Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

লন্ডনে জ্যোতি বসু থেকে মমতা...

জ্যোতিবসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন স্রেফ অকাজে, ছুটি কাটাতে কতবার লন্ডন গিয়েছেন? সহজ হিসেব, কুড়িবার। কেউ কেউ আবার বলেন, গুনতে ভুল হয়েছে, ওটা একুশ হবে!

লন্ডনে জ্যোতি বসু থেকে মমতা...
  • ৩০ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: জ্যোতিবসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন স্রেফ অকাজে, ছুটি কাটাতে কতবার লন্ডন গিয়েছেন? সহজ হিসেব, কুড়িবার। কেউ কেউ আবার বলেন, গুনতে ভুল হয়েছে, ওটা একুশ হবে! কত লক্ষ কোটি টাকার শিল্প এনেছেন? আদৌ এনেছেন কি, কোনও তথ্য নেই বঙ্গের কমরেডদের (পড়ুন রামরেড!) কাছে। সাড়ে তিন দশকের একচ্ছত্র রাজ্য শাসনে ক’টা ভারী শিল্প হয়েছে? আজ থেকে ৪০- ৪৫ বছর আগে রাজ্যটা সকাল সন্ধে ডুবে থাকত লোডশেডিংয়ে। ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের অসভ্যতার দরুন শ্রমিকদের বুকের উপর রোলার চালিয়ে একের পর এক কারখানার গেটে ভারী তালা পড়ত। হাওড়ায়, জিটি রোডে, গঙ্গার বিস্তীর্ণ দুপারে। তা নিয়ে কতবার বিলেতের মাটিতে মহামান্য কমিউনিস্ট নেতার নিদ্রাহরণ করেছেন তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা? তাঁর সঙ্গে যেতেন কারা? এসব প্রশ্ন কোনওদিন দেশি বিদেশি কমরেডরা তুলেছেন কি? তুলবেন না, কারণ তাঁরা জ্ঞানপাপী। বিজনেস মিট তো দূর অস্ত! কতজন শিল্পপতির সামনে বাংলায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে দেখা গিয়েছে শ্রদ্ধেয় বাসুজিকে? বিলিতি কমিউনিস্ট বলে খ্যাত মানুষটা অক্সফোর্ড, কেমব্রিজে ক’টা লেকচার দিয়েছিলেন বাম সরকারের জনহিতকর কাজ কিংবা রাজ্যের শিল্প প্রসার নিয়ে? নাকি স্রেফ বেড়াতে আর বিশ্রাম করতে যাওয়া? বাইশ-তেইশ বছরের শাসনকালে বিলেত ছিল জ্যোতি বসুর দ্বিতীয় বাড়ি। প্রথম গিয়েছিলেন ব্যারিস্টার হতে ১৯৩৫ সালে। চারদশক পর সাতাত্তরে মুখ্যমন্ত্রী হয়েও ফি বছর যেতেন। বেশিরভাগটাই গ্রীষ্মে এবং পছন্দের জুলাই মাসে। কলকাতার গরম সহ্য হতো না বলে। কে জানে কোনওকালেই এদেশে কমিউনিস্টদের জন্মদিন পালনের রেওয়াজ না-থাকায় বিলেতে বড় করে ৮ জুলাইয়ের উৎসব (পড়ুন, মোচ্ছব!) পালনের তাড়নায় যেতেন নাকি তিনি? শেষদিকে অবশ্য যখন আর বয়সের ভারে লন্ডনে যেতে পারতেন না তখন মহামান্য সুভাষবাবু সস্ত্রীক কেক নিয়ে মিছিল করে যেতেন সল্টলেকের ইন্দিরা ভবনে। যত বয়স তত কেজি কেক। পথের পাঁচালির কচিকাঁচারাও যেত। শিল্পফিল্প ওসব নৈব নৈব চ! জ্যোতিবাবু স্বপ্নেও ভাবতেন না ওসব নিয়ে। অক্সফোর্ডে ভাষণ, শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক, সরকারি নানা প্রকল্পের হিসেবনিকেশ তুলে ধরে বিনিয়োগ টানার চেষ্টা ওসব জ্যোতি বসুর কোষ্ঠী-ঠিকুজিতে ছিল না। অথচ মুখ্যমন্ত্রী মমতা সম্প্রতি যে হোটেলে উঠেছিলেন, সেই মধ্য লন্ডনের সেন্ট জেমস কোর্ট হোটেলই অধিকাংশ সময় তৎকালীন বঙ্গেশ্বরেরও ঠিকানা হতো। বেশিরভাগ সময়েই মুখ্যসচিব কিংবা রাজ্য শিল্প উন্নয়ন নিগমের কেষ্টবিষ্টুরা সঙ্গে না থাকলেও সংখ্যায় খুব কম লোক যেতেন না। ইজরায়েলে সাত দিনের সফরে পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন পঁচিশ জন। কিন্তু শিল্প রামধনু হয়ে নেমে আসেনি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে।

Advertisement

১৯৯৬ সালে বঙ্গেশ্বরের লন্ডন সফরে সঙ্গী ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। উদ্দেশ্য, শেক্সপিয়ারের জন্মভিটেতে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি স্থাপন। বুদ্ধদেবের ডাক পড়েছিল কারণ তিনিই ছিলেন সিপিএমের কুলিন সংস্কৃতির একমাত্র পোস্টার বয়! ১৯৮৪ সালে মুখ্যমন্ত্রী একসঙ্গে লন্ডন ও কানাডা সফরে গিয়েছিলেন। তেমন লক্ষ কোটির শিল্প এসেছিল বলে শুনিনি। তবে নরেন্দ্র মোদিরও আগে জ্যোতি বসু একবার ইজরায়েল সফর করেছিলেন। হ্যাঁ, শিল্প আনতে। সেটা ছিল ২০০০ সাল। তার দু’বছর আগে ১৯৯৮ সালে ইজরায়েলে যাওয়ার সব আয়োজন  ঠিক আছে কি না চূড়ান্ত করতে যান তৎকালীন রাজ্য শিল্প উন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান বঙ্গেশ্বরের অভিন্নহৃদয় সুহৃদ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। তা, আজ সুজনবাবুদের সবিনয়ে প্রশ্ন করি, কত লক্ষ কোটির শিল্প  এসেছিল? সেসব ইজরায়েলি সংস্থা বাংলার কোন কোন জেলায় অফিস খুলেছে, ঠিকানা দেবেন? ওইটা বুঝি সরকারি অর্থের অপচয় নয়! শুধু বিজিবিএস এলেই আপনাদের ভ্রু কুঁচকে যায়।
সাতাত্তরে ক্ষমতায় আসার পর বামেদের উগ্র ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের দৌরাত্ম্যে এক এক করে রাজ্যে শিল্পের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে যায়। প্রাচ্যের শেফিল্ড নামে খ্যাত হাওড়ার দুর্দশা, বি টি রোডের দু’পাশে বন্ধ কলকারখানার শব, দুর্গাপুর-আসানসোলকে শ্মশান বানানোর জন্য দায়ী কে? কারা কম্পিউটারের বিরোধিতা করে রাজ্যটাকে পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে দিয়েছে? বিকলাঙ্গ হলদিয়ারই-বা জন্ম দিয়েছে কারা? এখনও পুরনো দেওয়াল ভাঙলে বেরিয়ে আসে ‘টাটা-বিড়লা সাম্রাজ্যবাদের দালাল’, ব্র্যাকেটে সিপিএম। শেখানো হয়েছিল ব্যবসায়ী শিল্পপতি মানেই সমাজের শত্রু! ঠিক যেমন বিজেপি শেখায় সংখ্যালঘু মানেই তফাত যাও। বিভাজনেরই ভিন্ন রূপ!
আর আজ ওসব ভুলে শুধু সিঙ্গুরের প্রলাপ বকে নিজেদের আবার প্রাসঙ্গিক করে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা! মানুষ আপনাদের বিলক্ষণ চেনে, তাই অপচেষ্টা সফল হবে না! আসলে হতাশা মাথায় চড়লেই রাম-বাম মিলে অশান্তি তৈরির ষড়যন্ত্র মাথায় খেলে। আলিমুদ্দিনের চার দেওয়ালের অন্দরে ইদানীং তারই কাটাকুটি খেলা চলছে।
বলতে দ্বিধা নেই সিরিয়াস বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও বিদেশ সফর করেছেন একাধিক। তিনি কতবার বিদেশ গিয়েছেন কিংবা তাঁর শিল্পমন্ত্রী নিরূপম সেন কত শত মউ সই করেছিলেন? নবরূপে গড়ে ওঠা রাইটার্সের ‘মউ সমাধি’ খুঁড়ে মাছির মতো কিলবিল করা অগুনতি চুক্তিগুলি কি ফিরে দেখা হবে? এত ঢাকঢোল পিটিয়েও ইন্দোনেশিয়ার সালিম গোষ্ঠীর শিল্পস্থাপন মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেল কেন? জ্যোতিবাবুকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরই বুদ্ধদেববাবু জাপান সফরে গিয়েছিলেন শিল্প আনার নাম করে। শিল্প বিমুখ বদনাম ঘোচাতে। আর ২০০৫ সালে সালিম গোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি করতে ইন্দোনেশিয়ায় পা রেখেছিলেন। সেই সফরে বুদ্ধদেবের বাছাই করা ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকরাও সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু বিরাট খরচ করেও শিল্প আসেনি। তারপর প্রত্যেক দিন দুপুর থেকে সন্ধে  রাইটার্সে নিরূপমবাবুর ঘরে মউ 
সইয়ের মেলা বসত। ফটোগ্রাফার, সাংবাদিকদের সে কী ছোটাছুটি। এ বলে হাজার কোটি তো অন্যজন সশব্দে হাঁকে দশ হাজার কোটি। কিন্তু আজ সব মহাশূন্যে বিলীন।
আজ দু’দশক পর সেই সিপিএম নখ দাঁত চুল সব হারিয়ে রীতিমতো অস্তিত্ব সঙ্কটে। মমতার সফল শিল্প উদ্যোগ এবং সৎ প্রচেষ্টা দেখলেই তাদের অদ্ভুত জ্বলন শুরু হয়। এটাও এক ধরনের পারভারশনই বলব! তাই বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন কিংবা বিলেতের মাটিতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎকে তাঁরা কটাক্ষ করেন। বাঁকা চোখে দেখেন। কিন্তু শুরু থেকে শেষ তিনি তো তার মতো করে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। হোটেলের ঘরে শুধু বিশ্রাম আর ছুটি কাটানো তাঁর লন্ডন সফরের উদ্দেশ্য ছিল না। বাংলাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই একমাত্র উদ্দেশ্য, যা জ্যোতি বসু করতে পারেননি।
পৃথিবীর ইতিহাস বলে, শকুনের অভিশাপে কখনও গোরু মরেনি, মরবেও না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহস, লড়াকু মনোভাবই তাঁকে এবারও জয়ের মালা পরাবে। সিপিএমের ভোট রামে আর রামের ভোট বামে, এই ধারাবাহিক হেঁয়ালি চলতেই থাকবে বঙ্গ রাজনীতির অঙ্গনে। বাংলার মানুষ সহজে এসব ধুরন্ধরদের ধ্যাষ্টামি বিশ্বাস করবে না। ইতিহাস সব সময় সাহসীর পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। কখনও তার অন্যথা হয়নি। অক্সফোর্ডে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে যে বাঙালি নারী বলতে পারেন, ‘দিদি কাউকে পরোয়া করে না। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো লড়াই করে। বিরোধিতা আমাকে উৎসাহিত করে। জিতে আবার আসব।’ সেই অসম সাহসীকে বাহবা না দিয়ে থাকা যায়! আর সব শেষে বলি, আপনাদের মহাশূন্যে পাঠাতে নাসার অতিআধুনিক যান লাগবে না। এলন মাস্কের স্পেস এক্সকেও নামতে হবে না, স্ট্রিট ফাইটার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাই যথেষ্ট।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ