Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বন্যা: কেন্দ্রের কোনও দায় নেই?

বাংলায় একটা কথা আছে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া। দিল্লি বিজেপির লাগাতার বঞ্চনা ও প্রতিহিংসার শিকার হতে হতে পশ্চিমবঙ্গেরও পিঠ ঠেকে গিয়েছে দেওয়ালে।

বন্যা: কেন্দ্রের কোনও দায় নেই?
  • ৯ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: বাংলায় একটা কথা আছে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া। দিল্লি বিজেপির লাগাতার বঞ্চনা ও প্রতিহিংসার শিকার হতে হতে পশ্চিমবঙ্গেরও পিঠ ঠেকে গিয়েছে দেওয়ালে। পিছনোর আর জায়গা নেই। লড়াই করে টিকে থাকতে হবে বুঝেই কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান কার্যকর করতে উদ্যোগী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বন্যা থেকে বাংলাকে বাঁচানোর দায়িত্ব নিতে হচ্ছে রাজ্যকেই। তাই দামোদরের উপর বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা। আপাতদৃষ্টিতে একে হুঙ্কার বলে মনে হলেও এটাই হয়তো ভবিতব্য। কারণ একটা বিষয় স্পষ্ট, দিল্লিতে বিজেপি সরকার থাকলে বাংলার কপালে বঞ্চনা ছাড়া আর জুটবে না কিছুই।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গবাসীর জীবনে বন্যা বার্ষিক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনও বছর ভুটান ও সিকিম থেকে নেমে আসা জলে উত্তরবঙ্গ ভাসে, কোনও বছর ডিভিসির ছাড়া জলে ডোবে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হয়। নষ্ট হয় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। অথচ দুর্ভোগ থেকে রাজ্যবাসীকে মুক্তি দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকারের নেই। এমনকী, কংগ্রেস আমলে তৈরি চারটি জলাধারও সংস্কার করছে না। তাতে দুর্ভোগ চরমে উঠছে। আগামীতে তা আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। 
বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে প্রকৃতি খামখেয়ালি আচরণ করবে। সতর্কবার্তা বিজ্ঞানীদের। তা সত্ত্বেও নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাভূমি ভরাটের ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনও তা হচ্ছে উন্নয়নের নামে, কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণও মিলছে। কখনও অনাবৃষ্টি, কখনও নামছে মেঘভাঙা বৃষ্টি। সর্বশেষ বিপর্যয় ‘দেবভূমি’ উত্তরাখণ্ডে। মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে ধরালিতে আছড়ে পড়েছে হড়পা বান। দেশলাইয়ের বাক্সর মতো ভেঙে পড়েছে একের পর এক বাড়ি।
বিজ্ঞানের উন্নতি সত্ত্বেও প্রকৃতির ধ্বংসলীলার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটেছে বারে বারে। তবে, মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। একটা সময় বিহার ও বাংলার বুকের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দামোদরকে বলা হতো ‘দুঃখের নদ’। বৃষ্টির অনিয়ন্ত্রিত জলধারা দামোদরের দু’কূল ভাসিয়ে পড়ত বঙ্গোপসাগরে। তাতে এই দুই রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতি হতো। সেই ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে দামোদরের ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় তৈরি করা হয়েছিল চারটি জলাধার। তাতে শুধু বন্যাই নিয়ন্ত্রিত হয়নি, সুজলাসুফলা হয়েছিল দামোদর উপত্যকা। তৈরি হয়েছিল একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ফলে একদা ‘দুঃখের নদ’ দামোদরকে ঘিরেই তৈরি হল নানান পরিকল্পনা, গড়ে উঠল একের পর এক শহর। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেখিয়েছেন, সঠিক পরিকল্পনায় ‘আপদ’ হয় ‘সম্পদ’।
স্বাধীন ভারতের প্রথম বহুমুখী জলপ্রকল্পগুলির গড় বয়স প্রায় ৭০ বছর। বয়সের ভারে মানুষ যেমন ক্রমশ দুর্বল হয়, তেমনই নানান রোগে আক্রান্ত ব্যারাজগুলি। পাহাড় থেকে বয়ে আনা লক্ষ লক্ষ টন পলি জমছে তিলাইয়া, কোনার, মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারে। সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের হিসেব, প্রতি বছর মাইথন জলাধারে ৬৮লক্ষ ঘনমিটার এবং পাঞ্চেতে ৫৬লক্ষ ঘনমিটার পলি জমছে। তাতে ব্যারাজের জলধারণ ক্ষমতা কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। তাই ক্যাচমেন্ট এলাকায় বেশি বৃষ্টি হলেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন(ডিভিসি) জল ছেড়ে দেয়। আর তাতেই প্লাবিত হয় দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। 
ক্যাচমেন্ট এলাকায় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। তাই ব্যারাজ বাঁচাতে ছাড়তে হচ্ছে জল। এটাই ডিভিসির অভিমত। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের দাবি, টানা বৃষ্টিতে দক্ষিণবঙ্গে যখন বন্যা পরিস্থিতি, তখনই ব্যাপকহারে জল ছাড়ছে ডিভিসি। তাতে বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হচ্ছে। বহু ঘরবাড়ি পড়ে যাচ্ছে। তাই এই বন্যা ‘ম্যানমেড’। ডিভিসির জল ছাড়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অতীতে ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে যাঁদের জীবন দুর্বিষহ তাঁদের কী হবে?
হুগলি জেলার খানাকুল-১ ব্লকের পশ্চিম ঘোষপুর গ্রামের অজিত মাইতির সংসারটা টিকে আছে চাষের উপর। পাট জমিতে বুক সমান জল। তাই কাটতে পারছেন না পাট। ফলে জমিতেই পচে যাচ্ছে। সাড়ে চার বিঘা জমিতে চাষের জন্য বীজতলা তৈরি করেছিলেন। তার চিহ্ন নেই। বৃদ্ধ অজিতবাবু বলেন, আলু চাষ হয় বলেই খেতে পাই। প্রতি বছর আমাদের বিপুল ক্ষতি হয়। দশকের পর দশক এটাই চলে আসছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।
খানাকুল-২ ব্লকের মাড়োখানার স্বরূপ পাত্র পেশায় গ্রামীণ চিকিৎসক। কেউ অসুস্থ হলে বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা করেন। তিনি পড়েছেন মহাফাঁপরে। কারণ রাস্তা বলে কিছু নেই। চারিদিকে জল। কোথাও কোমর সমান, কোথাও হাঁটু পর্যন্ত। সেই জলের মধ্যে হেঁটে রোগীর বাড়িতে যেতে হচ্ছে। তাঁরও একই বক্তব্য, এর বিহিত হওয়া দরকার। 
নিম্ন দামোদর এলাকার বাসিন্দারা ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে রয়েছেন। আগামী দিনে বিপদ আরও বাড়বে। দামোদর উপত্যকা নদী নিয়ন্ত্রক কমিটির মেম্বার সেক্রেটারি সঞ্জীব কুমারের কথাতেই তা স্পষ্ট। তিনি যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত বছরের তুলনায় এবার জুন ও জুলাই মাসে ১৬ গুণ বেশি জল জলাধারে ঢুকেছে। আর ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করলে পরিমাণটা ৪৩ গুণ। তাই ডিভিসি গত দু’মাসে রেকর্ড পরিমাণ জল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা দিন দিন বাড়বে। তাই প্রতি বছর বৃষ্টিপাতের পুরনো রেকর্ড ভাঙতে থাকবে, নাকি অনাবৃষ্টির জেরে খরা হবে, তা গবেষণার বিষয়। তবে পরিস্থিতি যে ক্রমশ জটিল হবে, তাতে কোনও সংশয় নেই। তা মোকাবিলার প্রস্তুতি একান্ত আবশ্যক। কারণ সেটা প্রদীপ জ্বালিয়ে বা থালা বাজিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। তারজন্য ব্যারাজের জলধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেটা করলে দু’দিকে লাভ। অনাবৃষ্টি হলে ব্যারাজে সঞ্চিত জল ছেড়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে। আবার অতিবৃষ্টি হলেও বেশি জল ধরে রেখে তা সময়মতো ছাড়া যাবে। তারজন্য হয় নতুন ব্যারাজ তৈরি করতে হবে অথবা জলাধারের জমা পলি তুলে ফেলতে হবে। 
এই দাবি দীর্ঘদিনের। প্রয়াত মন্ত্রী বিনয় চৌধুরী এব্যাপারে অনেকবার ডিভিসির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। ২০১১ সালে সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন সেই দাবি কার্যত খারিজ করে দেয়। জানায়, মাইথন ও পাঞ্চেত থেকে পলি তুলতে লাগবে ৫০ হাজার কোটি টাকা। অভাবটা অর্থের নাকি সদিচ্ছার? এই প্রশ্নটা ওঠার কারণ নরেন্দ্র মোদি সরকার পাঁচ বছরে কর্পোরেট সংস্থার ঋণ মকুব করেছে প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকা। মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিল্পপতির স্বার্থে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারলে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ করবে না কেন? 
কথায় আছে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। উদাহরণ? ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। ১৯৮২ সালে শিলান্যাস হয়েছিল। তারপর শিলাবতী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। অনেক রাজনীতি হয়েছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান কার্যকর করতে এগিয়ে এসেছেন। তারজন্য খরচ হবে দেড় হাজার কোটি টাকা। বাজেটে বরাদ্দ করেছেন ৫০০ কোটি টাকা। কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে।
‘রাজা আসে যায়, রাজা বদলায়,/ নীল জামা গায়, লাল জামা গায়,/ এই রাজা আসে, ওই রাজা যায়/ জামা কাপড়ের রং বদলায়.../ দিন বদলায় না।’ কিন্তু যাঁরা দিন বদলে দিতে পারেন তাঁদের জায়গা হয় মানুষের মনের মণিকোঠায়। যেমনটি করে নিয়েছেন ‘ভারতরত্ন’ অটলবিহারী বাজপেয়ি। ছিল না তাঁর ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি। হাঁটুর ব্যথায় তিনি গট গট করে হাঁটতেও পারতেন না। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের ‘সোনালি চতুর্ভুজ’ দেশের অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে শক্তিশালী ভিতের উপর। তাঁর উত্তরসূরি নরেন্দ্র মোদি? তিনি ‘আচ্ছে দিনে’র স্বপ্ন দেখিয়ে জওহরলাল নেহরুর রেকর্ড ছুঁলেন। কিন্তু বাংলার বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে পারলেন না। আর দিন বদল? সে তো প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার মতো স্বপ্নই থেকে গেল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ