দেশভাগের ‘কালপ্রিট’ দেগে দেওয়া হয়েছে সোজাসুজি দু’জনকে। একজন মহাত্মা গান্ধী এবং অন্যজন হলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। এ কোনও মঞ্চের ব্যাপার নয়, গেরুয়া অক্ষের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অনুপ্রবেশ ঘটল স্কুলপাঠ্যপুস্তকে। স্বভাবতই মোদি সরকারের নয়া স্কুল সিলেবাস ঘিরে বিতর্ক এখন চরমে। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ বিরোধীরা এবং নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চকারীরাও। যে নয়া সিলেবাস ‘উপহার’ দেওয়া হয়েছে তাতে দেশভাগের যন্ত্রণা নয়, বরং বিতর্ক এবং রাজনৈতিক স্বার্থই এবার পড়তে হবে স্কুল পড়ুয়াদের। এনসিইআরটি’র পাঠ্যসূচিতে ইতিমধ্যেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দেশভাগ বিষয়ক অধ্যায়। সেখানে পাকিস্তানের স্রষ্টা মহম্মদ আলি জিন্না এবং জাতীয় কংগ্রেসকে ‘কালপ্রিট’ চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত বড় দায় চাপানো কোন বিবেচনায়, কারও কাছেই পরিষ্কার নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এখানে কংগ্রেসের অর্থ—গান্ধীজি ও নেহরু। গেরুয়া শিবির বা উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা বরাবর প্রচার করে থাকে: গান্ধী-নেহরুই নাকি দেশভাগের প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করেছিলেন! অতএব মোদিযুগে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশের পড়ুয়ারা এভাবেই পড়বে ‘ইতিহাস’। মোদি সরকারের অঙ্গুলিহেলনে এই ‘বিশেষ পাঠ্যসূচি’ প্রকাশ হতেই তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। স্বভাবতই সরব বিরোধীরা। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা মোদি-শাহের কুক্ষিগত হওয়ার পর একদিকে যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে গেরুয়াকরণের চেষ্টা জোরদার হচ্ছ, তেমনই ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে কোমলমতি পড়ুয়াদের। সিলেবাসে আহত ইতিহাস সামনে আসার পর বিরোধীদের এই অভিযোগ কি অগ্রাহ্য করা যাবে?
শীর্ষ কংগ্রেস নেতা পবন খেরার দাবি, ‘একটি তথ্যও সঠিক নয়। ওই বই জ্বালিয়ে দেওয়া উচিত। ইতিহাসে যদি কোনও খলনায়ক কেউ থেকে থাকে, তা আরএসএস, কংগ্রেস নয়। বরং মুসলিম লিগের সঙ্গে মিলে হিন্দু মহাসভা দেশভাগে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল। ইতিহাস বিকৃতির জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এদের ক্ষমা করবে না।’ অন্যদিকে, দেশভাগের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে কংগ্রেসের ক্ষমাভিক্ষা দাবি করেছে বিজেপি। এনসিইআরটি’র ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ‘বিভাজন বিভীষিকা দিবস’ সংক্রান্ত এহেন বিশেষ মডিউল তালিকাভুক্ত হয়েছে। সেখানেই কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে নেহরু, গান্ধীসহ কংগ্রেসের তৎকালীন নেতৃত্বকে। কী রয়েছে সেই মডিউলে? সেখানে বলা হয়েছে, তিনটি ফ্যাক্টরেই দেশভাগ সংঘটিত হয়েছিল। (এক), বিভাজন নিয়ে জিন্নার একবগ্গা দাবি। (দুই), কংগ্রেস সেটি সাদরে গ্রহণসহ গোটা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। (তিন), লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভূমিকা। এরই পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, কংগ্রেস আসলে জিন্নাকে যথাযথ গুরুত্বই দেয়নি। তার ফল হয়েছে মারাত্মক। এমনকী দেশভাগ ইস্যুতে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়েছে, এর ফলে দেশের সুরক্ষা প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছে। নাম না করে পাকিস্তান সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আমাদেরই এক প্রতিবেশী দেশ নানাভাবে চাপ তৈরি করছে। মডিউলে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবনারও উল্লেখ রয়েছে। সেখানে জিন্না জানিয়েছিলেন, হিন্দু ও মুসলিমের জন্য দুটি পৃথক বাসস্থান, ভিন্ন ভাব-দর্শন, সামাজিক কাঠামো ও সাহিত্য প্রয়োজন। পাঠ্যসূচিতে থাকছে—মহাত্মা প্রথমে জানিয়েছিলেন তিনি কোনও পক্ষ হবেন না কিন্তু ১৯৪৭-এর ১৪ জুন তিনি নিজেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে দেশভাগের প্রসঙ্গ তোলেন। প্রস্তাব গ্রহণে সায়ও দেন তিনি। নেহরুও ছিলেন ওই পক্ষেই।
কংগ্রেসের অভিযোগ, বিশেষ পাঠ্যে বলা হয়েছে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন প্রথমে ১৯৪৮ সালের জুন মাসে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন কিন্তু পরে সেই ‘মাহেন্দ্রক্ষণ’ এগিয়ে আনা হয় একবছর। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট অনেকেই জানতেন না, তাঁরা আদতে কোথায় আছেন। ভারতে, নাকি পাকিস্তানে? দেশভাগকে মানব-সৃষ্ট বেনজির ‘ট্র্যাজেডি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নিয়ন্তা ছিলেন র্যাডক্লিফ, তাঁর কলমের খোঁচার নাম ‘র্যাডক্লিফ লাইন’ বা উপমহাদেশের দুর্ভাগ্য। বিশ্বের ইতিহাসে এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা দ্বিতীয় ঘটেনি। এই নিয়ে আজও দ্বিমত নেই। কিন্তু তার দায় চোখ বুজে কংগ্রেস বা নেহরু-গান্ধী এবং জিন্নার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এটি পরিষ্কার ইতিহাসের বিকৃতি এবং ক্ষমতা দখলের রাজনীতিরই অংশমাত্র। ভারতভাগের নেপথ্যে যে স্ফুলিঙ্গ, তার নাম হিন্দু-মুসলিম অনৈক্য। এই অনৈক্য বৃদ্ধি এবং তাকে চূড়ান্ত রূপদানের দায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা অস্বীকার করে কী করে? মুসলিম এবং হিন্দু—উভয় ধর্মের উগ্র অংশের নেতৃত্বকে এই দায় সমানভাবে নিতে হবে। সাড়ে সর্বনাশের আট দশকের মাথায় এসে, আজ আর বিলাপ কিংবা তরজা গাওয়া কোনও সমাধান নয়। দেশকে নির্দিষ্ট সময়ের ভিতরে সত্যিকার ‘অমৃতকালে’ পৌঁছে দিতে হলে দেশজুড়ে সার্বিক ঐক্য গড়ে তোলাই একমাত্র পথ। এই কাজেই মন দিতে হবে সবাইকে। তরলমতি ছেলেমেয়েদের মগজ ধোলাই করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছনো অসম্ভব। তাই সিলেবাস বদলের এই ‘কীর্তি’ অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।