বুধবার বিরাট স্বস্তি পেলেন শিক্ষকরা। খুশি রাজ্য সরকারও। কারণ প্রাথমিকের ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল রাখল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। এজন্য এদিন বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের বেঞ্চ প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশ খারিজ করল। উচ্চ আদালতের ডিভিশন স্পষ্ট করেই জানিয়েছে, উদ্দেশ্যহীন তদন্ত এবং সেই সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া যায় না। ন্যায়বিচারের সময় আদালতকে একটি সীমার মধ্যে থেকেই কাজ করতে হয়। আদালত নিজের পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী নতুন নীতি তৈরি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া বদল করতে পারে না। সব নিয়োগ বাতিলের আগে কোর্টের সামনে উপযুক্ত প্রমাণসহ একটি সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, এই মামলার তথ্য থেকে এমন উপসংহার টানা যাচ্ছে না বলেই জানিয়েছে উচ্চ আদালত।
এই রায় ভোটের মুখে রাজ্য সরকারকেও বিরাট স্বস্তি দিয়েছে। খুশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ তিনি কারও চাকরি খাওয়ার পক্ষে নন, তাঁর সরকার দেড় দশক যাবৎ বেকার যুবদের চাকরি দেওয়ার পক্ষেই কাজ করে চলেছে। যেখানে সরকারি চাকরি দেওয়ার সুযোগ নেই, সেখানে নানা উপায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেই প্রয়াসী নবান্ন। এজন্য মমতার সরকার দুর্গাপুজোসহ নানাধরনের উৎসবকেও হাতিয়ার করেছে। তিনি চোখ খুলে দেওয়ার আগে কারও ধারণাই ছিল না যে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে ৬৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। তার মধ্যে ৬৫-৭০ শতাংশ অবদান একা কলকাতা মহানগরের। এছাড়া শরতে, হেমন্তে, শীতে অসংখ্য মেলার আয়োজন থেকেও বাংলার অর্থনীতি চাঙ্গা থাকে। গ্রীষ্ম এবং বর্ষা ঋতুর সুযোগও নেয় এই সরকার। দিকে দিকে আম এবং ইলিশ উৎসব এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শুধুমাত্র মহিলাদের কর্মসংস্থান এবং আর্থিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সবলা’ নামে মেলার আয়োজন করেন। এতে বিরাট ভূমিকা থাকে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর। কৃষক বা কৃষিজীবীদের উন্নয়নে কৃষিমেলা, মাটি উৎসব, পুষ্প প্রদর্শনী প্রভৃতিও হয়। মোদি সরকার ১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) বন্ধ করে দেওয়ার পর বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে নবান্ন। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যও বিশেষ প্রকল্প চালু করেছেন মানবিক মুখ্যমন্ত্রী। সব মিলিয়ে নানাভাবে বিপুল কর্মসংস্থানই মা-মাটি-মানুষের সরকারের প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধিতে বাংলা যে এখন বিশেষ অবদান রেখে চলেছে, তার পিছনে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অভিনব ও ফলপ্রসূ অর্থনৈতিক ভাবনা। বস্তুত হাইকোর্টের বুধবারের রায় মুখ্যমন্ত্রীর কর্মসংস্থান চিন্তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিল।
ওইদিন মুর্শিদাবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘শিক্ষকরা বিচার পেয়েছেন। কথায় কথায় কোর্টে গিয়ে চাকরি খেয়ে নেওয়া ঠিক নয়।’ তিনি যোগ করেন, ‘বিচার বিচারের মতোই চলবে। বিচারব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা করি।’ বিকাশ ভবনে সাংবাদিকদের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, ‘এই রায়ের ফলে হৃত সম্মান অনেকটাই পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি। মহামান্য আদালতের উপরে সাধারণ মানুষের ভরসা আরও প্রোথিত হল।’ নাম না করে বিজেপি এমপি অভিজিৎ গঙ্গ্যোপাধ্যায়কেও একহাত নেন তিনি। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, ‘যিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি পরে একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়েছেন। তাঁর রায় রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ছিল কি না, তা সাধারণ মানুষই বিচার করুক।’ সিপিএম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য অবশ্য বলেন, ‘এই রায় দুর্ভাগ্যজনক। এতে দুর্নীতি প্রশ্রয় পাবে।’ আর এক সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী অবশ্য বলেন, ‘এই রায়ে যে শিক্ষকরা স্বস্তি পেলেন, তাঁদের বড়ো অংশই যোগ্য। তবে, দুর্নীতি হয়নি আদালত বলেনি।’ যাবতীয় বিতর্ক সরিয়ে রেখে বলা যায় যে, এই রায় রাজ্য সরকার ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের কাছে বিরাট জয়। বিধানসভা নির্বাচনের আগে শাসক দল এমনই একটি দিনের প্রতীক্ষায় ছিল। রাজ্যবাসী আশা করে, আগামী দিনে এমন বিতর্কিত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে না। সবক্ষেত্রেই নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে যাবতীয় স্বচ্ছতা বজায় রেখে। বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে শিক্ষাক্ষেত্রে। কেননা, শিক্ষকরা সাধারণ চাকরিজীবী নন, তাঁদের উপর এক গোটা জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা, সব স্কুলের শিক্ষক সংকট দ্রুত মিটে যাবে এবং ছেলেমেয়েরা নিয়মিত পড়ার সুযোগ পাবে। কেননা, শিক্ষক নিয়োগ ইশ্যুতে সবচেয়ে ক্ষতি যাদের হয়েছে তারা গরিব বাবা-মায়ের সন্তান, তাদের মধ্যে একটা বড়ো অংশই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া।