ভারতই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। দেশে ভোটার প্রায় ১০০ কোটি! অনেকগুলি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ধাঁচের শাসনব্যবস্থা এখানে। এই কারণে কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, রাজ্য বিধানসভাগুলির জন্যও নেওয়া হয় পৃথক ভোট। স্থানীয় সরকারও বদলে যায় নির্বাচনের মাধ্যমে। ফলে নির্বাচন এক সংবৎসরের ‘উৎসব’। বলা বাহুল্য, রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের উপজীব্য হল মানুষ। গণতান্ত্রিক আদর্শে আস্থাশীল দলগুলি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষের স্বার্থে, মানুষেরই জন্য রাজনীতির চর্চা করে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষার জন্য প্রতিজন নির্বাচকের ভোট নেওয়া হয়। স্বচ্ছতার নীতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রের কাছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে না। এই গুরুদায়িত্ব পালনে দেশে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) নামক একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি নির্বাচনে কিছু প্রার্থী দেওয়াই যথেষ্ট নয়। যোগ্যতম প্রার্থীকে নির্বাচনের জন্য নির্বাচকদের একটি তালিকা প্রস্তুত রাখতে হয়। পুরোনো তালিকা ধরে ভোটগ্রহণ কাম্য নয়। কারণ কিছু ভোটারের মৃত্যু হওয়া এবং ঠিকানা বদলে যাওয়া স্বাভাবিক। পুরোনো তালিকায় কিছু জাল, অযোগ্য এবং অবৈধ ভোটার থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এজন্য নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করার পাশাপাশি কিছু নাম প্রতিবছর ছেঁটেও ফেলতে হয়। এটাই হল ভোটার তালিকার সংশোধন, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
এবারও তা হচ্ছে। নাম দেওয়া হয়েছে এসআইআর ২০২৬। আর এই কাজটি নিয়ে স্মরণকালের মধ্যে কোনোবার এত হইচই হয়নি। এবার সংশোধনী কথাটির পূর্বে একটি ‘বিশেষ’ শব্দ সংযোজন করে হইচইয়ের মাত্রা বহুবর্ধিত করা হয়েছে। ইসিআই যেমন তেমন, বস্তুত শোর মাচিয়ে ছেড়েছে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি। মোদি-শাহদের পার্টির ভাবখানা এই, কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন করতে নয়, ‘চোর’ ধরতে নেমেছে! প্রথমে প্রায় সকলকেই সন্দেহের তালিকায় রেখে আসরে নেমেছে ইসিআই। অথচ কমিশনের তরফে মুখে বলা হল, ভোটার তালিকা সংশোধন করার মূল লক্ষ্য, নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফেরানো। এজন্য গোড়ার গলদ দূর করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনও বুথের তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট এবং বিদেশিদের নাম থাকবে না। অর্থাৎ এই স্বচ্ছতার নীতিতে বাংলাসহ দেশজুড়ে একেবারে নিখাদ তালিকা উপহার দেবে কমিশন। এটাই কাম্য এবং প্রতিটি সুনাগরিকেরও চাহিদা অভিন্ন। আর এই মহৎ ‘অভিযানে’ নামার আগে জানিয়ে দেওয়া হল, ২০০২ তালিকায় যাঁর নিজের নাম আছে তাঁর কোনো সমস্যা নেই। তবে বৈধ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কোনো কারণে যাঁর নাম ওই তালিকায় অনুপস্থিত তাঁর বাবা-মা কিংবা কোনো গ্রহণযোগ্য আত্মীয়ের নামের লিঙ্ক’ দিতে হবে। তাহলে কোনোপ্রকার আপত্তি উঠবে না। এছাড়া কম বয়স কিংবা অন্য একাধিক কারণেও এই ধরনের লিঙ্ক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এর বাইরেও যেসব বৈধ নাগরিক বাদ পড়েছেন তাঁদের ক্ষেত্রে দেখাতে হবে কিছু গ্রাহ্য নথি। তারও একটি তালিকা ইসিআই দিয়েছে। বলে রাখা দরকার, এই তালিকা একবারে পাওয়া যায়নি। তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দল বিস্তর চেঁচামেচি করার পরই কমিশন নথির তালিকা বারবার বদল এবং অবশেষে একটু দীর্ঘ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর মাফিক খসড়া ভোটার তালিকা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। সন্দেহজনক ভোটারদের ‘পাশ/ফেল’ ঠিক করতে এখন চলছে শুনানি। এই পর্বে নাগরিকদের যে অনাবশ্যক হেনস্তা হচ্ছে, তা বেনজির। এর মধ্যে কারসাজিরও গন্ধ পাচ্ছেন অনেকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো এজন্য সরাসরি ইসিআইয়ের বিরুদ্ধেই আঙুল তুলেছেন। বাংলার জননেত্রীর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে ‘টার্গেট’ করে মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর দাবি, বহু মহিলার নাম একাধিক বাজে অজুহাতে বাদ দেওয়া হচ্ছে। নতুন ভোটার, পরিযায়ী শ্রমিক, শিফট (স্থানান্তরিত) ভোটার প্রভৃতি নাম বাদ গিয়ে থাকলে জবাব চাইবার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। শুনানিতে বিএলএদের প্রবেশাধিকার নাকচ হওয়া নিয়েও বেজায় ক্ষুব্ধ মমতা। তাঁর অভিযোগ, ‘কেউ গেলেই অ্যান্টি বেঙ্গলি, অ্যান্টি ন্যাশনাল দেগে দেওয়া হচ্ছে!’ ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘এ কোনো আইনে নেই, দলদাসদের মাথা থেকে বেরিয়েছে।’ যাঁরা রাজনীতির চর্চা করেন তাঁরা জানেন, মমতার বিপুল জনপ্রিয়তা এবং ভোটের ভিত্তি হল মহিলা, গরিব মানুষ এবং অবহেলিত শ্রমজীবী জনগণ। কারণ তাঁর আজীবনের রাজনীতি তাঁদের কল্যাণের জন্য। মমতার দেড় দশকের প্রশাসনের নিকট অগ্রাধিকারও তাঁরা। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ সত্যি হলে, এসআইআরের মূল লক্ষ্য কি তবে তাঁর রাজনীতির ভিত্তিমূলে চোরাপথে কুঠারাঘাত করা? বিজেপি কি তবে সেই ‘স্পেশাল চাইল্ড’ যাকে সবসময় কোনো-না-কোনো ক্রাচ নিয়ে চলতে হয়?