সায়ন্তন মজুমদার: আজ আমার মায়ের ভাষায় সাহিত্যের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা অনেক মহামায়ার গল্প বলব। মহাষষ্ঠী উপলক্ষ্যেই সাহিত্যভাণ্ডারে প্রকট নন এমন দুর্গার লিখনবোধনে সচেষ্ট হওয়া।
সায়ন্তন মজুমদার: আজ আমার মায়ের ভাষায় সাহিত্যের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা অনেক মহামায়ার গল্প বলব। মহাষষ্ঠী উপলক্ষ্যেই সাহিত্যভাণ্ডারে প্রকট নন এমন দুর্গার লিখনবোধনে সচেষ্ট হওয়া।
বঙ্গসাহিত্যের আদি মধ্যযুগের একমাত্র নিদর্শন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যটির রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাসও কিন্তু নামের দিক থেকে দুর্গার সেবক। বংশী খণ্ডে জানা যায়, শিবদুর্গার দাক্ষিণ্যেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মনোহর মুরলীটি পেয়েছিলেন। শেষ ‘রাধাবিরহ’ খণ্ডে রাধাকে কৃষ্ণের বিরহজ্বালা থেকে বাঁচতে দূতী বড়ায়ি দিয়েছিলেন চণ্ডীপূজার বিধান— ‘বড় যতন করিয়া চণ্ডীরে পূজা মানিআঁ/ তবেঁ তার পাইবেঁ দরশনে।।’
বাংলা ভাষায় কিছু না লিখেও তিনি বাঙালির প্রাণের মানুষ। তাই রাজধানী কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনের সামনের উড়ালসেতুটি মিথিলার কবি বিদ্যাপতির নামাঙ্কিত। বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর বহু বিধান পঞ্চদশ শতাব্দীতে তাঁর লেখা ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী’ নামক বইটির সাহায্যে রচিত।
ওই শতকের শেষ দিকে আমরা পাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাল-তারিখযুক্ত বই মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’। ভাগবতের অনুবাদরূপে এটি রচিত হয় ১৪৭৩-৮০ খ্রিস্টাব্দে। আমরা জানি যে দেবী দুর্গা মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূতা হয়েছিলেন বলেই তাঁর নাম কাত্যায়নী। দেবীপক্ষের প্রথম নয় দিনে পূজিতা নবদুর্গার অন্যতমা তিনি। আজ অর্থাৎ ষষ্ঠীর দিনেই তাঁর পুজো হয়ে থাকে। অধুনাতন বাঙালির মতোই সে যুগে বৃন্দাবনের গোপবাসীরা নৃত্যগীতবাদ্যযোগে কাত্যায়নী মহোৎসবে মেতে উঠতেন।
কৃষ্ণের বিজয়কীর্তন সেরে পদাবলীতে রাধাকৃষ্ণের অভিসার ও গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদের শ্রেষ্ঠ কবি, দ্বিতীয় বিদ্যাপতি নামে পরিচিত গোবিন্দদাস কবিরাজের কথায় আসি। ষোড়শ শতাব্দীর এই কবি প্রথমে শাক্তরূপে চণ্ডীর উপাসনা করতেন। এই প্রভাবের মূলে ছিলেন তাঁর মাতামহ দামোদর সেন। নাতির জন্মকালে কন্যাকে তিনি দুর্গাযন্ত্রধৌত জল পান করিয়ে বিনা কষ্টে সন্তান প্রসবে সহায়ক হয়েছিলেন।
কাশীরাম দাস এবং তার আত্মীয়গণ সপ্তদশ শতাব্দীতে ‘ভারত-পাঁচালী’ নামে মহাভারত অনুবাদ করেন। যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া বাধা পায় প্রমীলার পুরুষহীন রাজ্যে। আসলে প্রমীলা ছিলেন এক রাজপুত্র। একবার সসৈন্যে বাবার সঙ্গে সেই মহাবনে শিকার করতে এসেছিলেন তিনি। তখন সেখানে বিহারে মত্ত ছিলেন শিবপার্বতী। প্রমীলার পিতাকে দেখে লজ্জা পেয়ে সকলকে অভিশাপের বলে নারী বানিয়ে দেন পার্বতী। পাশাপাশি প্রমীলাকে অপরাজিতা হওয়ার বরও দেন। সেই কারণেই তাঁর বলীয়ান কণ্ঠে উচ্চারিত হয় অনায়াসদৃপ্ত বচন—‘পার্বতীর বরে কারে ভয় নাহি করি/হাতে অস্ত্র কেহ নাই আসে মোর পুরী।।’
মঙ্গলকাব্য ধারায় চণ্ডীমঙ্গল সুপরিচিত হলেও অনেকটাই কিন্তু অজানা দুর্গামঙ্গল কাব্য। চণ্ডী এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণী অকালবোধনকে মিলিয়ে এর উদ্ভব সতেরো শতকেই। দ্বিজ কমললোচন, ভবানীপ্রসাদ রায়, রূপনারায়ণ ঘোষ এই ধারার কবি। ঘটনাচক্রে এরা সকলেই পূর্ববঙ্গের কবি—আজ যে দেশে দুর্গাপুজো চরম বিপন্ন। চণ্ডীর বিখ্যাত শ্লোকটির সরল অনুবাদ করেছিলেন দুর্গানামার্থক ভবানীবাবু—‘যেহি দেবী বুদ্ধিরূপে সর্বভূতে থাকে/নমস্কার নমস্কার নমস্কার তাকে।’
মধ্যযুগের একটি বিশিষ্ট ধর্ম হল বৌদ্ধ ও শৈবমিশ্রিত শিবযোগীদের নাথধর্ম। একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নাথসাহিত্যের অন্যতম ধারা হল গোরক্ষবিজয় বা মীনচেতন। এই ধারায় আন্তরিকভাবে অবগাহন করতে দেখি
কবি ভীমসেন রায়ের পাশাপাশি শেখ ফয়জুল্লাহকে।
কাহিনি অনুযায়ী নিরঞ্জনের মুখ থেকে নাথধর্মের আদিগুরু শিব ও সর্বশরীর থেকে গৌরীর উৎপত্তি হয়। এক সময় শিবগিন্নি স্বামীর চার শিষ্যকে পরীক্ষা করার জন্য নিমন্ত্রণের নামে বশ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সংযমের পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হন একমাত্র গোরক্ষনাথ। আজ যেমন দুর্গার মধ্যে আমরা বঙ্গদেশের হৃদয় হতে অপরূপ রূপে বাহির হওয়া জননীকে দেখি তিনিও সেদিন গৌরীকে সেভাবেই দেখেছিলেন— ‘তাহার কোলেতে বসি সুখে দুগ্ধ খাই/এমত জননী যদি কভু আমি পাই।।’
১৯২৩ সালে চন্দ্রকুমার দে-র সংগ্রহ ও দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় বাঙালি পায় মধ্যযুগের অভিনব গীতিকাসাহিত্য। ‘মৈমনসিংহ-গীতিকার অন্যতম পালা ‘মলুয়া’-র রচয়িতার নাম আমরা জানি না। ‘কমলা’ পালা লিখেছিলেন দ্বিজ ঈশান। এই দুটিতে যথাক্রমে শারদীয়া ও বাসন্তী দুর্গাপুজোর সুন্দর চিত্র ধরা পড়েছে— ‘দেশে আইল দুর্গাপূজা জগত-জননী।/ কুলের ছাল্যা বান্ধ্যা দিয়া পূজে দুর্গারানী।।’ এখনকার মতো তখনও বাংলায় যে দুর্গাপুজোর সময় বন্যাদুর্ভিক্ষ হতো,তার প্রমাণ এই পালায় পাওয়া যায়। আজও যেমন আমাদের কোনও কোনও ঘরে পুজোর সময় আনন্দ থাকে না,কারো কারো পুজো আনন্দে কাটে না, ঠিক তেমনি কয়েকশো বছর আগে একই দশা হয়েছিল কমলার। নানা বেশ, রঙ্গসজ্জা, ঢাকঢোলশঙ্খবাদ্য, নটীগীত যোগে ‘আইল চৈত্রিরে মাস আকাল দুর্গাপুজো’। প্রতিবেশীরা নতুন পোশাক পরলেও কমলা সেই সময় ঘরের কোণে কেঁদেছে। এদিকে কারুয়া অর্থাৎ কারুকার্যমণ্ডিত চাঁদোয়ার নীচে বিরাজ করছেন ‘মণ্ডপে মায়ের মূর্তি দেখিতে মনোহর’। এই পালায় রয়েছে বনদুর্গার কথাও।
বাংলা লোকছড়া, কলকাতার মারাঠা খালের মাধ্যমে আজও জীবন্ত হয়ে রয়েছে মারাঠি বর্গী হাঙ্গামার কথা। যারা ১৭৪২-৪৪ সালে তাণ্ডব চালিয়েছিল এই বাংলায়। তাদের নেতা ছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। অন্য প্রাদেশিক হলেও তিনি আশ্বিন মাসে একবার বাংলার কাটোয়ায় থেকে দুর্গাপুজো করেছিলেন। কিন্তু অতর্কিতে নবাব আলিবর্দী খাঁ-র সৈন্য চলে আসায় দুইদিন পরেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাটির দশ বছরের মাথায় কবি গঙ্গারাম তাঁর ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’-এর প্রথম খণ্ডে লিখেছিলেন, ‘সপ্তমী অষ্টমী দুই পূজা করি।/ ভাস্কর পলাইয়া যাএ প্রতিমা ছাড়ি।।’ নবাবী বহনিয়া বা ভারবাহীরা পুজোর জন্য সংগৃহীত প্রচুর মিষ্টান্ন, ছাগল, মাছ, মহিষ লুট করার অবাধ সুযোগ হাতছাড়া করেনি। কবির কল্পনাগুণে আমাদের মোহিত হতেই হয়। কারণ ভাস্করহত্যার জন্য নবাব আলিবর্দীর সহায়ক হয়েছিলেন অন্য আর কেউ নন— স্বয়ং মা দুর্গা। তিনি নাকি তাঁর সহচরী ভৈরবীদের আদেশ দিয়েছিলেন,‘ভাস্করকে বাম হইয়া নবাবকে সদায় হবি।’
আমরা বিদেশিকরূপে কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গির দুর্গার্চনার কথা মনে আনতে পারি। স্ত্রীর ইচ্ছায় এই পর্তুগিজ-খ্রিস্টান সাহেব বাড়িতে দুর্গোৎসব করতেন। তাঁর নামে প্রচারিত রচনাতেও নিহিত ছিল দুর্গার প্রতি ভক্ত পুত্রসুলভ আকুতি—‘দুর্গানাম-তরী, মস্তকেতে করি, যতন করিয়া রাখবো।/ আমার অন্তে শমন এলে,অজপা ফুরালে,/ দুর্গা দুর্গা ব’লে ডাকবো।’
জগজ্জননী দুর্গাকে বালিকাকন্যা রূপে পেতে হলে আমাদের শাক্ত পদাবলীর দ্বারস্থ হতে হবে। সাধক রামপ্রসাদের কালীসংগীত ছেড়ে আমাদের পড়তে হবে তাঁর লেখা দুর্গার বাল্যলীলার পদগুলি। সেখানে উমাকে মা মেনকা কিছুতেই শান্ত করতে পারছেন না। সে দুধ, ক্ষীর, ননী কিছুই খাবে না। শুধু আকাশের চাঁদকে পেতে বায়না করছে। পরে অবশ্য সেই চাঁদ শিবদুর্গার ললাটভূষণ হবে। কিন্তু সে কথা তখন তার অজানা তাই কেঁদে সে চোখ ফুলিয়ে দিয়েছে,গয়না ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত গিরিরাজ হিমালয় তাকে চাঁদ ধরে দেন। কীভাবে জানলে অবাক হতে হয়। ছোট্ট উমাকে কোলেতে বসিয়ে তিনি তার হাতে একটি আয়না ধরিয়ে দিয়ে নিজের মুখ দেখতে বলেন, যে মুখ কোটি চন্দ্রের শোভাকেও হার মানায়। অন্তিমে ভণিতায় কবি লিখেছেন, ‘শ্রীরামপ্রসাদে কয়, কত পুণ্য পুঞ্জচয়,/ জগত-জননী যার ঘরে।/কহিতে কহিতে কথা, সুনিদ্রিতা জগন্মাতা,/ শোয়াইল প’লঙ্ক-উপরে।।’
শেষ করব মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়ের মাধ্যমে। কিন্তু বহুচর্চিত অন্নদামঙ্গলের ধারকাছ দিয়েও যাব না। আমাদের আকর্ষণ ভারতজীবনের শেষ সৃষ্টি ‘চণ্ডী নাটক’। বাংলা-হিন্দি-সংস্কৃতের মিশ্রভাষায় রচিত এই নাটকটি বঙ্গসাহিত্যের প্রথম নাটক হতে পারত। কিন্তু ১৭৬০ সালে তাঁর প্রয়াণ সেই মহতী সম্ভাবনার অবলুপ্তি ঘটায়। দুর্গার মহিষাসুরমর্দনই ছিল নাটকটির একমাত্র আলম্বন বিন্দু। খট্ খট্ করে খুরের শব্দে,রাগে ফোঁ ফোঁ করে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে, সপ্ সপ্ করে লেজ নাড়াতে নাড়াতে,ঘর্ ঘর্ শব্দ করতে করতে সেখানে মহিষাসুরের আগমন ঘটেছে। পৃথিবীবাসীকে উপোস-উপাসনা ছেড়ে পার্থিব ভোগসুখে মজে থাকার কুহকে মাতিয়ে তুলতে চেয়েছে সে। দেবী চণ্ডিকা তাতে রেগে গিয়েও আশ্চর্যজনকভাবে হেসে উঠেছেন। তাতে যেন পৃথিবীতে প্রলয় এসেছে। কারণ নাটকের নটীর উক্তিতে স্পষ্ট— ‘দানব দলনে ধরণীমণ্ডলে তারিণী লে অবতারী।।’
মৃন্ময়ী মায়ের সেই হাসির পরশ চিরবিষাদময় চিন্ময় লোকসমাজেও সঞ্চারিত হোক এই প্রার্থনা করি, সর্বজনীন আনন্দে মুখরিত হোক এই শারদোৎসব।
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক