মৃণালকান্তি দাস: জিরি। একটি ছোট্ট নদী। যার পশ্চিম পাড়ে অসমের কাছাড় জেলা। অন্য পাড়ে মণিপুরের নতুন জেলা জিরিবাম। ইম্ফল জেলা ভেঙে ২০১৬-তে তৈরি হওয়া এই নতুন জেলার লোকসংখ্যা কমবেশি পঁয়তাল্লিশ হাজার। শেষ নভেম্বরে সেই জিরিবাম হঠাৎ করেই সংবাদের শিরোনামে। নৃশংসভাবে তিনজন মহিলা ও তিনটি শিশুকে হত্যা করে জিরি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং মৃতদেহ উদ্ধার করার চেষ্টায় প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা সর্বত্র সমালোচিত হয়। মণিপুরের জাতি সংঘর্ষে জিরিবাম এর আগে অশান্ত হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত ছোট্ট জেলাতেও সংঘর্ষের আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ভারত সরকারের ঘুম ছুটে গিয়েছিল।
গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, মণিপুরে শেষ ২১ মাসে যে অস্ত্র ঢুকেছে, তা জোগান দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি থেকে, যাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’। এই দেশগুলিতে খুব সস্তায় অস্ত্র পাওয়া যায়। এরা ড্রাগ নেটওয়ার্কের সঙ্গেও যুক্ত। সম্প্রতি নাকি ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি মণিপুরে ড্রোন হামলার পিছনে বিদেশি শক্তির যুক্ত থাকার সাক্ষ্যপ্রমাণ পেয়েছে। ফলে স্পষ্ট, মণিপুরে সংঘর্ষে প্রায় দুই ডজন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন তাদের স্বাধীন ভূমির দাবিতে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রেখেছে। এবং তার সঙ্গে যোগ হয়েছে, মেইতেইদের সঙ্গে কুকি-জোমি-চিনের লড়াই। এই সাঁড়াশিচাপের মুখে পড়ে, মণিপুরের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।
মণিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি। এই প্রথম বার নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন আরোপ করা ভারতীয় রাজ্যের তালিকায় মণিপুরের স্থান শীর্ষে। স্বাধীনতার পর থেকে মোট এগারো বার। কিন্তু রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে কি মণিপুরকে শান্ত করা গিয়েছে? লোকসভায় বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রায় দু’বছর ধরে গোষ্ঠী-সংঘর্ষে মণিপুর উত্তপ্ত। অথচ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধ থামাতে ইউক্রেনে যেতে পারলেও মণিপুরে কেন একবারও যেতে পারেন না? উত্তর-পূর্ব ভারতীয় সমাজের মধ্যে একটি গভীরপ্রোথিত তীব্র ক্ষোভ আছে, তাঁদের ভারতীয় সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। আজ এই অভিযোগকে বর্ণে-বর্ণে সত্য বলে স্বীকার করে নিতে হবে— মণিপুরের ঘটনার প্রতিক্রিয়া, অথবা আন্তরিকতার অভাব তা প্রমাণ করে দিয়েছে বারবার।
একথা ঠিক, প্রধানমন্ত্রীর হাজার কাজ আছে। শিল্যানাস থেকে শুরু করে নির্বাচন। দেশের বাইরেও প্রধানমন্ত্রীর কাজের শেষ নেই। গত দু’বছরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সময় পেয়েছেন। অবশ্যই জাতীয় স্বার্থে এহেন পরিক্রমা। শুধুমাত্র মণিপুরের জন্য যত বিড়ম্বনা। মণিপুরে তিনি কখনও যাননি এমন নয়। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার পত্তন করার জন্য গিয়েছেন। ‘ন্যাশনাল পাম অয়েল মিশন’ প্রবর্তন উপলক্ষে গিয়েছেন। হাজার হাজার একর জমিতে পাম গাছ লাগানোর ফলে মণিপুরের অর্থনীতির কতটা উন্নতি হবে তার ব্যাখ্যা করেছেন। শুধু বলেননি, পাম গাছ ভূমির কী কী ক্ষতি করে। রাজ্যের খনিজ সম্পদ নিয়েও মন্তব্য করেছেন। শুধু বলেননি, ওইসব খনিজ পদার্থ ভূগর্ভ থেকে কোন সংস্থা উত্তোলন করবে। সেই মণিপুর সম্পর্কে এখন তিনি প্রায় নীরব। সংসদের ভাষণে মাত্র ৪৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন,
মণিপুরে দ্রুত শান্তি ফেরানো দরকার। সেই শান্তি আজও অধরা!
তাকিয়ে দেখুন, ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত মণিপুরে সামাজিক-রাজনৈতিক-জাতিগত হিংসায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত এবং গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা অগুনতি। মেইতেই ও কুকি-জো গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়ঙ্কর হিংসায় আহত-সর্বস্বান্ত মানুষের সংখ্যা অগণন, লক্ষাধিক, শয়ে শয়ে বাড়ি অগ্নিদগ্ধ। গোটা দেশ দেখেছে, রাজপথে মহিলাদের লাশ পড়ে রয়েছে, কখনও নদীতে ভেসে উঠছে। মহিলা, শিশুদের ত্রাণ শিবির থেকে অপহরণ করা হচ্ছে। গণধর্ষণ, হত্যা, যৌন নির্যাতন, অহেতুক প্রহার, ভয় দেখানো, সবই চলেছে ধারাবাহিকভাবে। এ যেন সংঘাতের অনিবার্য প্রক্রিয়া!
রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার পর খানিকটা আশার আলো দেখা গিয়েছিল। রাজ্যপাল অজয়কুমার ভল্লা নির্দেশ দিয়েছিলেন, সাত দিনের মধ্যে লুট করা সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র ফেরত দিতে হবে। ওই নির্দেশে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছিল। নিরাপত্তাবাহিনী সূত্রে জানা গিয়েছে, ইম্ফলে সিএমজি বন্দুক, বিভিন্ন রকমের রাইফেল, রাইফেলের ম্যাগাজিন, আইইডি বিস্ফোরক এবং গুলি সহ অন্তত ৩০০ অস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন বেশ কয়েকজন। অবস্থা আয়ত্তের মধ্যে আসা মাত্র মণিপুরে শুরু হয়েছিল ‘শাহী’ অ্যাকশন। ৮ মার্চের মধ্যে রাজ্যের সব রাস্তা সচল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কিন্তু ৮ তারিখ থেকেই কুকি বিক্ষোভে ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মণিপুর। অবরোধ তুলতে গেলে সেনার সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। বদলে যায় গোটা পরিস্থিতি।
প্রশ্ন হল, এতদিন পরও কিন্তু কেন জাতিগত সংঘর্ষের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না? মণিপুরের পশ্চিমে অসম, দক্ষিণে মিজোরাম এবং উত্তরে নাগাল্যান্ডের সীমানা। এ ছাড়া মায়ানমারের সঙ্গে ৩৯৮ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে, ভারত সরকার বুঝতে পেরেছিল যে ভারত-মায়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে জনজাতির মানুষদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে, তাঁদের ঐতিহ্যগত জীবনধারা এবং জীবিকা নির্বাহে অসুবিধা হবে। এই ভাবনা থেকে, ১৯৫০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পাহাড়ি জনজাতি, যাঁরা হয় ভারতের বা বার্মা ইউনিয়নের নাগরিক এবং যাঁরা ভারত-বার্মা সীমান্তের উভয় পাশে ৪০ কিমির মধ্যে যে কোনও অঞ্চলে বসবাসকারী, তাঁরা ভ্রমণ-নথি ছাড়া এই সীমান্ত
দিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন। এই বিশেষ ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয় ‘ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম’। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সীমান্তের ওপারে বসবাসকারী জনজাতীয়দের জাতিগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বজায় রাখার পাশাপাশি সীমান্তের উভয়
পাশের মানুষের অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য এই রেজিম চালু রাখা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, কুকি, জোমি, চিন, নাগা, মিজো জনজাতির মানুষরা এই ফ্রি মুভমেন্ট রেজিমকে ব্যবহার করে গিয়েছেন অস্ত্র, ড্রাগ, কাঠ এবং আফিম চোরাচালানের নেটওয়ার্ককে বজায় রাখার জন্য।
২০২১ সালে মায়ানমারে অভ্যুত্থানের পরে, মায়ানমার থেকে মণিপুরে শরণার্থীদের অভিবাসন রোধের জন্য, ভারত সরকার ২০২২-এর সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম স্থগিত করার চেষ্টা করে। এই অঞ্চলে অস্ত্র ও মাদক পাচার, সোনা চোরাচালান নেটওয়ার্কগুলি ধ্বংস করার জন্য মণিপুর সরকার ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে ‘আন-অ্যাডমিনিস্টার্ড এরিয়া’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্মাণ, মিজো এবং নাগাদের মায়ানমারে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের থেকে আলাদা করবে, এই যুক্তিতে মিজোরাম এবং নাগাল্যান্ড সরকার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার বিরোধিতা করে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে, ভারত-মায়ানমার সীমান্তে মাত্র ৩৮ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি সীমান্ত এখনও খোলা। আর সেই খোলা সীমান্তই অশান্তির অবাধ ভূমি। সেসব আটকাতে মণিপুরের নিজস্ব আর্মড পুলিস বাহিনীর পাশাপাই ডেকে আনা হয়েছে অসম রাইফেলস-এর জওয়ানদের। কেন্দ্রীয় সরকার মণিপুরে পাঠিয়েছিল বিএসএফ এবং সিআরপিএফ জওয়ানদের। তাতে কোনও কাজ হয়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের পর ভারতের দিক থেকে এখন নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মায়ানমার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আশঙ্কার একটি উৎস। বিভিন্ন মাধ্যমে এও প্রচার করা হচ্ছে যে, মায়ানমারে চিন প্রদেশ এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত অঞ্চলকে। উদ্দেশ্য নাকি— দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত মহাসাগর ও তার আশপাশের অঞ্চলে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির এক প্রভাববলয় তৈরি করা। এই এলাকায় বিশেষ করে কুকিদের মতো খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বা নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মেঘালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মায়ানমারে চিন প্রদেশের খ্রিস্টীয় ধর্মের অনুসারী বাসিন্দাদের নিয়ে নাকি ক্রাউন কলোনি মডেলে ‘বাফার স্টেট’ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তাতে প্রথম বিশ্বের নজর রাখতে সুবিধা হবে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। স্বভাবতই তাতে যুক্ত হয়েছে বেজিং এবং ইসলামাবাদের নামও। নতুন এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ এখন এই সমস্যাকে এক বিরল রূপ দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রকে মণিপুরে আফস্পার এলাকা এবং মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে। আগামী ৬ মাসের জন্য গোটা রাজ্যে বলবৎ থাকবে সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন। কেবল মণিপুর নয়, উত্তর-পূর্বের আরও দুই রাজ্য নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল প্রদেশেও আফস্পা জারি করা হয়েছে। অমিত শাহের মন্ত্রক বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে, ১৩টি থানা এলাকা বাদ দিয়ে গোটা মণিপুরে বলবৎ থাকবে আফস্পা। এছাড়াও অরুণাচল প্রদেশের তিরাপ, চাংলাং, লংডিং জেলা এবং তিনটি থানা এলাকায় আফস্পা চাপানো হয়েছে। নাগাল্যান্ডের আটটি জেলা এবং ২১টি থানা এলাকাতেও আগামী ৬ মাস বলবৎ থাকবে আফস্পা। সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন ‘আফস্পা’ তোলার দাবিতে যে মণিপুরে ইরম শর্মিলা চানু চোদ্দো বছর ধরে অনশন চালিয়েছিলেন, সেই আফস্পাকেই শান্তি ফেরানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
দক্ষিণ এশিয়ার তথাকথিত ‘চিকেন নেক’ এখন আন্তর্জাতিক আলোচ্য। হিন্দু বা খ্রিস্টান রাষ্ট্র তৈরির কথা বাদ দিলেও, মণিপুরে জমি, সংরক্ষণ, বৈধ ও অবৈধ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে মেটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান, সব রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠীদের আলোচনার টেবিলে বসানো। তবে সে কথা বলা সহজ। করবে কে?