ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: একটা গোপাল ভাঁড়ের বড়ই অভাব। মন্ত্রীর জালিয়াতি হোক বা নবাবের ষড়যন্ত্র, কৃষ্ণচন্দ্রকে উদ্ধারের জন্য সে সময় গোপাল ভাঁড় ছিলেন সদাপ্রস্তুত। আদতে সভার ভাঁড় হলেও সভাসদদের শুধু হাস্যরস উপহার দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হতেন না। বুদ্ধির জোরে গোটা কৃষ্ণনগরকে রক্ষার গুরুদায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। প্রায় আড়াইশো বছর কেটে গিয়েছে। এখন অবশ্য গোটা রাজনীতিই যেন একটা আস্ত ভাঁড়। যেখানে গেরুয়া থেকে শুরু করে ডান-বাম সব দলের সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ সময়-অসময়ে এমন আচরণ করে চলেছেন, যা আমাদের কারও কাছে নিছক কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। কেউ বলছেন, গো-প্রস্রাবে রোগ সারে, গোরুর দুধে খাঁটি সোনা আছে। অনেকে আবার কপালে তিলক দিয়ে আস্ত ষাঁড়কে ‘গো-মাতা’ বলে সম্বোধন করছেন। শুধু মন্তব্যই নয়। তার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কারও কারও নানা কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের কাছে হাসির রসদ হয়ে উঠছে। তাই একসময় প্রত্যেক রাজসভায় যে ভাঁড়ের প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক ছিল, তা এখন রাজনীতির কারবারিরাই করে দিচ্ছেন। তবে অভাব সেই বুদ্ধির। রাজার পিঠে ছুরি মারতে যাঁরা চক্রান্ত করছেন, তাঁদের থেকে রাজ্যকে উদ্ধার করার মতো এ যুগের গোপাল ভাঁড়দের অনেকাংশেই অভাব।
একটা প্রথা তো এখনকার দিনে বেশ প্রচলিত। যার নাম দেওয়া হয়েছে কাগজের ভাষায় ‘ঘোড়া কেনাবেচা’। ভোটের আগে এক দলের বিধায়কদের একাংশকে হাইজ্যাক করে লাক্সারি বাসে তুলে লোকচক্ষুর আড়ালে কোনও এক রিসর্টে নিয়ে গিয়ে রেখে দেওয়া। সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সকলেই জানেন যে, তাঁরা কোথায় রয়েছেন। অথচ আদতে তাঁরা যে দলের বিধায়ক তারাই নাগাল পাচ্ছে না! কয়েকদিন পর জানা গেল যে, ওই বিধায়করা সকলে দলবদল করে ‘অপহরণকারী’ নির্দিষ্ট শিবিরের ঝান্ডা ধরেছেন। ব্যাস! সংখ্যাগরিষ্ঠতার দৌলতে ফকির হয়ে গেল রাজা। অর্থাৎ যারা কোনও রাজ্যের সরকার গড়ে ফেলল, তারা হয়তো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মানুষের বিচারে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল। টাকার জোরে সরাসরি গদিতে। আর সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস রাখা আম আদমি একেবারে বোকা বনে গেলেন। আর যে দলের প্রার্থী ভেবে সেইসব প্রতিনিধিকে মানুষ ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা এক রাতের মধ্যে দলবদলু। হায় রে গণতন্ত্র, হায় রে তার পরিকাঠামো।
অবশ্য এটাও ঠিক যে, এক দলে টিকিট না পেয়ে অন্য দলে গিয়েও এখনকার এই দলবদলুরা অনেকসময় বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেন না। কৃষ্ণচন্দ্রের আমল হলে প্রতারকদের উচিত শিক্ষা দিতে গোপালের জুড়ি মেলা ভার ছিল। এ যুগে অনেক ক্ষেত্রে গোপালের ভূমিকা জনগণই নিয়ে নেন। অর্থাৎ উচিত শিক্ষা।
দলবদলুদের কথা ধরলে, কেউ কেউ তৃণমূল কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নাম করেছিলেন। তারপর সেই থেকে এলাকার নেতা, তারপর বিধায়ক এমনকী সাংসদও। কিন্তু হঠাৎ করেই কৃষ্ণচন্দ্রের মন্ত্রীর ন্যায় খোদ শাসক দলকে ‘ধোঁকা’ দিয়েই গেরুয়া চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়েছেন। হঠাৎ করেই সাধারণ মানুষের নেতা থেকে দলের জোরে কপালে তিলক কেটে তর্জন-গর্জন করে নিজেকে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছেন। এমনকী জেলার নেতার তকমা সরিয়ে তিনি শহরের বুকেও লড়াইয়ের হুঙ্কার দিচ্ছেন। দল বদলের পুরস্কার হয়তো পেয়েছেন, তবে অহংবোধ এতটাই যে, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার কথা ভাবছেন। হয়তো ভুলেই গিয়েছেন যে,সেই নেতার নাম আগে গোটা রাজ্যের ক’টা লোক জানত। অলীক কল্পনাবশে তিনি ভাবনার জাল বুনেছেন। সে যাই হোক, তাঁর এই স্বঘোষিত নেতাগিরির জবাব মানুষ দিতে প্রস্তুত। ২০২৬ তো দূর, ২০৫৬-তেও গেরুয়া পতাকাকে বাঙালিরা মেনে নেবেন কি না, সন্দেহ আছে। আর বিজেপি যে কখনওই তর্জন-গর্জন করা নেতাদের দায়িত্ব দেয় না, তা দিল্লি নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কাজেই দলবদলুরা চিরকালই রাজনীতির আঙিনায় তো বটেই, মানুষের কাছেও সুযোগসন্ধানি বিশ্বাসঘাতক হয়েই থেকে যান।
এ তো গেল এক গেরুয়া রাজনীতির ‘বাঙালি ভাঁড়’-এর কথা। এমনও নেতা আছেন, যিনি অন্য কেরিয়ার ছেড়ে বেশি লোভে কেন্দ্রীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাকে অসম্মান করতে একদা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। দিনের পর দিন হয়তো তাঁকে ‘তিলকধারী’দের কাছে দমেই থাকতে হয়েছে। জেতার পরও যা প্রাপ্য ছিল, তা মেলেনি। অবশেষে বোধোদয়। রাজ্যের শাসক দলে যোগদান। তবে মানুষ যে তাঁরও অহঙ্কার ভুলে যাননি। তাই শেষমেশ ঘাসফুলের ছত্রছায়ায় এলেও এখনও আনুগত্য প্রমাণের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। হয়তো, গোটা রাজনৈতিক জীবনই তাঁর এভাবেই কেটে যাবে। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও প্রথম সারিতে তিনি হয়তো কোনওদিন জায়গাই পাবেন না।
কেউ কেউ তো দলবদলকে রুটিন করে নিয়েছেন। শুধুমাত্র ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। ভেবে নিয়েছিলেন, স্বজাতির এলাকায় তাঁকে কেউ হারাতেই পারবে না। ব্যক্তিই সব। দলের কোনও জোর নেই। শিল্পাঞ্চলে হিন্দি ভাষাভাষীর মানুষের জোরে সবুজ হোক বা গেরুয়া, তিনিই রাজনীতির সেরা ‘মাফিয়া’। আখেরে কী হল? একবার তৃণমূল, একবার বিজেপি। এই করে করে শিল্পাঞ্চলের সেই তাবড় ত্রাসকেও রাস্তায় ফেলে মানুষ পিটিয়েছে। এমন ঘটনাও নাকি ঘটেছে। আর এখন তো তিনি ‘না ঘর কা না ঘাট কা’। দলবদলের গেরোয় এঁদের মতো আরও বহু নেতা আছেন। কেউ বা কোনও এক দলের ডাকসাইটে নেতা থেকে অন্য দলে গিয়ে বিছানাশয্যা! সেই নেতা এখন কেমন আছেন, সেই খবর সিংহভাগই হয়তো জানেন না। অথচ এঁদের কেউ কেউ অতি লোভে তাঁতি নষ্ট করেছেন আর উচিত শিক্ষাও পেয়েছেন। এক্ষেত্রেও ভাবনায় সেই গোপাল। ধূর্তদের যেমন শিক্ষা দিতেন গোপাল ভাঁড়। এমনকী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও যদি জব্দ করার জন্য ছলনার আশ্রয় নিতেন, তাহলে তাঁকেও জবাব দিতে ছাড়তেন না গোপাল।
একবার রাজসভায় কৃষ্ণচন্দ্র বানিয়ে বানিয়ে বললেন, কাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম অন্ধকারে যাওয়ার সময় গোপাল আর আমি দু’জনে পড়ে গেলাম। তবে আমি পড়লাম গিয়ে ক্ষীরের পুকুরে আর গোপাল বর্জ্যের। তারপর স্বপ্ন ভেঙে গেল। সভাসদদের সকলে রাজার কথার তোয়াজ করে হাসির রোল জুড়ে দিলেন। কিন্তু গোপাল একটুও রাগ না করে উল্টে বললেন, আরে মহারাজ আপনার তো ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তবে আমিও সেই একই স্বপ্ন দেখেছি। আমার ঘুম ভাঙেনি। তাই তারপর কী হয়েছে জানি। মহারাজ সঙ্গে সঙ্গে উৎসুক হয়ে বললেন, তাই কী হয়েছে বল তো!
ব্যাস! মহারাজ পড়লেন ফাঁদে। গোপাল জানালেন, সেই পুকুর থেকে দু’জনেই উঠলেন। তবে অন্ধকার হওয়ায় কেউই তো কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। এদিকে দু’জনের গা-ই চটচট করছে। তাই তাঁরা ঠিক করলেন যে, একে অপরের গা চেটে পরিষ্কার করে দেবেন। মানে, গোপালের গায়ে লেগে বর্জ্য আর মহারাজের ক্ষীর। এবার বুঝে নিন।
প্রায় আড়াইশো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। আর সেই রাজতন্ত্রও নেই। কালের নিয়মে রাজত্ব এখন গণতন্ত্রের হাতে। তাই রাজসভার বিকল্প মন্ত্রিসভায় তথাকথিত ‘ভাঁড়’ নামক সেই আসনও লুপ্ত। কিন্তু গোপাল ভাঁড় আজও যে সাধারণ জীবনে প্রাসঙ্গিক, তা বলাই বাহুল্য। তবে গোপাল ভাঁড়ের দরকার রাজনীতিতেও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল হোক বা সাধারণ মানুষ। প্রতারকদের জবাব দিতে, চাটুকারদের মুখ বন্ধ করতে গোপালের মতো বুদ্ধিধরের সত্যিই অভাব। গণতন্ত্র আর রাজনীতির কোপে পিষছে সাধারণ ভোটার। বর্তমান আধুনিক সমাজ আর জীবনশৈলি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলের থেকে অনেকটাই বদলেছে। তবে রাজনীতির ভণ্ডামি রুখতে অবশ্যই দরকার গোপাল ভাঁড়ের।
ভাঁড় কথাটা যদি একটু ভালোভাবে বলা যায়, তাহলে হয় ভণ্ড। না না, গোপালের ক্ষেত্রে ভণ্ডের সমার্থক ভাঁড়ই। মানে যিনি সভার মাঝে সকলকে আনন্দ দিতে সদাব্যস্ত। আর বর্তমান রাজনীতিতে যা হচ্ছে, সেটাও ভণ্ড। তবে তার অর্থটা ভাঁড়ামো বা জনসাধারণকে নিছক মজা দেওয়া নয়। বরং মানুষের একাংশের ভুলে যাওয়ার রোগ, মানিয়ে নেওয়ার ধৈর্য আর প্রশ্ন তোলার বদলে ‘এরকম তো সবসময়ে হয়েই থাকে’ —এই ধারণার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে ভণ্ডামি অর্থাৎ চাতুরি করে যাওয়ার রেওয়াজ। রাজনীতির ভাঁড়ামি অর্থাৎ ভণ্ডামি এখন এটাই। আমরা হয়তো মনে মনে বিদ্রুপের হাসি উপভোগ করি। হয়তো সেইসব দলবদল তথা মত বদলের কারিগরদের গালিগালাজও করি। কিন্তু রাজনীতির রেওয়াজ বদলায় না। কারণ জনপ্রতিনিধিরা বুঝে গিয়েছেন, তাঁদের এই ভণ্ডামি মানুষ একদিন ভুলে যাবেন। আবার তাঁদের সমর্থনেই গলা ফাটাবেন। কারণ তাঁরা সামনে থেকে মানুষের জন্য দরদি মনকে বিজ্ঞাপন হিসেবে তুলে ধরেন। আর পিছনে রাজনীতির আঙিনায় নিজেদেরই আখের গোছান। ঠিক রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ মন্ত্রীর মতো। তিনি রাজামশায়ের সামনে সাধারণের জন্য নিবেদিত প্রাণ। আর তা শুনে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র যেই না তাঁকে দশের কাজে মোহর বরাদ্দ করলেন অমনি তা ঢুকল পকেটে। শুধু কি সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছলচাতুরি। স্বয়ং রাজামশায়ের বিরুদ্ধেও চলছে ষড়যন্ত্র। কীভাবে ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কৃষ্ণচন্দ্রকে ফাঁদে ফেলা যায়। তাতে ক্ষতিটা হচ্ছে গোটা কৃষ্ণনগরের। ধূর্ত সভাসদদের সেই কারসাজি আজও চলছে দেশের নানা রাজ্যে। নিজের আখের গুছিয়ে শাসক শিবির, তার সঙ্গে রাজ্যবাসীকে ফাঁদে ফেলা। অবশ্য নদীয়ারাজে প্রতিবারই মন্ত্রীর চক্রান্ত থেকে বুদ্ধিবলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও গোটা কৃষ্ণনগরকে উদ্ধার করতেন গোপাল। ভাঁড়ামোর আড়ালে ঘোল খাইয়ে দিতেন ভণ্ডদের। আজকের দিনে সেরকমই এক গোপালের খুব দরকার। যিনি বুদ্ধিবলে রাজনীতির ভণ্ড কারবারিদের মুখোশ খুলে একেবারে পাঁকে ফেলে তাঁদের কর্দমাক্ত করে ছাড়বেন।