নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ক্যাম্পাসের নয়নের মণি, অভিভাবকসুলভ ‘দাদা’ মনোজিৎ মিশ্রই যে এরকম একটা কাণ্ড ঘটাবে, তা কল্পনা করতে পারছেন না সাউথ ক্যালকাটা ল’কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। তাঁরাই কলেজের দেওয়ালে ইংরেজিতে লিখেছিলেন, ‘মনোজিৎদার স্থান আমাদের হৃদয়ে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই পড়ুয়াদের এখন প্রশ্ন, ছাত্র রাজনীতির সতীর্থই এখন ‘দাদা’র বাগদত্তা। তাঁদের কর্মক্ষেত্রও এক, আলিপুর পুলিস আদালত। তাহলে হঠাৎ কেন এমন ঘটাতে গেল কালীঘাটের বাসিন্দা মনোজিৎ? নিজের রাজনীতির কেরিয়ারের দিকেও সে তাকাল না? অনুগামী সেই পডুয়ারাই এখন মনোজিতের কড়া শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।
কেমন ছিল অভিযুক্তের কেরিয়ার। কলেজ থেকে ২০২২ সালে আইন পাশ করে আলিপুর কোর্টের আইনজীবী হয়েছিল সে। পাশাপাশি, কলেজে
দখল রাখতে পরিচালন সমিতির বদান্যতায় জুটিয়ে নিয়েছিলেন শিক্ষাকর্মী হিসেবে অস্থায়ী চাকরি। পেশায় আইনজীবী অথচ কলেজে শিক্ষাকর্মীর চাকরিও চাই। ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, বেতনটা গৌণ বিষয়। আসল উদ্দেশ্য কলেজের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে রাখা। তাহলেই ছাত্রভর্তি, কলেজের টেন্ডার সম্পর্কিত কাজে ভাগ মিলবে। সেসবই হল মুখ্যবিষয়।
এসব করতে গেলে অন্যদিকে ভাবমূর্তি স্বচ্ছ রাখতে হয়। বিরোধীদের মারধর, পুরনো কলেজ ক্যাম্পাসে সিসি ক্যামেরার ভাঙচুরের ঘটনায় ভূমিকার কথা সামনে এলেও, এত বড় কাণ্ডে সে যে নিজেকে জড়াতে পারে, তা ভাবতে পারছেন না কেউই।
দক্ষিণ কলকাতার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ২০২১-২২ সালের ইউনিট প্রেসিডেন্ট মনোজিৎ সংগঠনের জেলা কমিটিরও সদস্য ছিলেন। খুব চেষ্টা চালাচ্ছিলেন জেলার যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ পাওয়ার জন্য। তাঁর সোশাল মিডিয়া ঘাঁটলেই জানা যায়, তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের কাছে মনোজিতের যাতায়াত ছিল। ওঠাবসা ছিল টিএমসিপি শীর্ষনেতাদের সঙ্গে। অন্য অভিযুক্ত প্রমিত মুখোপাধ্যায় হাওড়ার চ্যাটার্জিহাটের হরিনাথ ন্যায়রত্ন লেনের বাসিন্দা। সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে রীতিমতো আবৃত্তিচর্চা হয়। পরিবারের সবাই উচ্চশিক্ষিত। আরজিকর কাণ্ডের সময় মিছিলেও হেঁটেছিল পাড়ায় ঋজু বলে পরিচিত সদা মিশুকে প্রমিত। তাই এলাকার বাসিন্দারা কোনওভাবেই এই ঘটনার সঙ্গে তাকে মেলাতে পারছেন না।
দল অবশ্য এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, যে জানোয়ারগুলি এই কাণ্ড করেছে, মেরে তাদের পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেওয়া উচিত। এইসব অপরাধীদের সমাজে ছেড়ে রাখা যায় না, যাবেও না। বিজেপি নেতৃত্বাধীন গুজরাত সরকার ১১ জন ধর্ষককে মুক্তি পেতে সাহায্য করেছিল। তারপরে মালা দিয়ে বরণ করেছিল তাদের। শেষ পর্যন্ত শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করে এটি বাতিল করে। তাই বিজেপির এ বিষয়ে কথা বলাই উচিত নয়। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার কথা জানতে পেরে আমরা হতবাক। ডিপিআই ওই কলেজের উপাধ্যক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে ইতিমধ্যেই পরিচালন সমিতির বৈঠক ডেকে গাফিলতি চিহ্নিত করা এবং পরবর্তী কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। ক্যাম্পাসের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা হবে। পুলিস অভিযুক্তদের ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে। এবার ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হবে। টিএমসিপি’র রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য বলেন, অভিযুক্ত তৃণমূল করে কি না, সেটা বিবেচ্য নয়। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার চূড়ান্ত সাজা হবে। যে ছাত্রীর উপরে নির্যাতন হয়েছে, তাঁর পাশে না দাঁড়িয়ে বিরোধীরা রাজনীতি করতে শুরু করেছেন। প্রসঙ্গত, এদিন বিজেপি, কংগ্রেস ও ছাত্রপরিষদ, এসএফআই এবং ডিএসও দফায় দফায় কলেজ গেট এবং থানার সামনে বিক্ষোভ দেখায়। পথও অবরোধ করে। ক্যাম্পাসে ঢুকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফ্লেক্স ছিঁড়ে দেয় এসএফআই। এর জেরে রাজডাঙা মেন রোড, কে এন সেন রোডে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তীব্র যানজট ছিল।