Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দোহাই, যুদ্ধ ভাঙিয়ে ভোট নয়

পাকিস্তানি জঙ্গিদের কোমর কি সত্যিই ভেঙেছে? পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের দখল না নিয়েই ‘অপারেশন সিন্দুর’ থামানো হল কেন? এই যুদ্ধ বিরতি কি মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপে?

দোহাই, যুদ্ধ ভাঙিয়ে ভোট নয়
  • ১৭ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: পাকিস্তানি জঙ্গিদের কোমর কি সত্যিই ভেঙেছে? পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের দখল না নিয়েই ‘অপারেশন সিন্দুর’ থামানো হল কেন? এই যুদ্ধ বিরতি কি মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপে? এমনই হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। জঙ্গি ঘাঁটির ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ্যে আনার পরেও এই সব প্রশ্ন দূর হচ্ছে না। দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি সত্ত্বেও নয়। যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা ‘দেশদ্রোহী’ নন। কোটি কোটি ভারতবাসীর মতো তাঁরাও চান, পাকিস্তান উচিত শিক্ষা পাক। দেশের মঙ্গল হোক। তা সত্ত্বেও তাঁদের এত প্রশ্নের কারণ, শুরু হয়েছে যুদ্ধ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা। তাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জাতীয়তাবাদী আবেগ। তাই আসমুদ্র হিমাচলকে এক সুতোয় বাঁধতে গেলে ছাড়তে হবে যুদ্ধ ভাঙিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার লোভ। 

Advertisement

পহেলগাঁওয়ে পাকিস্তানি জঙ্গি হামলার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল ১৪০ কোটির দেশ। প্রত্যেকের একটাই দাবি, দিতে হবে যোগ্য জবাব। তাই সিমলা চুক্তি বাতিল, সিন্ধু নদীর জল বন্ধ সহ ভারত সরকারের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ সকলে একবাক্যে সমর্থন জানিয়েছে। ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু হতেই প্রতিটি ভারতবাসীর বুক গর্বে ফুলে উঠেছে। জঙ্গি ঘাঁটিতে এয়ার স্ট্রাইকের খবরে দেশবাসীর উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধনভাঙা। পাকিস্তানকে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে জবাব দেওয়ার লাইভ টেলিকাস্ট দেখার জন্য রাত জেগেছে গোটা ভারত। 
যুদ্ধ মানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। যুদ্ধ 
মানে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা নষ্ট। যুদ্ধ মানে 
স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন। যুদ্ধ মানে আরও 
করের বোঝা। যুদ্ধ মানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি। মানুষ এসব জানে। দেশের মানুষ এও জানে, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান এক নয়। 
পাকিস্তান সামরিক দিক দিয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী। ভারত জঙ্গি হানার বদলা নিলে পাকিস্তান চুপ করে বসে থাকবে না। তারাও পাল্টা আঘাত হানবে। তাতে উভয়পক্ষেরই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হবে। তবুও 
ভারতবাসী যুদ্ধ চেয়েছিল। কারণ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যে কোনও মূল্য দেশবাসী দিতে সদা প্রস্তুত। উদাহরণ নোটবন্দি।
নরেন্দ্র মোদির আচমকা নোটবন্দির ঘোষণায় গোটা দেশের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছিল। তবুও দু’টি কারণে সেই দুর্ভোগ মানুষ মেনে নিয়েছিল। বলা হয়েছিল, নোটবন্দির ফলে কালাধন নিকেশ হবে। আর কালাধন নিকেশ হলেই শায়েস্তা হবে জঙ্গিরা। ভারতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা মজুত করেছে, তা মূল্যহীন হয়ে যাবে। দেশের ভালো হবে, এই আশায় মৃত্যু পথযাত্রী আশি বছরের বৃদ্ধও লাইনে দাঁড়াতে অস্বীকার করেননি। অনেকের প্রাণ পর্যন্ত গিয়েছে। এই চাওয়া পাওয়ার জগতে মানুষের গায়ে যতই স্বার্থপরতার তকমা লেগে যাক না কেন, দেশের মঙ্গলে স্বার্থত্যাগ করতে সাধারণ মানুষ পিছপা হয় না।
এবারও দেশবাসী যুদ্ধ চেয়েছিল পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য। পাক অধিকৃত কাশ্মীর ছিনিয়ে আনার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশের মানুষ ভেবেছিল, সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই শুরু হয়েছে এয়ার স্ট্রাইক। এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের ধারাবাহিক অশান্তি পাকানোর ইচ্ছার কফিনে পেরেক পড়বে। পাকিস্তানের খুচরো অশান্তি চিরতরে বন্ধ করার জন্যই ‘কামারের এক ঘা’ হবে ‘অপারেশন সিন্দুর’। তারজন্যই দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে গোটা দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একযোগে সমর্থন জুগিয়েছে। বলাইবাহুল্য, আপামর ভারতবাসীর এই সমর্থন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদিকে নয়। 
একটা কথা মানতেই হবে, সূচনা পর্বে ‘অপারেশন সিন্দুর’ দেশের মানুষের মধ্যে যে ভাবাবেগ তৈরি করেছিল, এখন তা নেই। এর প্রথম কারণ যদি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাদাগিরি মার্কা বিবৃতি হয়, দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ বিরতির আগাম ঘোষণায় ভারতের প্রতিটি সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্প  বিশ্বের ধনীতম দেশের প্রেসিডেন্ট, হতে পারে তিনি পাকিস্তানের পরম বন্ধু, কিন্তু ভারতবর্ষকে অপদস্থ করার অধিকার তাঁকে কেউ দেয়নি। আমেরিকার ‘দাদাগিরি’তে ভারতবাসীর মনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে তা কিছুটা প্রশমিত হতো যদি আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটা যুতসই জবাব দিতেন। যদি বলতে পারতেন, ‘মিস্টার ট্রাম্প আপনি অনধিকার প্রবেশ করেছেন।’ কিন্তু, সেটা তিনি করেননি। তার কারণ বন্ধুত্ব নাকি কৌশল, সেটা সময় বলবে। 
যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটতেই বিজেপি এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে 
যুদ্ধকে ভাঙিয়ে ভোটে সুবিধে পাওয়ার জোর 
লড়াই। পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হানার দিন থেকেই বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাদের গাফিলতিতে এত বড় ঘটনা, সেটা সামনে আনা হল না। কতজন অফিসারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে, সেটাও দেশবাসী জানতে পারেনি। তার বদলে হামলাকারী ও আক্রান্তদের ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখানো হল। হিন্দুরা আক্রান্ত বলে ফলাও করে প্রচার চালানো হল। উদ্দেশ্য, হিন্দুভোট এককাট্টা করা।
জঙ্গিদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু করা প্রত্যাঘাতের নাম দেওয়া হল ‘অপারেশন সিন্দুর’। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিন্দু মহিলাদের আবেগ। বিরোধীদের দাবি, এর পিছনেও রয়েছে রাজনীতি। লক্ষ্য, মহিলা ভোটারদের কাছে টানা। কিন্তু তাতে ‘চোনা’ ফেলে দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশের বিজেপি মন্ত্রী বিজয় শাহ। তিনি ‘অপারেশন সিন্দুর’ অভিযানের অন্যতম মুখ সোফিয়া কুরেশির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন। দেশের হয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করা একজন বীরাঙ্গনা নারীকে ‘জঙ্গিদের বোন’ আখ্যা দেওয়ায় গোটা দেশ বিজেপি মন্ত্রীকে ধিক্কার জানাচ্ছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে। জাতীয় মহিলা কমিশন মন্ত্রীকে ভৎর্সনা করেছে। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু বিজেপি কী করেছে? 
বিজেপি নেতা মুক্তার আব্বাস নাকভি তাঁকে ‘বোকা’ বলে কটাক্ষ করে দায় সেরেছেন। বিরোধীরা বলছে, বিজয় শাহ ‘বোকা’ বলেই বিজেপির মনের কথাটা বলে ফেলেছেন। বিজয় সাহেব বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিজেপির কাছে মা-বোনেদের কী সম্মান! এত কিছুর পরেও বিজেপির পক্ষ থেকে বিজয় শাহের বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিজেপি আন্তরিকভাবে মহিলাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করলে তাঁকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য করত। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ না করলেও বাংলা তা করে দেখিয়েছে। উদাহরণ অখিল গিরি। বনদপ্তরের মহিলা অফিসারকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ায় তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
কিছুদিন পরই বিহার বিধানসভা নির্বাচন। তারপরই বাংলার ভোট। তাই হিন্দু ভোটকে এককাট্টা করতে মরিয়া বিজেপি। যুদ্ধ থেকেও রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিজেপি। পিছিয়ে নেই বিরোধীরাও। পূর্ণম সাউকে পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসার কৃতিত্ব নিয়েও চলছে দড়ি টানাটানি। তাঁর স্ত্রীকে টিভির সামনে আনা হয়েছে এক কপাল সিঁদুর লেপে। সবটাই পরিকল্পনা। যুদ্ধ ভাঙিয়ে ভোট টানার কৌশল। অনেকেই চাইছেন, জাতপাত, ধর্মের মতো যুদ্ধকেও ভোট রাজনীতিতে ব্যবহার করা যাবে না বলে নির্বাচন কমিশন কড়া ফতোয়া জারি করুক। 
তবে সৌভাগ্যের বিষয়টি হল, সেনাবাহিনীকে সমস্ত রাজনৈতিক দলই কুর্নিশ জানাচ্ছে। কারণ সেনাবাহিনী কোনও দলের হয়ে কাজ করে না। তারা লড়াই করে দেশের জন্য। সব দলই ভারত মায়ের বীর সন্তানদের ধন্যবাদ জানাতে মিছিল করছে। তারই মধ্যে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা নিয়ে বিজেপিকে তীব্র কটাক্ষ হজম করতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশ ভ্রমণ করা প্রধানমন্ত্রী কেন পাকিস্তান ইস্যুতে ‘বন্ধু’ দেশের সমর্থন জোগাড় করতে পারলেন না? 
নির্বাচনী সাফল্য পাওয়ার জন্য বিজেপি হিন্দুত্বের লাইনকেই আঁকড়ে ধরেছে বারবার। সেই লক্ষ্যেই এগচ্ছিল বঙ্গ বিজেপি। যুদ্ধ-আবহে জঙ্গিদের 
বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন 
বাংলার বীর সন্তান ঝণ্টু আলি শেখ। ‘লাইনচ্যুত’ হওয়ার ভয়ে তাঁকেও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছিল বিজেপি। ‘অপারেশন সিন্দুর’ আঘাত হেনেছে 
সেই বিভাজনের রাজনীতির মূলে। প্রধানমন্ত্রী বুঝেছেন, দেশকে সুরক্ষিত রাখতে গেলে ব্যোমিকা সিংদের পাশে সোফিয়া কুরেশিদেরও দরকার। সঙ্কটকালে নরেন্দ্র মোদি যেটা বুঝলেন, সেটা বঙ্গ বিজেপি বুঝবে কবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ