১৫ বছরের গানের পথ পেরিয়ে এসে টলিউডে কী কী পরিবর্তন দেখলেন?
১৫ বছরের গানের পথ পেরিয়ে এসে টলিউডে কী কী পরিবর্তন দেখলেন?
যখন শুরু করেছিলাম, বাংলা ছবিতে সঙ্গীতের ভূমিকা যে এতটা হতে পারে, তার কোনও ধারণা ছিল না। ছয়, সাত বা আট-এর দশকের সময়টা আলাদা। কিন্তু আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, ন’য়ের দশক, তারপর ২০০০-২০১০, বাংলা চলচ্চিত্রের গান যে আমাদের খুব প্রভাবিত করেছে, এমনটা নয়। বরং শিল্পীদের অ্যালবাম, স্বাধীন কাজ অনেক বেশি মনে ধরেছিল। আমি যখন কাজ করতে শুরু করি, ভাবতাম, এটা বোধহয় বিকল্প। মূল ধারার গান নয়। সেটাই ক্রমে মূল স্রোতে আসতে শুরু করল।
আর এখন বাংলা ছবির গান?
এখন বাংলা ছবিতে গানের সংখ্যা কমছে। সাউন্ড পাল্টেছে। মানুষের রুচি পাল্টেছে।
সিঙ্গলসের নতুন শ্রোতা তৈরি হচ্ছে?
নতুন শ্রোতা তৈরি হয় একটা পরিকাঠামোর জন্য। হঠাৎ করে তৈরি হতে পারে না। নব্বইয়ের দশকে পাড়ায় পাড়ায় ছিল ক্যাসেটের দোকান। ক্যাসেটের পাইরেসি হতো। রেডিওর বড় ভূমিকা ছিল।
প্রচুর এফএম চ্যানেল তৈরি হয়েছিল। হেমন্ত, মান্নার গান চালালে হয়তো শ্রোতারা শুনবে না ভেবে সমসাময়িক কিছু চালাতেন তাঁরা। তখন মানুষের কাছে সেটা নতুন ছিল। এভাবে গান মানুষের কাছে পৌঁছত। ধীরে ধীরে সোশ্যাল মিডিয়া এল। মানুষের কাছে গান পৌঁছনোর বড় মাধ্যম হল ভিডিও। তা দিতে পারে ছায়াছবি। এটাই এখনও অবধি গান পৌঁছে দেওয়ার সেরা উপায়।
পাইরেসি তো ক্ষতি করেছে?
একটা সময় বড় ক্ষতি করেছে। কারণ তখন থেকে গানের ‘ডিজিটাইজেশন’ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমিও এভাবে কিছু গান শুনেছি। এখন চলছে স্ট্রিমিং। এটা আসার পরে পাইরেসি কমেছে। কিন্তু স্ট্রিমিংয়ের পরিকাঠামোর সঙ্গে বাঙালি কতটা অভ্যস্ত হয়েছে, সেটা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।
কেন?
প্রবীণদের দেখেছি স্ট্রিমিং ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না। স্ট্রিমিং শুনছে নবীনরা। তাদের উপর ভরসা করে গান তৈরি হচ্ছে। এটা একটা অদ্ভুত সময়। তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া সাফল্যের নিরিখে জরুরি?
সাফল্যের অনেক স্তম্ভ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াও তেমনই একটা স্তম্ভ। সোশ্যাল মিডিয়ায় যদি কেউ জনপ্রিয় হয়, সেটা নিঃসন্দেহে একটা সাফল্য। তার মানে এই নয় যে, বাকি সব কিছুতেও সে সফল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবই প্রোডাক্ট। একটা সাবানও যা, একটা গানও তাই।
একজন শিল্পীর কাছে লাইভ অনুষ্ঠানের গুরুত্ব কতটা?
মঞ্চে আসলে একটা ম্যাজিক তৈরি হয়। ওই যে সমবেত অনুভূতি, এর কোনও বিকল্প আমি খুঁজে পাইনি।
‘চৈত্র শেষে বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠানটি কতটা আলাদা?
বর্তমান-এর মতো একটি সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান, যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় সাংবাদিকতা করছে, তারা একটি অনুষ্ঠানের কথা ভেবেছে এবং আমাকে ভেবেছে। এটা বন্ধুত্বের হাত। ‘বর্তমান’-এর সঙ্গে আমরা কাজ করছি। এটা আমার জীবনে বড় পাওনা। আমাদের বাড়িতে দীর্ঘদিন ‘বর্তমান’ এসেছে। ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’, ‘সুখী গৃহকোণ’ আমরা নিয়মিত বাড়িতে রাখতাম। নজরুল মঞ্চে আগামী ৫ এপ্রিলের অনুষ্ঠান কিন্তু আর পাঁচটা অনুষ্ঠানের মতো ভাবছি না। এর মধ্যে এমন অনেক গান থাকবে, যেগুলো অন্য অনুষ্ঠানে গাইনি। যাঁরা টিকিট কাটছেন, তাঁদের তো একটা প্রত্যাশা রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে খানিকটা অনুভূতি আদানপ্রদান করব। সেই অভিজ্ঞতাটা অর্জন করার জন্য আমরা মুখিয়ে রয়েছি। নিশ্চিতভাবে এটা ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান হতে চলেছে।
ফরমায়েশি গান সময়ের মধ্যে জমা দিতে না পারলে সামলান কীভাবে?
এটার কোনও সমাধান নেই। আমার হাতে যদি একটা গান তৈরি করার জন্য ৩০ দিন থাকে, আমি জানি না গানটা কবে আসবে। এই অনিশ্চয়তা আমাকে পীড়া দেয়। আবার এর মধ্যে আনন্দও আছে। সময়ের মধ্যে জমা দিতে গিয়ে গানের মানের সঙ্গে আপস না হয়ে যায়, সেটার ভয় লাগে। কিন্তু এই যে ফরমায়েশ করা হচ্ছে, তার মধ্যেও তৃপ্তি রয়েছে। যেদিন ফরমায়েশ করা হবে না, সেদিন আমি কী করব?
এই মুহূর্তে আপনি কার গান শুনছেন?
একটা বিদেশি পপ ব্যান্ডের গান শুনছি। ‘বিচ হাউস’। আর কিছু পাঞ্জাবি গান শুনছি। এটা শুনলে অনেকে নাক সিঁটকাতে পারেন (হাসি)। কিন্তু আমি মাঝেমধ্যে শুনি। অনেক কিছু শেখার থাকে।
বাংলায় নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে?
বাংলা গানে নতুন প্রজন্মের খুব বেশি আগ্রহ দেখতে পাই না। একটু প্রতিভা থাকলেই তারা মুম্বইমুখী। ক্রমাগত নতুন প্রতিভা আসে, আবার চলেও যায়। এটা আমাকে পীড়া দেয়। যে সৃজনশীল, সে বাংলায় সৃজনশীলতা দেখাতে পারছে না। কারণ তার মনে হচ্ছে বাংলায় খুব বেশিদূর এগনোর নেই।
এর কারণ কী?
অনেক কারণ হতে পারে। হয়তো নতুন প্রজন্ম যথেষ্ট পরিমাণে অনুপ্রাণিত নয়। বাংলায় যা দেখছে, শুনছে, তা খুব উৎকৃষ্ট মানের নয়।
অনুপ্রাণিত করার দায়িত্ব কাদের?
আমাদেরই। এখন আমরা, যারা কাজ করছি, তারা যথেষ্ট পরিমাণে অনুপ্রাণিত করতে পারছি না।
এটা ব্যর্থতা বলে মনে করেন?
অবশ্যই ব্যর্থতা! ওরা কীসের আশায় কাজ করবে? সেই আকর্ষণ খুব কম।
এর সঙ্গে তো অর্থনীতি জড়িয়ে?
অর্থনীতি একটা বড় কারণ। বাংলা ভাষার প্রতি তো কারও দায় নেই যে, এই ভাষাতেই জীবনপাত করে দেবে। সেই সময়টা চলে গিয়েছে। সকলেরই নিজের পেট চালানোর দায়। ফলে একটু ভালো সুযোগ পেলে সে চলে যাবে। এখন জগৎটা ছোট হয়ে গিয়েছে। হিন্দি বা ইংরেজিতে একটা দারুণ সিরিজ দেখার পর বাংলার কনটেন্ট তার ঝাপসা লাগছে। সে কেন দেখবে? আমরা এমন একটা প্ল্যাটফর্মে আছি, যেখানে কোল্ড প্লে, এড শিরান, অরিজিৎ সিং সকলে একসঙ্গে আছেন। সেখানে টিমটিম করে বাংলা গান প্লে লিস্টে জায়গা করে নিতে পারছে না। তাকে বড় কিছু করতে হবে। নাহলে তাকে খুঁজে বের করতে হবে বাংলায় কী অনন্য জিনিস আছে, যা কোল্ড প্লে করতে পারবে না।
ট্রোলিং সামলান কীভাবে?
চোখে পড়লে খারাপই লাগে। আমি মৃত্যুকামনাও করতে দেখেছি। যার মৃত্যুকামনা করা হল, সে পড়লে ভাববে, কাদের জন্য গান করি? তবে এটাও ঠিক, যাঁরা এসব লিখে আনন্দ পাচ্ছেন, তাঁরাই সব নন। ভালো কিছু হলে, মাথায় তুলে নাচা হচ্ছে। আবার একটু বিগড়োলে মাটিতে ফেলে আঘাত করা হচ্ছে। সেই ক্ষমতাটা সোশ্যাল মিডিয়া দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া দেখতে চাইলে সহ্যশক্তি বাড়াতে হবে।
প্রস্মিতার (পাল) সঙ্গে দাম্পত্য কী শেখাল?
(একটু ভেবে) একজন মানুষের সঙ্গে স্পেস শেয়ার করা, তার সঙ্গে থাকা... অনেকটা ছাড়তে শেখায়। অন্যজনের প্রায়োরিটিকে গুরুত্ব দিতে শেখায়।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য