেছ?’ তারপর তির ঘুরে গেল সফলতার দিকে... ‘মাথায় সিঁদুর! গির্জায় এসেছ? কনভার্ট হবে? বেশ্যাবৃত্তি করছ?’ বক্তা কে? বিজেপির জেলা সহ সভানেত্রী অঞ্জু ভার্গব। এবং হ্যাঁ, এটাই এক দৃষ্টিহীন হিন্দু মহিলার জন্য তাঁর বাছাই করা ভাষা, সঙ্গে শারীরিক নিগ্রহ। এখানেই শেষ নয়, সফলতা কার্তিকের জন্য বিজেপি নেত্রীর ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ ছিল, ‘তুমি পরের জন্মেও অন্ধ হয়ে জন্মাবে।’

Advertisement

অসমের নলবাড়ির স্কুলে বজরং দলের ধ্বজাধারী ‘গুন্ডা’দের ভাঙচুর, ছত্তিশগড়ের রায়পুরে শপিং মলে ঢুকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে ক্রিসমাসের সজ্জা ভেঙে তাণ্ডব, আর খাস দিল্লিতে সান্তাক্লজের টুপি পরায় রাস্তার মধ্যে মহিলাদের হেনস্তা। দাবি কী? এই সব নাকি ধর্মান্তরণের চেষ্টা। প্রত্যেকটি ঘটনা যেদিন গোটা দেশে আলোড়ন ফেলেছে, সেই ২৫ ডিসেম্বর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রার্থনা করছেন রাজধানীর ক্যাথিড্রাল চার্চ অব রিডেম্পশনে। বার্তা দিচ্ছেন ভালোবাসার। শান্তির। 
এটাই নতুন ভারতের বৈচিত্র্য। এবং এখানে ঐক্যের কোনও জায়গা নেই। দেশের নানা প্রান্তে এভাবে গেরুয়া বাহিনীর তাণ্ডব চলল, অথচ প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিল না। প্রধানমন্ত্রী এর নিন্দা করে কোনও বার্তাও দিলেন না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বধর্ম সমন্বয়ের ইমেজ প্রতিষ্ঠা করা তাঁর কর্তব্য। তাই তিনি গির্জায় গিয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আবার হিন্দুও বটে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। কম্পালশনও। তাই হিন্দুত্বের নামে অন্য ধর্মের উপর গেরুয়া তাণ্ডবের প্রকাশ্য নিন্দা তিনি করতে পারবেন না। এইটুকু গ্রেস তো তাঁর পাওয়াই উচিত, তাই না? যদিও তিনি বা তাঁর সংগঠনের কেউ হিন্দুধর্মকে গেরুয়া পাগড়ি পরিহিত আর এক ব্যক্তির থেকে বেশি জানেন বলে দাবি জানানোর স্পর্ধাও কেউ দেখাবে বলে মনে হয় না। সেই ব্যক্তির নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। গোটা বিশ্ব তাঁকে চেনে স্বামী বিবেকানন্দ নামে। আরএসএস ভূমিষ্ঠ হওয়ারও ৩২ বছর আগে স্বামীজি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোন মতবাদ অথবা বদ্ধমূল ধারণায় বিশ্বাস করার চেষ্টাতেই হিন্দুধর্ম নিহিত নয়; অপরোক্ষানুভূতিই উহার মূলমন্ত্র; শুধু বিশ্বাস করা নয়, আদর্শস্বরূপ হইয়া যাওয়াই—উহা জীবনে পরিণত করাই ধর্ম।’
তাহলে সংখ্যালঘুদের ধর্ম, ভাবনা, আবেগের উপর এই তাণ্ডবের অর্থ কী? এখনকার গেরুয়া ধ্বজাধারীরা হিন্দুত্বের আদর্শের উপর আস্থা হারিয়েছেন? নাকি তাঁরা হিন্দুধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং গভীরতা সম্পর্কেই কিছু জানেন না? বেদ উদ্ধৃত করে স্বামীজি বলেছিলেন, ‘হিন্দু নিজেকে আত্মা বলিয়া বিশ্বাস করে। সেই আত্মাকে তরবারি ছেদন করিতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না, জল আর্দ্র করিতে পারে না, এবং বায়ু শুষ্ক করিতে পারে না। হিন্দু বিশ্বাস করে: সেই আত্মা এমন একটি বৃত্ত, যাহার পরিধি কোথাও নাই, কিন্তু যাহার কেন্দ্র দেহমধ্যে অবস্থিত, এবং সেই কেন্দ্রের দেহ হইতে দেহান্তরে গমনের নামই মৃত্যু। আর আত্মা জড়নিয়মের বশীভূত নন, আত্মা নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত-স্বভাব। কিন্তু কোন কারণবশতঃ জড়ে আবদ্ধ হইয়াছেন ও নিজেকে জড় মনে করিতেছেন।’ আমিত্বের বিরোধিতা হিন্দুধর্মের আধার। বেদ ব্যক্তিতে নয়, সমষ্টিতে বিশ্বাসী। অথচ, এখন হিন্দুরাষ্ট্রের জিগির তুলে দৃষ্টিহীনদেরও হেনস্তা করা নেতানেত্রীরা ‘আমি’ ছাড়া কিছু বোঝেন না। এ ব্যাপারে অবশ্য তাঁদের নেতাই পথপ্রদর্শক। এই ভারতে যা ভালো হয়েছে, সব তিনিই করেছেন। সব পরিষেবা তিনি দিয়েছেন। ভারতকে জগৎসভায় তিনিই নিয়ে গিয়েছেন। কাজেই স্বামীজি ঠিক কী বলে গিয়েছেন, বেদে কী লেখা রয়েছে... এসবে গা করার প্রয়োজন নেই তাঁর। আর এই মহাপ্রাণের মতো মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে গমন করছেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই অনুগামীরাও তাতেই হাঁটবেন। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার পর ১২টি ডবল ইঞ্জিন রাজ্য ধর্মান্তরণ বিরোধী আইন পাশ করিয়েছে। কীভাবে তা সম্ভব হল? সংবিধান মেনে চললে তো তেমনটা হওয়ার কথাই নয়! কারণ, সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারা এদেশের মানুষকে ধর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। এখানে কোনও ব্যক্তি তো দূরঅস্ত, রাষ্ট্রও হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাও গেরুয়া তাণ্ডব চলছে। সেই সেই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে প্রশাসন হামলাকারীদের নয়, দায় চাপাচ্ছে উৎসবে যাঁরা অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের উপর। ভাবটা এমন, কী দরকার লাল-সাদা টুপি পরার! প্রয়োজনটা কী সান্তাবুড়ো সাজার? প্রধানমন্ত্রী গির্জায় গেলেই আম জনতাকে যেতে হবে নাকি? প্রধানমন্ত্রী চার্চের ঘণ্টা বাজালে দেশের অন্য হিন্দুদেরও হামলে পড়তে হবে নাকি? আর প্রশাসন যদি এমনটা ভাবে, বিভাজনের জল তাণ্ডবের দিকেই গড়াবে। অন্য কোনও ঢালে নয়! স্কুলে হামলা হবে, গির্জাতেও। সঙ্গে বাইবেল রাখলেও ‘গুন্ডাতন্ত্র’ মনে করবে, এই তো ধর্মান্তরণের ছক ছিল। জন্মদিনের পার্টির আয়োজন করলে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে ছেলেমেয়েদের। কেন? যদি ধর্মান্তরণ হয়ে যায়! রিপোর্ট বলছে, ২০১৪ সালে ভারতে খ্রিস্টানদের উপর হামলার সংখ্যা ছিল ১৪৭টি। আর ২০২৪ সালে সেটাই পৌঁছে গিয়েছে ৮৪০’এ। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্তই সংখ্যাটা ৭০২। মজার বিষয় হল, সব ঘটনার অভিযোগ দায়ের হয় না। এই যেমন গত ২৫ ডিসেম্বর এবং তার আগেপিছে যেসব তাণ্ডব হয়েছে, তার সব এফআইআর হয়নি। কোথাও আক্রান্তরা ভয়ে করেনি, কোথাও আবার নেওয়া হয়নি। সেই সংখ্যাটা বিচার করলে হিন্দুধর্ম লজ্জায় মাথা নীচু করতে পারে। কারণ, এমন শিক্ষা সে দেয়নি। নিগ্রহ, খুন, সামাজিক বয়কট, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেওয়া... এ তো হিন্দুধর্মের আধার নয়! অথচ, এই ধরনের হিংসায় সবার উপরে রয়েছে ‘রামরাজ্য’ উত্তরপ্রদেশ। তিনজন আদিবাসী মহিলার সঙ্গে যাচ্ছিলেন বলে দু’জন খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনীকে দুর্গ স্টেশন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ন’দিন পর তাঁরা জামিন পেয়েছিলেন। তাও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে। কেন ছিল এই গ্রেফতারি? শুধু সন্দেহের বশে। আদিবাসীদের তাঁরা নাকি কনভার্ট করাতে চান। ঐশ্বরিক ক্ষমতা বটে! মনের ভিতর ঢুকে তারা বুঝে নিচ্ছে ইচ্ছা-অনিচ্ছা। খবর চলে যাচ্ছে গেরুয়া বাহিনীর কাছে। তাদের তো আবার অবাধ ছাড়পত্র! তাণ্ডবের। বিবিধের মাঝে মিলন মহান? ছোঃ! সে আবার কী? স্বামীজি বলেছিলেন, ‘বহুত্বের মধ্যে একত্বই প্রকৃতির ব্যবস্থা, হিন্দুগণ এই রহস্য ধরিতে পারিয়াছেন।’ এরা একত্বের অন্যরকম মানেই করে ফেলেছে। রহস্য ধরেছে বটে, কিন্তু ধর্মে নয়... গুন্ডাগিরিতে। চারদিকে শুধু একটাই হাওয়া তোলা চলছে, ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’। আরে, হিন্দুধর্ম নিজেই এতটা মহান... তার বিশালত্ব এমনই... তাকে ‘খতরে মে’ ফেলা যায় না। আর তাকে ‘রক্ষা’ করার প্রয়োজনও পড়ে না। বৈদিক ধর্ম নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে। সব ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারে। গেরুয়া বাহিনীর তাণ্ডবকারী কোনও চুনোপুঁটিকে হিন্দুধর্মের রক্ষক হওয়ার দরকার পড়ে না। এবং এমন অবিবেচক, মূর্খের তো এই পরিধিতে জায়গাই নেই, যারা হিন্দুধর্মের সারবত্তা না বুঝে নিজেকে হিন্দু বলে জাহির করে। স্বামী বিবেকান্দের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে শিকাগো সম্মেলনে। তিনি বলেছিলেন, ‘হিন্দুগণ আবিষ্কার করিয়াছেন: আপেক্ষিককে আশ্রয় করিয়াই নিরপেক্ষ পরম তত্ত্ব চিন্তা উপলব্ধি বা প্রকাশ করা সম্ভব; এবং প্রতিমা ক্রুশ বা চন্দ্রকলা প্রতীকমাত্র, আধ্যাত্মিক ভাব প্রকাশ করিবার অবলম্বনস্বরূপ।’ স্বামীজি এখন থাকলে কী বলতেন? কী ভাবতেন? এই হিন্দুদের কথাই কি তিনি বলেছিলেন? যে আমেরিকার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ভারতের মহত্বের সামনে গোটা বিশ্বকে নত করিয়েছিলেন, সেই দেশই এখন বিবৃতি জারি করছে—ভারতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কারণ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। 
রক্ষা যদি করতেই হয়, তাহলে রক্ষক হতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতার, বহুত্বের, ঐক্যের। গুন্ডাতন্ত্রে হিন্দুধর্ম সিলমোহর দেয় না। হিন্দুধর্ম শেখায় সহিষ্ণুতা। সেখানেই তার ব্যাপ্তি। সাফল্য। বৈচিত্র্যকে সে গহনাস্বরূপ ধারণ করে অঙ্গে। সবার মতকে সম্মান করে। কারণ, সেই সব মতই যে একই পথে এসে মিলব। এই সারসত্য হিন্দুধর্ম যে বহু আগে বুঝেছে। তাই তো স্বামীজির সেই অক্ষয় বাণী... ‘একই আলোক ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের কাচের মধ্য দিয়া আসিতেছে। সকলের উপযোগী হইবে বলিয়া এই সামান্য বিভিন্নতা প্রয়োজন।’
গেরুয়া পরলেই তো আর স্বামী বিবেকানন্দ হওয়া যায় না! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ