Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

গৌতম বুদ্ধ

সম্প্রতি আমার স্টাডি টেবিলে একটি পাথরের বুদ্ধ মূর্তি স্থান পেয়েছে। এটি আমি পোর্টব্লেয়ার থেকে জিএসটি সহ যথাযথ মূল্যে কিনেছি।

গৌতম বুদ্ধ
  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

চিরন্তন প্রামাণিক: সম্প্রতি আমার স্টাডি টেবিলে একটি পাথরের বুদ্ধ মূর্তি স্থান পেয়েছে। এটি আমি পোর্টব্লেয়ার থেকে জিএসটি সহ যথাযথ মূল্যে কিনেছি। যদিও ভগবান বুদ্ধকে জাগতিক কোনও মূল্যে আদৌ কেনা সম্ভব কি না, এরকম বৈপ্লবিক, তাত্ত্বিক, অরাজনৈতিক, কাব্যিক এবং দার্শনিক প্রশ্ন আমার মনকে মাঝে মাঝেই ঝাঁকি দিয়ে যায়। তথাপি সেই মূর্তিকে নিজের সম্পত্তি ভেবে আমি এক ধরনের শ্লাঘা বোধ করি। এই বোধকে আধ্যাত্মিক দেমাক বা দৈবিক অহংকার বলা যেতে পারে। আমাদের পাড়ার এক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী দাদা আছেন, যাঁকে বলতে শুনেছি পয়সা ফেললে মাগুরের আঁশ, মোরগের ডিম, সুতির রেনকোট, রংহীন রামধনু, হৃদয়হীন ভালোবাসা, এমনকী হাসিমুখো গাধা পর্যন্ত জোগাড় হয়ে যায়। বুদ্ধ তো এই সেদিন পর্যন্ত লুম্বিনীর বাগানে মর্নিং ওয়াক করতেন, তাঁকে কেনা আর কী এমন!

Advertisement

দোকানদার দর হেঁকেছিল সাতশো আশি। মেরেকেটে পাঁচ ইঞ্চির মূর্তির এত দাম কেন, জিজ্ঞাসা করাতে উত্তর পেলাম, সেটি কোরাল ডাস্ট দিয়ে তৈরি। দুনিয়ায় মাটি যেখানে এত সহজলভ্য, সেখানে ডানপিটে সমুদ্রের মর্মমূল থেকে কোরাল তুলে, কঠিন নির্মমতায় তাকে মেশিনে গুঁড়িয়ে, বুদ্ধ মূর্তি স্থাপনের ভিতর কী কারণ আমি বলতে পারব না। অবশ্য লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া মানব জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেজ খসে গেছে কবেই, এবার বুদ্ধি বিসর্জনের পালা। কোরাল ডাস্টের তৈরি তথাগত নিশ্চয়ই আরও বেশি প্রাণময় হবেন! তিনি নিশ্চয়ই আমার উপর ধারাবাহিকভাবে আরও বেশি আশীর্বাদ বর্ষণ করবেন! আমি মোহিত হয়ে দেবমূর্তির দিকে তাকিয়ে রইলাম। আহা! অমন সুন্দর মুখখানি যদি আমার হতো! নিদেনপক্ষে ওই মায়াময় চোখ!
আম বাঙালি দরদামের ক্ষেত্রে যে দক্ষতা এবং ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, আমার পক্ষে সেই আর্ট এখনও কব্জা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এর দু’টি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। এক, আমি স্বল্পভাষী এবং সততই তর্কাতর্কি এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। অনর্গল কথা বলা আমার কাছে দুঃখবাহিনী নদীর মতো, ঝলসে ওঠা ছুরির মতোই দুঃসহ। দুই, আমি সত্যি সত্যি বাঙালি নই, হয়তো মোঙ্গলয়েড। গায়ের রং বিচার্য হলে জারোয়া বা নেগ্রিটো উপজাতি হবার সম্ভাবনাও আছে ষোলো আনা। এসবের নির্যাস হল, দোকানির ঘোষিত দামের বিরুদ্ধে আমি অসহযোগিতার হরতাল ডাকতে পারিনি। স্বর উঁচিয়ে বলতে পারিনি, ধনতন্ত্র নিপাত যাক! কথা না বাড়িয়ে দু’টি পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছিলাম তার হাতে। সে বোধহয় আমার থেকে এতখানি সত্যাগ্রহ আশা করেনি। পানমুখে লাল হাসি হেসে বলেছিল— বগবান বুধ্ আপকা ভালা করেগা। থুতু ছিটকে এসেছিল আমার সদ্য কেনা দেড়শো টাকার সাদা টি শার্টে। ভাগ্যিস এসেছিল! কাচার পর দেখলাম গেঞ্জিটায় বেশ বাটিক প্রিন্টের মতো, লাল লাল মিনি গোলাপ ফুটেছে। বিনিপয়সায় যে এত সুন্দর আর্ট পেয়ে যাব, ভাবতেই পারিনি। 
দোকানির দূরদৃষ্টি আছে বলতেই হবে! ‘বগবান বুধ্’, আমার ‘ভালা’ করেছেন এবং করেও চলেছেন। তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে এখন মাঝে মাঝে আমি ধ্যানে বসি। কথা বলা আরও কমিয়ে দিয়েছি এবং অষ্টাঙ্গিক মার্গের তৃতীয় অনুচ্ছেদ, ‘সম্যক বাক্য’ স্তরে পৌঁছেছি। খুব শীঘ্রই আমি ইশারায় কাজকর্ম শুরু করব। কাউকে ভালোবাসি বোঝাতে মাথা নিচু করে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকব। সাদা পায়রার পরিবর্তে রাষ্ট্রপুঞ্জ এখন আমাকেই শান্তির দূত হিসাবে  রাশিয়া বা গাজায় পাঠাতে পারেন বিনামূল্যে।  
আমাদের পাড়ার রত্না মাসিমা মূর্তি দেখে থুড়ি, মূর্তির দাম শুনে চমকে উঠলেন— অ্যাঁ, সাতশো আশি! রাম ঠকিয়েছে তোকে। এ জিনিস আশি টাকার এক পয়সা বেশি হবে না। বাজার অর্থনীতি এবং দ্রব্যমূল্যের উপর মাসিমার এই রূঢ় সিদ্ধান্ত আমাকে ভয়ানক বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিল। আমি মনে মনে ঝামা ইটের মতো শুকিয়ে গেলাম। রাম, রাবণ, বিভীষণ বা হনুমান যিনিই ঠকান না কেন, সাতশো টাকা নেহাত কম নয়। সাতশো টাকায় কেজি দশেক চাল, ততোধিক আটা, অসংখ্য বিস্কুটের প্যাকেট, তিনটে কবিতার বই, একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি, বেশ কিছু শান্তিনিকেতনী রুমাল, দুটো সেকেন্ড হ্যান্ড রোদ চশমা, সোয়া তিনকেজি মুরগি, চার চারটে স্যান্ডো গেঞ্জি হয়ে যায়। সামনের অঘ্রানে প্রতিবেশী হারুদার মেয়ের বিয়ের উপহার হিসাবে দিব্যি একটা শরবত সেট বা ডাবল বেডশিট হয়ে যেত! আবার পোর্টব্লেয়ার ফিরে গিয়ে, বুদ্ধকে ফেরত দিয়ে আসার কথা বলতেই মাসিমা হতাশার সুরে বললেন - গবেট! হাঁদারাম! মূর্খ! গাধা! ন্যাংটো শিশুর মতো কথা বলছিস! তোর মাথায় শুকনো গোবর ছাড়া কিচ্ছু নেই। সাতশো টাকা বাঁচাতে যে সাত হাজার খরচ হবে সেটা কবে বুঝবি? এবার থেকে দরদাম করতে শেখ, বুঝলি? বুদ্ধু কোথাকার!
মাসিমার নিষ্ঠুর বিশেষণে, প্রখর গ্রীষ্মে জল না পাওয়া মাধবীলতার মতো আমি একেবারে নেতিয়ে পড়লাম। মনে হল, কোনও ইংরেজ শাসক শঙ্কর মাছের চাবুক দিয়ে মনের আনন্দে আমার পিঠের ছাল তুলে নিল। নিজের উপর প্রবল ধিক্কার জন্মাল। শেষ পর্যন্ত একজন দোকানির কাছে গোহারা হারলাম! মাসিমাকে জিজ্ঞাসা করার সাহস হল না, ‘বুদ্ধু’ আর ‘বুদ্ধ’ কি প্রায় সমোচ্চারিত সমার্থক শব্দ? মাথায় গোবর ঢুকলই বা কোথা দিয়ে? যদি ঢুকেই থাকে তাকে বের করা যায় না কেন?
গতকাল রাত্রে আমার বাড়িতে চোর এসেছিল। চোরের দূরদৃষ্টির অভাব বলতে হবে, নইলে  আমার বাড়িতে কেউ কখনও চুরি করতে আসে? বাইরের ঘরে, থাকার মধ্যে আছে কিছু বই, ডায়রি, কলম, ড্রয়ারে বাজার ফেরত কিছু পয়সা, টর্চ, মাছের রক্ত-আঁশ লেগে থাকা বাসি নোট, উপহার পাওয়া একটা জাপানি ফুলদানি, চশমা, ঘড়ি, আতরের শিশি, গীতার পকেট সংস্করণ, শ্রীজাত আর শক্তি চ্যাটার্জির কবিতার বই, ফ্যামিলি ফোটো, ক্যানডিড পাউডার, ওষুধের স্ট্রিপ, জলের বোতল। 
চোর এসেছিল জানতে পারলাম স্ত্রীর চিৎকারে— চোর এসেছে, চোর এসেছে। এখনও মড়ার মতো ঘুমাচ্ছ কী করে? তাড়াতাড়ি ওঠ।
আমি চাদরের ভেতর থেকে শুনলাম— মোহর এসেছে! মোহর বউদি, আমাদের প্রতিবেশী, ডাঃ সুখেন রায়ের সহধর্মিণী। আমি ঘুম জড়ানো স্বরে বললাম— চেঁচাচ্ছ কেন? ওঁকে বসতে বল। আমি ফ্রেশ হয়ে দেখা করছি।
পৃথিবীর সব স্ত্রীই স্বামীর মনের দুর্বলতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন। আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল— দেখা করছি? শখ কত! কতবার বলেছি, মোহর বউদিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা বন্ধ কর। ভালো করে শোনো, চোর আর মোহর প্রায় সমোচ্চারিত কিন্তু ভিন্নার্থক শব্দ। এখন দেখবে চল চোরের কীর্তি!
বাইরের ঘরে এসে দেখি, প্রবল ঝড় বয়ে গেছে সবকিছুর উপর। বই, খাতা, চেয়ার, টেবিল, দেয়াল ঘড়ি সব লণ্ডভণ্ড। খুচরো এবং নোট যেটুকুই বা ছিল না কেন, তার পুরোটাই লোপাট করেছে রাতের অতিথি। এমনকী সোফার বসার জায়গাগুলোকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখেছে, ভিতরে মণিমুক্তো ঠাসা আছে কি না! গতমাসেই খুব পছন্দ করে বালিশগুলো কিনেছিলাম! সি গ্রিন কালারের। আমি ডুকরে উঠলাম। আমার সাধের জাপানি ফুলদানি, আতরের শিশি, দামি ঝর্ণা কলম, আফটার শেভ, ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, আমার দিনরাত্রির সঙ্গী হাত ঘড়ি, সবকিছুই আমাকে বিদায় জানিয়ে শুধু একরাশ দুঃখ আর দীর্ঘশ্বাস রেখে গেছে। 
হঠাৎ বুদ্ধ মূর্তির কথা মনে এল! এতক্ষণ মন খারাপের অনুভূতিতে তথাগতের কথা মনেই আসেনি। স্টাডি টেবিলের দিকে তাকাতেই ছ্যাঁত্ করে উঠল বুক! রক্তে একশো কাঁসর ঘণ্টা বেজে উঠল প্রবল আস্ফালনে। তিনি নেই! আমি ছেঁড়া সোফার উপরেই ধপ করে বসে পড়লাম। স্পষ্ট মনে আছে, রিডিং ল্যাম্পের ঠিক পাশেই মূর্তিটা রাখা থাকত। বইয়ের তাক, টেবিলের তলা, ড্রয়ার, আলমারি, তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। নাহ্, চোর, ভগবানকেও ছেড়ে কথা বলেনি। মহাকলি! পৃথিবীর বিনাশকাল আসন্ন। মূর্তিটার উপর এই ক’দিনেই আমার অন্যরকম একটা মায়া পড়ে গেছিল। মাসিমার কথানুযায়ী, দামের নিরিখে হয়তো ঠকেছিলাম, কিন্তু ওই পাঁচ ইঞ্চি কোরাল বুদ্ধর দিকে তাকালেই মনের সব জ্বালা, যন্ত্রণার উপর স্নেহের প্রলেপ পড়ত। যেদিন আঁধার করে বৃষ্টি নামত, যেদিন মেয়েকে অন্যায় ভাবে শাসন করতাম, যেদিন কিছুই ভালো লাগত না, যেদিন মায়ের কথা মেঘ হয়ে উড়ে আসত মনে সেদিন আমি গৌতম বুদ্ধের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার রসদ পেতাম। ইসস্, অন্ততঃ মূর্তিটা যদি 
রেখে যেত সে! আমি মনে মনে 
ভেঙে পড়লাম।
মিনিট দশেক পর তৈরি হয়ে থানায় ডায়রি করতে বেরচ্ছি। সদর দরজার দু’হাত আগেই ল্যান্টেনা ক্যামারা ঝোপের দিকে চোখ আটকে গেল। বর্ষার জলে পুষ্ট গাছে লাল, হলুদ অসংখ্য ফুল ফুটেছে। একটা কাঠবেড়ালি মনের আনন্দে লেজ নাড়ছে। দুটো গঙ্গাফড়িং শুঁড়ে শুঁড়ে লড়াইয়ে মগ্ন। হঠাৎ চোখ গেল মাটির দিকে! কী যেন একটা চোখে পড়ছে? তর সইল না! ঝুঁকে দেখি ঘাসের তলা থেকে উঁকি দিচ্ছে কোরাল ডাস্ট। এক মুহূর্তের মধ্যে তুলে নিলাম ভগবানকে। নাহ্, কোথাও ভাঙে টাঙেনি। অটুট রয়েছেন তিনি। নিশ্চয়ই পালাবার সময় চোরের বোঁচকা থেকে পড়ে গেছে। আমার ডুবন্ত সপ্তডিঙ্গা আবার কোন মন্ত্রবলে ভেসে উঠল। খুশির জয়ন্তীমল্লার বেজে উঠল বাগান জুড়ে। আমি পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলাম— ইউরেকা, ইউরেকা। 
স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল— কী হল? চেঁচামেচি কীসের? থানায় যাবে না? 
আমি মূর্তিকে বুকের কাছে ধরে বললাম— থানার প্রয়োজন নেই। দুঃখ হরণকারী ভগবানকে ফিরে পেয়েছি। বলতে পার চোর আমার জীবনকে রেখে গেছে নিজের খেয়ালে। আজ বরং তুমি দুপুরে মাসিমাকে নিমন্ত্রণ কর। আমি বাজার থেকে ভালো ইলিশ নিয়ে আসছি। 

সম্পর্কিত সংবাদ