শিষ্য—বৈদিক গূহ্যবিদ্যা সাধনের উপদেশ মাত্র গুরুশিষ্যের মধ্যেই আলোচ্য, বেদোপনিষদাদিতে কোথাও কি ইহা বর্ণিত আছে? তন্ত্রমতে মাতৃকা বর্ণ বীজমন্ত্রাদির ব্যবস্থা আছে। বৈদিক সাধনায়ও কি তাহা আছে? গুরু—আছে বৈকি? বৃহদারণ্যকোপনিষদে দেখিবে জনক রাজার রাজসভায় যাজ্ঞবল্কের সহিত ব্রহ্মজ্ঞান বিষয়ক বিচারে মহর্ষি আর্ত্তভাগ যখন যাজ্ঞবল্ককে জিজ্ঞাসা করিলেন “ক্বায়ং তদা পুরুষোভবতি” অর্থাৎ মৃত্যুতে পুরুষের দেহেন্দ্রিয়াদি স্বকারণে লয় হইলে এই পুরুষ তখন কোথায় থাকে। প্রকাশ্য সভায় পুরুষ বা আত্মা সম্বন্ধীয় গূহ্য রহস্য আলোচ্য নহে বলিয়া তাহার উত্তরে যাজ্ঞবল্ক বলিলেন “আহর সৌম্য হস্তম্ আর্ত্তভাগ আবামেবৈতস্য বেদিষ্যাবঃ ন নাবেতৎ সজন ইতি”—অর্থাৎ হে সৌম্য আর্তভাগ, তুমি আমার হস্তগ্রহণ কর, এই তত্ত্ব আমরা দুইজনেই মাত্র জানিব, এই সজন অর্থাৎ জনবহুল স্থানে নহে। উপনিষদে বর্ণিত আছে অতঃপর তাঁহারা দুইজনে নিভৃতে সেই তত্ত্ব আলোচনা করিয়াছিলেন। আত্মতত্ত্ব ও গূহ্যসাধনতত্ত্ব যে মাত্র গুরুশিষ্যের মধ্যেই আলোচিত হইত উপনিষদের বহু স্থানে ইহা বর্ণিত আছে।
বর্ণমালা সম্বন্ধে ছান্দোগ্যোপনিষদে আছে “তান্যভ্যতপৎ তেভ্যোহভিতপ্তেভ্যো ওঁকারঃ সম্প্রাস্রবৎ তদ্ যথা শঙ্কুনা সর্ব্বানি পর্ণানি সংতৃন্নান্যেবমোঙ্কারেণ সর্ব্বা বাক্ সংতৃন্নোঙ্কার এবেদং সর্ব্বমোঙ্কার এবেদং সর্ব্বম্” অর্থাৎ প্রজাপতি বাক্যের অক্ষর সমূহ ধ্যান করিলে সেই বর্ণ সমূহের সার ওঁঙ্কার প্রাদুর্ভূত হইলেন। পত্রের শঙ্কু (নাল) দ্বারা যেরূপ পত্রের অবয়ব সমূহ বিধৃত ও ব্যাপ্য ওঁঙ্কার দ্বারাও তদ্রূপ বাক্ বিধৃত ও ব্যাপ্ত। এই সকল (বর্ণ সমূহ) ই প্রণব, সকলই প্রণব। স্বরবর্ণ, উষ্ম এবং স্পর্শ ব্যঞ্জন বর্ণাদি সম্বন্ধে ছান্দোগ্যোপনিষৎ বলেন—“সর্ব্বে স্বরা ইন্দ্রস্যাত্মনঃ সর্ব্বে উষ্মাণ প্রজাপতে রাত্মানঃ, সর্ব্বে স্পর্শা মৃত্যোরাত্মানঃ।” অর্থাৎ অকারাদি সকল স্বরবর্ণ ইন্দ্রের আত্মা। সকল উষ্মবর্ণ প্রজাপতির আত্মা, ককারাদি সকল স্পর্শবর্ণের আত্মা মৃত্যু। বেদে উণপঞ্চাশৎ বর্ণমালাকে মূল বর্ণ বলা হয়। প্রণবের এই ঊণপঞ্চাশৎ বর্ণভেদকে ঊণপঞ্চাশৎ বায়ুও বলা হয়। তন্ত্র মতে বর্ণমালার সংখ্যা পঞ্চাশৎ বলা হয়। কারণ সাধনানুকূল ভাবে ক হইতে স পর্যন্ত এই ৩২টি ব্যঞ্জন বর্ণকে ক্ষ এই যুক্তাক্ষর রূপে একটি পৃথক বর্ণ বলিয়া গ্রহণ করা হইয়াছে। এই যুক্তাক্ষরে “স” টি ষত্ব বিধানানুসারে যুক্ত হইয়া “ষ” হইয়াছে।
শ্রীসুধীররঞ্জন সেনগুপ্তের ‘ঔপনিষদিক সাধন রহস্য’ থেকে