Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

পিএমও-র সচিবের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে রেলে চাকরির নামে প্রতারণা, তদন্তে নামল রেল পুলিশ, গ্রেফতার ১

নীল বাতি লাগানো গাড়ি। সামনে বোর্ডে লেখা— মেম্বার, রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ড। কেউ তাদের চিনতো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সচিবের ঘনিষ্ঠ বলে।

পিএমও-র সচিবের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে রেলে চাকরির নামে প্রতারণা, তদন্তে নামল রেল পুলিশ, গ্রেফতার ১
  • ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও হাওড়া: নীল বাতি লাগানো গাড়ি। সামনে বোর্ডে লেখা— মেম্বার, রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ড। কেউ তাদের চিনতো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সচিবের ঘনিষ্ঠ বলে। কোথাও তারা পরিচয় দিতো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তা হিসেবে। কেউ কেউ আবার রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যানের পিএ বলেও তাদের চিনতো। জায়গা ভেদে তাদের পরিচয় পালটে যেত। নানা ধরনের পরিচয়কে হাতিয়ার করেই রেলে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে টাকা হাতিয়ে বেড়াত তারা। প্রতারণার অভিযোগ সামনে আসতেই জালিয়াতি সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে তদন্তে নেমেছে শালিমার জিআরপি। অভিযুক্তদের মধ্যে একজনকে বুধবার রাতে হাওড়ার অঙ্কুরহাটি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

Advertisement

ধৃতের নাম বিনোদ সাউ। জিআরপির এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গিয়েছে, তার বাড়িতে বেশ কয়েকটি দামী গাড়ি রয়েছে। সেগুলি প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হত। এই বিনোদই প্রতারণা চক্রের মূল মাথা, তাকে পুলিশ হেপাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
রেল পুলিশ সূত্রে খবর, মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বাসিন্দা বৈকুণ্ঠনাথ মণ্ডল  ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পরীক্ষা দিতে ট্রেনে করে কলকাতায় আসছিলেন। ট্রেনে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনোদ সাউ, পরশ সহ কয়েকজনের সঙ্গে। রেলে বিভিন্ন পদে কর্মী নিয়োগ কবে হবে, চাকরির পরীক্ষার হাল-হকিকত নিয়ে কথাবার্তা চলছিল তাদের মধ্যে। কথা প্রসঙ্গে তরুণ নামের ব্যক্তি বৈকুণ্ঠকে বলে, পরশ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরে এবং গৌরব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে কর্মরত। তারা পিএমও দপ্তরের সচিবের ঘনিষ্ঠ। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে বিভিন্ন আমলা সহ ভিভিআইদের সঙ্গে তাদের ছবিও দেখায় তারা। যা দেখে আশ্বস্ত হন ওই যুবক। এরপর তাঁর কাছ থেকে বায়োডেটা নেয় তারা।
বৈকুণ্ঠ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, জানুয়ারি মাসে তরুণ তাকে ফোন করে নিজাম প্যালেসে আসতে বলে। সেইমতো তিনি সেখানে গেলে নিজাম প্যালেসের পার্কিং লটে তিনজন এসে দেখা করে তাঁর সঙ্গে। তাঁকে রবীন্দ্রসদনের কাছে একটি রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়াতে বলে তারা। সেখানে মানসী দাস ও সুখবিন্দার আজমান নামের দু’জন দেখা করে জানায়, রেলে গ্রুপ-ডি পদে লোক নেওয়া হয়ে গিয়েছে। তবে রেলের জিএমের কোটায় পাঁচটি পদ এখনও ফাঁকা রয়েছে। সেই কোটায় চাকরি হতে পারে। এরজন্য ১৬ লক্ষ টাকা দিতে হবে। এর মধ্যেই সামনে আসে সিদ্ধার্থ নামের এক ব্যক্তি। আরআরবি চেয়ারম্যানের পিএ হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সে নাকি নিয়োগপত্র ইস্যু করে। বৈকুণ্ঠ টাকা কমানোর কথা বললে তারা বলে, ‘তাহলে ছেড়ে দাও। তোমার চাকরির দরকার নেই। তবে হ্যাঁ, কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীকে জোগাড় করে দিতে পারলে তার টাকা কিছুটা কমতে পারে।’ সেই অনুযায়ী তিনি আরও দু’জনকে জোগাড় করেন। তাঁদের  টাকা নিয়ে রামরাজাতলা স্টেশনে আসতে বলা হয়। তাঁরা সেখানে পৌঁছলে নীল বাতি লাগানো গাড়ি নিয়ে হাজির হয় জালিয়াত চক্রের সদস্যরা। ওই গাড়ির সামনে বোর্ডে লেখা ছিল, মেম্বার, রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ড। ৩০ লক্ষ টাকা হস্তান্তর হয় সেখানে। এরপর গাড়ি নিয়ে তারা চলে যায়।
গত মার্চ মাসে নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর অভিযোগ বৈকুণ্ঠনাথ মণ্ডল চাকরিতে যোগ দিতে গিয়ে জানতে পারেন এটি জাল। শেষ পর্যন্ত গত ১১ ডিসেম্বর তিনি শালিমার জিআরপিতে ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং সেইমতো মামলা রুজু হয়। যে মোবাইল থেকে অভিযুক্তরা কথা বলত, তদন্তে নেমে রেল পুলিশ তার নম্বর হাতে পায়। জানা গিয়েছে, শুধু বৈকুণ্ঠ নয়, বিভিন্ন জেলার বেকার যুবকরা তাদের পাল্লায় পড়ে প্রতারিত হয়েছেন। পদস্থ আধিকারিক পরিচয় দিয়ে তারা রেলে চাকরি পাইয়ে দেবে বলে প্রতারণার কারবার ফেঁদেছে। যে নীল বাতি লাগানো গাড়ি তারা ব্যবহার করতো, তার সূত্র ধরে অভিযুক্তদের খোঁজ চলছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ