আধারই আজকের ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি। এর থেকে ছাড় নেই ছোটদেরও। এই নথি পেশ করার পরই স্কুলে শিশুদের মিড ডে মিল খাওয়ার অধিকার মেলে। মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সমেত যাবতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতেও ছেলেমেয়েদের আধার নম্বর থাকা চাই। পড়ুয়াদের স্কুলে রেজিস্ট্রেশন, যেকোনও ধরনের ছাত্রবৃত্তি এবং অন্য ধরনের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণের জন্য আবেদন করতেও আধার নথি পেশ অত্যাবশ্যক। গোটা ছাত্রজীবনকেই যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দেওয়া হয়েছে এই এক নথির রজ্জু দিয়ে! উঠতে বসতে আধার পেশের আবশ্যকতা থেকেই বিপাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে ছেলেমেয়েদের। ব্যাপারটা আধার কর্তৃপক্ষ বা ইউআইডিএআইয়ের একটি তথ্যেই পরিষ্কার: গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলার সওয়া কোটি শিশু ও কিশোরের বাধ্যতামূলক বা ম্যান্ডেটরি বায়োমেট্রিক আপডেট (এমবিইউ) নেই। ফলে তাদের আধার কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে। বয়সের নিরিখে ধরে নেওয়া যায় যে, এদের বেশিরভাগই স্কুলপড়ুয়া। নিষ্ক্রিয় আধার তো কোনও সরকারি কাজেই গ্রাহ্য নয়। আটকে যেতে পারে তাদের উপর্যুক্ত প্রতিটি প্রয়োজন।
বিষয়টি যে নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পরীক্ষায় বসার মতো কোনও বিষয় বিঘ্নিত হলে তো ছেলেমেয়েদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কারণ একবার যদি তারা পরীক্ষায় বসতে না পারে, তাতে তাদের একটি বছর নষ্টের মতো বিপদ উপস্থিত হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াদের আধার আপডেট করার প্রক্রিয়া দ্রুত সেরে ফেলার জন্য রাজ্যের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশেষ নির্দেশ পাঠাচ্ছে রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষাদপ্তর। আধারের এই ধরনের ‘আপডেট’ হয় ৫-৭ বছর বয়সের মধ্যে। ১৫-১৭ বছর বয়সসীমার মধ্যেও কাজটি করা সম্ভব। আধার ‘আপডেট’ করার নিয়ম আঙুলের ছাপ এবং চোখের মণির ছবি দিয়ে। ইউআইডিএআই সংস্থা জানাচ্ছে, রাজ্যে ৫-৭ বছর বয়সি বালক-বালিকাদের মধ্যে ৪২.১৯ লক্ষ জনের এমবিইউ বাকি রয়েছে। আর ১৫-১৭ বছর বয়সিদের মধ্যে এখনও ৮৩.৪ লক্ষ কিশোর-কিশোরীর আধার ‘আপডেট’ নেই। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি সওয়া ১ কোটির অধিক। এই প্রেক্ষিতে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা কমিশনার অরূপ সেনগুপ্ত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের সমস্ত ডিআই’কে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। স্কুল স্তরে বিনামূল্যেই এই কাজ করানো যাবে। বিকাশ ভবনের কর্তারা জানাচ্ছেন, আধার কর্তৃপক্ষের অধীনে যেকোনও রেজিস্ট্রার বা এনরোলমেন্ট এজেন্সি, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে এই কাজ করা যাবে। ওইসঙ্গে ৬৯০টি আধার এনরোলমেন্ট কিট দেওয়া হবে ব্লকগুলিতে। এই কিট প্রতিটি ব্লক পাবে দুটি করে। এজন্য আধার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া ৮.৯০ কোটি টাকা রাজ্য সরকার খরচ করছে। অতীতে একইভাবে বণ্টিত কিটগুলির মধ্যে মাত্র ৩৪টি নাকি কার্যকর রয়েছে! তাই আরও কিট দেওয়া হবে। ফোন নম্বর আপডেট করার ফি অবশ্য মেটাতে হবে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদেরকেই।
ইউআইডিএআই সূত্রে প্রাপ্ত সংখ্যা নিয়ে শিক্ষাদপ্তরের কিছু সংশয় রয়েছে। কারণ, পূর্ববর্তী দু’বছরে বহু ছাত্রছাত্রীকে এই বাধ্যতামূলক আপডেটের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন করে কার্ডও করানো হয়েছে অনেকের। সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গে আধার কার্ডধারীর সংখ্যা সারা ভারতের নিরিখে বেশ ভালো। তবে রাজ্যে ‘আপডেট’ হয়নি এমন আধারের সংখ্যা কত? এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবশ্য রাজ্য শিক্ষাদপ্তরের হাতে নেই। স্কুলশিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, চাকরিতে প্রবেশ প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই আধার এখন অপরিহার্য। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ সময়োচিত এবং স্বাগত। প্রসঙ্গক্রমে এই কথাও মাথায় রাখতে হবে যে, আধার তৈরি এবং সংশোধন কোনোটাই কিন্তু জলের মতো সহজ ব্যাপার নয়। প্রথমত, দুই ধরনের আবেদন করতেই নাগরিকের কালঘাম ছুটে যায়। দ্বিতীয়ত, আবেদন করামাত্রই আধার হাতে আসে না। ঠিকানা, যোগ্যতা প্রভৃতি যাচাই পর্ব সেরে আধার ইস্যু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অযথা দেরি করে। বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, এবং যথানিয়মে একাধিকবার আবেদন করেও আধার পাননি এমন ভারতবাসীর সংখ্যা কিন্তু ফেলনা নয়। তাই সংশোধিত আধার পেতে ছোট ছেলেমেয়েদের যাতে বিন্দুমাত্র হয়রানি না-হয় সেটা এখনই নিশ্চিত করা দরকার। এমনিতেই ‘মহান’ ভারত অনেক কিছুর মতোই যথেষ্ট পিছিয়ে শিক্ষায়। আমাদের আর পিছনোর জায়গা নেই। তাই অনাবশ্যক কারণে একটিও ছেলে বা মেয়েকে পিছিয়ে দেওয়া ক্ষমাহীন অপরাধ বলেই গণ্য হবে।