Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘বারো ভুঁইঞা’ প্রতাপাদিত্যের দশভুজার পাশে গোবিন্দ জিউ

রাজত্বও  নেই, নেই রাজাও। আছে কেবল ‌঩ইতিহাস আর বর্ণময় জনশ্রুতি। পুজো এলেই সেসব জনশ্রুতি প্রজাপতির মতো রঙিন ডানা মেলতে শুরু করে।

‘বারো ভুঁইঞা’ প্রতাপাদিত্যের দশভুজার পাশে গোবিন্দ জিউ
  • ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: রাজত্বও  নেই, নেই রাজাও। আছে কেবল ‌঩ইতিহাস আর বর্ণময় জনশ্রুতি। পুজো এলেই সেসব জনশ্রুতি প্রজাপতির মতো রঙিন ডানা মেলতে শুরু করে। বাংলার বারো ভূঁইঞার কথা এখন শুধু ইতিহাস বইয়ে শোনা যায়। আর শোনা যায়, বৈদ্যবাটির সাবেক ধনাঢ্য চৌধুরীদের ঠাকুরদালানে। সেখানে আছে বাঙালির সনাতন একচালার ‘উমা’র ছবি গুলিয়ে দেওয়া এক বেনজির দেবীপ্রতিমা। চৌধুরীদের একচালায় সরস্বতীর স্থানে বিরাজ করেন গোবিন্দ জিউ, মুরলীধর কৃষ্ণ-কানাইয়া। থিম পুজোর বহুস্তরীয় আলোকমালায় অভিনব দুর্গা আর ইতিহাস সবই ঢাকা পড়েছে। শুধু পুজোর সময় ঐতিহ্যের শিকড় ধরে দেবী উদ্ভাসিত হন। পুজিতা হন ঐতিহাসিক নিষ্ঠা আর জনশ্রুতির পেলব পরত নিয়ে।

Advertisement

বর্তমানে বৈদ্যবাটির গোবিন্দনগরে পুজো হয় ওই বিরল একচালার প্রতিমার। কার্তিকের মাথার উপর চৌধুরীদের স্থাপন করা বংশীবাদনরত মূর্তি বারো ভুঁইঞাদের কাল থেকে পুজো পাচ্ছে। ওপার বাংলা থেকে দেবীর ভদ্রাসন পার করে আনতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিমার বদল হয়নি। তারই জেরে প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে এক বিরল দশভুজার একচালায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়ে চলেছে। প্রায় নিরুচ্চারে।
চৌধুরীদের সাবেক শিকড় আছে আকবরের আমলের অবিভক্ত বঙ্গদেশে। বর্তমান বাংলাদেশের যশোরে দাপুটে সাম্রাজ্য গড়েছিলেন অন্যতম বারো ভুঁইঞা প্রত‌াপাদিত্য ও তাঁর কাকা বসন্ত রায়। সেকালে ফরিদপুরের ক্ষমতাশালী পুরুষ ছিলেন শিবরাম সার্বভৌম। চৌধুরীদের পারিবারিক ইতিহাস বলে, ১০২০ বঙ্গাব্দে বসন্ত রায়(কেউ বলেন, প্রতাপাদিত্য) স্বপ্নাদেশ পান, তাঁদের কুলদেবতা গোবিন্দজিউকে সার্বভৌম পরিবারে পাঠাতে হবে। বসন্ত রায় তখন ওড়িশায়। পুজো মরশুমে সার্বভৌম বাড়িতে তখন দশভুজার প্রতিমা গড়া শুরু হয়েছে। এদিকে স্বপ্নাদেশে বাড়িতে বিগ্রহ নিয়ে হাজির দাপুটে ভুঁইঞা। কোথায় থাকবেন গোবিন্দ জিউ? জনশ্রুতি, গোবিন্দজিউকে বেদজ্ঞ শিবরাম, লক্ষ্মী ও নারায়ণ রূপে গ্রহণ করলেন। স্থান দেওয়া হল, দুর্গার একচালায়। চালার গঠন ঠিক রাখতে বাদ পড়লেন সরস্বতী। শিবরাম নিজে পণ্ডিত মানুষ হলেও সরস্বতীকেই কেন চালা থেকে সরালেন, তার যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর মেলে না। বৈদ্যবাটির চৌধুরীদের ঘনিষ্ঠ শ্রীরামপুরের প্রাবন্ধিক সুমন্ত বড়াল বলেন, ‘ওই পরিবারের দাবি, লক্ষ্মী-নারায়ণ একসঙ্গে থাকবেন, সেই দর্শনকেই মান্যতা দেওয়া হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ের সামজিক সংস্কারের কারণে কার্তিক ও গণেশের মতো পুরুষ দেবতাকে সরাতেও হয়ত চাননি চৌধুরীরা। বেদজ্ঞ শিবরাম বিরল পুজোর নিজস্ব নিয়ম তৈরি করে গিয়েছিলেন। শিবরামপুরাণই বৈদ্যবাটির চৌধুরীদের পুজোর আশ্রয়।’ শতাব্দী প্রাচীন পুজোর কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া ভার। ১৯৪৭ সালে সার্বভৌমরা ভারতে আসেন। বৈদ্যবাটির গোবিন্দনগরে বসতি গড়েন। ১৭ শরিকের সেই পরিবার প্রতিষ্ঠা করে অভিনব দুর্গার আধুনিক ভদ্রাসন। স্বাধীন ভারতের আধুনিক বঙ্গপ্রদেশের বিরল পুজোর ধারাতে নতুন মাত্রাজুড়ে গিয়েছিল সেদিন থেকেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ