Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জমিয়ে খাওয়া পয়লা বৈশাখে

সকাল থেকেই ঝগড়া চিন্ময়-বিদিশার। আজ পয়লা বৈশাখ। চিন্ময়ের দাবি, এদিন জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া হবে। মেনুও প্রায় ঠিক করে ফেলেছে সে।

জমিয়ে খাওয়া পয়লা বৈশাখে
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: সকাল থেকেই ঝগড়া চিন্ময়-বিদিশার। আজ পয়লা বৈশাখ। চিন্ময়ের দাবি, এদিন জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া হবে। মেনুও প্রায় ঠিক করে ফেলেছে সে। সকালে লুচি-তরকারি। তারপর দুপুরে জমিয়ে বাঙালি খানা। মাছ, খাসির মাংস তো থাকবেই। সঙ্গে সরু চালের গরম ভাত, মুগের ডাল, আলুপোস্ত। শেষ পাতে চাটনি আর দই। এখানেই গোলমাল গিন্নির সঙ্গে। গিন্নি এই সব মানতে নারাজ। তাঁর সাফ কথা, নববর্ষ নিয়ে এত আদিখ্যেতা করার কী আছে? নিজের শরীরটার দিকে তো আগে খেয়াল রাখতে হবে। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই চিন্ময়ের সুগার-প্রেশারের সমস্যা। কোলেস্টেরলও বেশি। তাই গিন্নি প্রথমেই খাসির মাংস নাকচ করে দিয়েছে। দই -চাটনিতেও আপত্তি। বিদিশা বলেই দিয়েছে দই খেতে হলে টক দই খাও, মিষ্টি দই চলবে না। খাওয়াতেই পয়লার আমেজ নষ্ট হবে ভেবে মেজাজ খারাপ চিন্ময়ের। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও গিন্নিকে টলাতে পারল না। উল্টে গিন্নির প্রশ্নবাণে রীতিমতো বিপাকেই পড়ে গেল। বিদিশা চোখ পাকিয়ে চিন্ময়কে জিজ্ঞেস করল, বলতো ছেলের জন্মদিন কবে? বলতে পারলে তোমার দাবি মেনে নেব। এত সহজ প্রশ্ন শুনে কনফিডেন্স বেড়ে গেল তাঁর। সন-তারিখ সবটাই বলে দিল। মুখে বিজয়ীর হাসি । কিন্তু সেই হাসি মিইয়ে যেতে সময় লাগল না। গিন্নি বলল, আমি বাংলা সাল-তারিখ জানতে চাইছি। এবার হোঁচট খাওয়ার পালা চিন্ময়ের। অনেক চেষ্টা করেও বলতে পারল না । ব্যস, গিন্নির প্যাঁচে খারিজ হয়ে গেল স্বামীর পয়লার খাওয়া। এই বিব্রত ভাবটা শুধু চিন্ময়ের নয়, গড়পরতা প্রায় সব বাঙালিরই।

Advertisement

কথায় আছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। পয়লা বৈশাখ সেই পার্বণেরই অঙ্গ। আমরা যতই বাংলা মাস, বাংলা সাল নিয়ে মাতামাতি করি না কেন, আম বাঙালি বাংলা নববর্ষের তিনটে দিনই মনে রাখে। একটা পয়লা বৈশাখ। আর বাকি দু’টোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কবিগুরুর নাম। ২৫ বৈশাখ আর ২২ শ্রাবণ। আর কত সন, সেটা জিজ্ঞেস করলে তো রীতিমতো তোতলাবে বাঙালি। অথচ একটা সময় এরকম সত্যিই ছিল না। সাল-তারিখ মোটের উপর অনেকেরই মনে থাকত। পয়লা বৈশাখ মানে ছিল সত্যিই আনন্দের দিন। উৎসবের দিন। চৈত্র মাসের শেষ দিকেই বাড়িতে চলে আসত বিভিন্ন দোকানের কার্ড। যাঁরা কার্ড পাঠাতেন না, মুখেই বলে দিতেন, চলে আসবে কিন্তু। সেটা একটা মজার দিন। সকালে ভালো-মন্দ খাওয়া। তারপর স্নান সেরে নতুন জামা-কাপড় পরা। সেই নতুন জামা পরেই বিকেলে বাবার সঙ্গে দোকানে দোকানে ঘোরা। কাচের ছোট প্লেটে করে দু’তিনরকমের মিষ্টি বা নিমকির মতো কোনও নোনতা খেতে দেওয়া হতো অথবা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো কালো গার্ডার আটকানো ছোট সাইজের মিষ্টির বাক্স, সঙ্গে রোল করে গোটানো বাংলা মাসের ক্যালেন্ডার। মিষ্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডারের সংখ্যাটা নিশ্চিত ভাবেই ব্যক্তিগত খাতিরের ওপর নির্ভর করত। ভালো সম্পর্ক থাকলে দু’টো বাক্সও চলে আসত। সব দোকান থেকে যে জিনিস কেনা হতো এমন নয়, তবুও প্যাকেট পাওয়া যেত। আসলে ওটাও ছিল ব্যবসায়িক কৌশল। ভালো মিস্টির প্যাকেট দেখলে ছোটবেলায় যেমন বলতাম, ওই দোকান থেকে কেন জিনিস কিনি না? পরে সুযোগ পেলে সেই দোকান থেকে কিছু কিনে রিলেশন রেখে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, যাতে পরের বছরের প্যাকেট মিস না হয়। ক্যালেন্ডার ছিল রকমারি। রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি অথবা ঠাকুর-দেবতার মুখ। বিশেষ করে মা কালীর মুখ দেওয়া ক্যালেন্ডারই  ছিল বেশি। আর পাওয়া যেত ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের ছবি। তবে দোকানে দোকানে ঘুরে মিষ্টি খাওয়ার চেয়েও বেশি আকর্ষণ ছিল পানীয়তে। কেউ দিত রসনার গ্লাস, কেউ দিত ক্যাম্পা কোলা বা গোল্ড স্পট। ছোটবেলায় স্ট্র ডুবিয়ে চুক চুক করে সেই কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়ার মধ্যে যে আমেজ ছিল, সেটা আর বড়বেলায় পাওয়া যায়নি। 
এখন সবকিছুই পাল্টেছে। পয়লা বৈশাখে এখন পিওর বাঙালিয়ানার চল কমে গিয়েছে। মার্চ মাস ইয়ার এন্ডিং। ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জমা-খরচে হিসাব হয় ওই সময়। আর সাধারণ দোকানগুলির হিসেব হয় এই পয়লা বা অক্ষয় তৃতীয়ায়। এটাই ইয়ার-এন্ডিং। দোকানের আমন্ত্রণে সেখানে গেলে মিষ্টির প্যাকেট যেমন মিলত, তেমন কিছু একটা কিনে পুরনো হিসেব মিটিয়েও দিতে হতো। এখনও যে এসব হয় না, তা নয়। তবে সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। পাড়ার মুদির দোকান বা স্টেশনারি দোকানদারদের আর্থিক পরিস্থিতিই এখন তেমন সচ্ছল নেই যে, এই সব উৎসব আলাদাভাবে করবে। বিশেষ করে এখন যেভাবে পাড়াতেও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের আগ্রাসন শুরু হয়েছে, তাতে বেশ করুণ দশা ওইসব দোকানদারের। ব্যতিক্রম মোটের উপর সোনার দোকান। সেখানে এখনও নববর্ষে মিষ্টির প্যাকেট-ক্যালেন্ডার সংস্কৃতি দেখা যায়।  ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলি ঢেলে নববর্ষ অফার দেয়। এগুলিই এখন বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গ। তাই পুরনো দিনের বাঙালিয়ানার সেই আমেজ ছেড়ে নতুনেই অভ্যস্ত হচ্ছে বাঙালি।
বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি, বাঙালির পরম্পরা, বাঙালির জীবনচর্যা—এসব নিয়ে আমরা কি আদৌ সচেতন? গোটা বছর সংযোগই নেই বাংলা বা বাঙালিয়ানার সঙ্গে, নতুন বাংলা সাল দুয়ারে হাজির হলে হঠাৎ খাঁটি বাঙালি সাজার চেষ্টা কেন? এ প্রশ্ন ওঠবেই। প্রশ্নগুলিকে একেবারে অবান্তর বলে ফেলে দেওয়ায় যায় না। কিন্তু ওই যে, নববর্ষ পয়লা বৈশাখ যেন একটা অভ্যাস। সেটা ছাড়াও যায় না। তাই অনেক কিছু পাল্টালেও আমরা সবটা পাল্টাতে পারি না, পারিনি।  
যেমন মধ্যবিত্ত বাঙালি নতুন পোশাকের জন্য আগে বছরে দু’টো সময়ের জন্য অপেক্ষা করত। একটা দুর্গাপুজো। অন্যটা পয়লা বৈশাখ। সেই প্রবণতায় কিন্তু ঘাটতি এখনও নেই। বিভিন্ন পোশাকের দোকানে চৈত্র মাসজুড়ে সেল দেওয়া হয়। সেখানে ভিড় দেখলেই বোঝা যায় নববর্ষের প্রথম দিনে নতুন জামার গন্ধ এখনও আমরা নিই। নিতে চাই। এই সংস্কৃতির বদল আসেনি। এমনকী নেট যুগেও এই একটা দিন হোয়াটসঅ্যাপে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখাই পাঠায়, হ্যাপি নিউ ইয়ার নয়।
আমার এক বন্ধুর বাড়িতে দেখতাম পয়লাতে গণেশ পুজো হতো। এখন আর সেসব খুব একটা দেখা যায় না। হয়তো কোনও কোনও বাড়িতে এখনও ওই পুজোর চল আছে। এখন যেমন গণেশ বললেই লোকে লাড্ডু কিংবা মোদক বোঝে, তখন আমরা মোদক কী জিনিস জানতামই না। লাড্ডুও আমাদের তেমন পরিচিত নাম নয়। বরং আমাদের বেশি চেনা ছিল দরবেশ। এখন তো বাঙালি অনেক বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। মিষ্টিতেই তাদের অ্যালার্জি। তাই বছরের প্রথম দিনে এখন ট্র্যাডিশনাল মিষ্টির পাশাপাশি নোনতা ও উত্তর ভারতীয় মিষ্টির কদর বাড়ছে। খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি সর্বভারতীয়। আগের সেই, মাছে-ভাতে বাঙালি কনসেপ্ট আর নেই। বরং রাজ্যে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খাওয়ার নাম জিজ্ঞেস করলে চোখ বুঝে বলে দেওয়া যায় অন্তত ৬০ ভাগই বলবেন বিরিয়ানি। চাইনিজ, পাঞ্জাবি, কন্টিনেন্টাল খানা এখন আমাদের ঘরে ঘরে। তাই বছরের ওই একটা দিন বিশুদ্ধ বাঙালি খাওয়ার দিকে ঝোঁক থাকেই। কিন্তু ঘরে বাঙালি খানা বানানোর ঝক্কি এখন অনেকেই এড়িয়ে যেতে চান। তাই ভরসা রেস্তরাঁ। বছরের এই সময়টা এখন বিভিন্ন হোটেল-রেস্তরাঁয় বাঙালি খাবারের উপর নানাবিধ অফারের ছড়াছড়ি। অতীতে হোম ডেলিভারির এত রমরমা ছিল না। এখন হোম ডেলিভারি সংস্থাগুলিও নবববর্ষ থালির সম্ভার নিয়ে হাজির। 
বাংলার নববর্ষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কৃষক সমাজ। আগে এটি পরিচিত ছিল ফসলি সন হিসেবে। পরে তা হয় বঙ্গাব্দ। বৈশাখের এই সময়টা যে শুধু আমাদের বাঙালিদেরই নববর্ষ তা নয়, প্রায় একই সময় পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, অসম, ওড়িশা, কেরল, তামিলনাড়ুর মতো ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও পালিত হয় এই বিশেষে দিনটি। সবটাই নতুন বছরকে স্বাগত জানানো। এটা ঠিকই, আচার, পরম্পরা বা উদ্‌যাপনের রীতি-নীতিতে প্রত্যেক উৎসবই একে অপরের চেয়ে ভিন্ন। কিন্তু একটা কোথাও মিল আছে। আসলে এটাই ভারতবর্ষের অন্তর্নিহিত সত্য। যে কথা উপলব্ধি করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। প্রত্যেকটি উৎসব ভারতীয় সভ্যতার বিভিন্ন ধারাকে সগর্বে তুলে ধরে। একেই বলে বিবিধের মাঝে মিলন মহান।
আক্ষেপের কথা, আজকের ভারতে সেই সুরে কোথাও যেন তাল কাটছে। ভারতে এখন অসহিষ্ণুতা ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিচ্ছে। আজকের ভারতে খাদ্যাভ্যাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার চলছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। ধর্মীয় উন্মাদনা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে তাঁকে আর যাই হোক স্বাভাবিক বলা চলে না। ১৪৩২-এর নতুন বছরে তাই জোর দিয়ে মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে, ভারতীয়ত্ব আসলে বিবিধতার সমন্বয়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ