Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নির্বাচিত সরকারের পক্ষে

বিধানসভায় পাস হয়েছে দশটি বিল। কিন্তু আটকে রয়েছে চেন্নাই রাজভবনের মর্জিতে। এম কে স্ট্যালিনের রাজ্যের ওই ঘটনায় রাজ্যপাল আর এন রবিকে এক হাত নিল শীর্ষ আদালত।

নির্বাচিত সরকারের পক্ষে
  • ১০ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিধানসভায় পাস হয়েছে দশটি বিল। কিন্তু আটকে রয়েছে চেন্নাই রাজভবনের মর্জিতে। এম কে স্ট্যালিনের রাজ্যের ওই ঘটনায় রাজ্যপাল আর এন রবিকে এক হাত নিল শীর্ষ আদালত। তাঁর ভূমিকার কড়া সমালোচনা করল সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ। মঙ্গলবার বিচারপতি জে বি পার্দিওয়ালা ও বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিল, রাজ্যপালের ওই পদক্ষেপ ‘অবৈধ’ এবং ‘স্বেচ্ছাচারী’। শুনানিতে দুই বিচারপতি সাফ জানিয়ে দেন, বিল আটকানোর এক্তিয়ার নেই রাজ্যপালের। তা সত্ত্বেও রাজ্যপাল যেভাবে রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য দশটি বিল রেখে দিয়েছিলেন, তা সংবিধানের পরিপন্থী। ‘অজুহাত’ কথাটি হয়তো সুপ্রিম কোর্ট উচ্চারণ করেনি, কিন্তু দেশবাসী বিলক্ষণ জানে, এটা নিছকই এক রাজনৈতিক অজুহাত। তবে সর্বোচ্চ আদালত এই সাংবিধানিক সংকটে যে বিচার করে দিয়েছে তা নিঃসন্দেহে ‘ঐতিহাসিক’। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীও ওই রায়কে একই আখ্যা দিয়েছেন। এম কে স্ট্যালিন বলেছেন, ‘এই রায় শুধু তামিলনাড়ু নয়, দেশের সমস্ত রাজ্যের জয়।’ 

Advertisement

বাস্তবিকই এই রায়ে আশার আলো দেখছে বাংলা। কেননা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় একের পর এক বিল পাস হওয়ার পরেও সেগুলিকে আইনে পরিণত করা যায়নি। সৌজন্যে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ রাজ্যের রাজভবন। গত এক দশকে নানা সময়ে মোট ২৩টি বিল রুখে দিয়েছে রাজভবন: ডানলপ ইন্ডিয়া লিমিটেড বিল ২০১৬। জেশপ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড বিল ২০১৬। এস্টেস অ্যাকুইজিশন বিল ২০১৭। ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস বিল ২০১৮। কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর বিল ২০১৮। প্রিভেনশন অব লিঞ্চিং বিল ২০১৯। হাওড়া মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২১। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি ল’স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অব অ্যানিমাল অ্যান্ড ফিশারি সায়েন্স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ল’স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। ওয়েস্ট বেঙ্গল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ল’স সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যাক্সশন ট্রাইব্যুনাল অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। আলিয়া ইউনির্ভাসিটি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। ওয়েস্ট বেঙ্গল ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড টেনান্সি ট্রাইব্যুনাল অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২২। ওয়েস্ট বেঙ্গল টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৩। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি ল’স অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৩। স্কিল, নলেজ অ্যান্ড ফ্যাশন ইউনিভার্সিটি বিল ২০২৪। অপরাজিতা উওম্যান অ্যান্ড চাইল্ড বিল ২০২৪। ভবানীপুর গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বিল ২০২৪। রামকৃষ্ণ পরমহংস ইউনিভার্সিটি বিল ২০২৪। দি রবীন্দ্রনাথ টেগোর ইউনিভার্সিটি বিল ২০২৪। দি ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিনান্স বিল ২০২৫। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রতি কলকাতার রাজভবন চেন্নাইয়ের রাজভবনের চেয়ে অধিক ‘বিদ্বেষভাবাপন্ন’। জগদীপ ধনকার দিয়ে এখানে যার শুরু আনন্দ বোসেও তার বিন্দুবিসর্গ বদলায়নি। স্বভাবতই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর বাংলার বিলগুলির ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ নিয়েই জল্পনা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিশেষ আশান্বিত বলে জানিয়েছেন। 
শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২০০ উল্লেখসহ জানিয়েছে, রাজ্যপাল চাইলে কোনও বিলে সম্মতি না দিয়ে বিধানসভায় ফেরত পাঠাতে পারেন। কিন্তু বিলটি বিধানসভা থেকে পুনরায় পাঠানো হলে রাজ্যপাল তা আর ফেরত পাঠাতে পারেন না। তবে কোনও বিলকে জাতীয় স্বার্থ বা রাজ্যের নীতির পরিপন্থী বলে মনে করলে, সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর জন্য তিনি রেখে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার পরামর্শ নিতে হবে তাঁকে। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনও বিল আটকে রাখতে পারেন না রাজ্যপাল। এব্যাপারে সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন দুই বিচারপতি। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, মন্ত্রিসভার পরামর্শ ছাড়া একটি বিল সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে সর্বোচ্চ তিনমাস। কিন্তু বিধানসভায় পুনর্বিবেচনার পর সেটি রাজভবনে ফের পাঠানো হলে একমাসের মধ্যেই তাতে রাজ্যপালকে অনুমোদন দিতে হবে। এই সিদ্ধান্তে রাজ্যপালের ক্ষমতা কোনোভাবে খর্ব হচ্ছে না বলেও পরিষ্কার করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। রাজভবন আরও কেন মনে রাখবে না, বিধানসভাগুলিতে ‘নির্বাচিত’ রাজ্য সরকারের তরফে জনগণের প্রয়োজনেই বিভিন্ন বিল আনা হয়। সংশ্লিষ্ট আইন তৈরি এবং সংশোধন করা হয় সময়োচিত সুশাসন দেওয়ার প্রয়োজনেই। রাজভবন তো রাজ্য সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ‘মনোনীত’ রাজ্যপাল যদি প্রকৃতই অভিভাবক এবং গাইড হন তবে তাঁর কর্তব্য সরকারের ভালো কাজের পাশে থাকা। পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলাড়ু এবং অন্য বিরোধী রাজ্যগুলিতে রাজ্যপালরা মোদি সরকারের এজেন্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ কেন? যাঁদের রাজ্যবাসীর কল্যাণে ব্যাপৃত থাকার কথা তাঁদের যদি রাজ্য বিজেপির সংকীর্ণ রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় পাওয়া যায় তবে তা নিন্দনীয়। তাঁদের এমন প্রতিটি পদক্ষেপ সংবিধানের নির্দেশ এবং সুশাসন ও উন্নয়ন প্রয়াসের পরিপন্থী।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ