মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক শুল্ক’ (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চাপানোর হুমকি এখন ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এই নীতি কার্যকর হলে যে দেশ মার্কিন পণ্যের উপর যতটা শুল্ক নেবে, আমেরিকাও তার উপর ঠিক একই পরিমাণ শুল্ক আরোপ করবে। সূত্রের খবর, আমেরিকার নতুন শুল্ক নীতি আগামী ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি এতে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন তাঁরা। বিভিন্ন সমীক্ষক সংস্থার দাবি, ট্রাম্প ‘পারস্পরিক শুল্ক’চাপালে ভারতের সম্ভাব্য বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। নতুন শুল্ক নীতিতে ভারতের সবচেয়ে ক্ষতি হতে পারে গাড়ি নির্মাণকারী সংস্থাগুলির এবং কৃষি ক্ষেত্রে। আর সেটা অনুমান করে একেবারেই হাত গুটিয়ে বসে নেই নয়াদিল্লি। শুল্কর হিসাব কীভাবে মার্কিন প্রশাসন করবে, সেই সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকার অপেক্ষায় রয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। সূত্রের খবর, সেই অনুযায়ী লোকসান এড়াতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে কেন্দ্র। সমীক্ষকরা জানিয়েছেন, আমেরিকার নতুন শুল্ক নীতিতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ওষুধশিল্প, রাসায়নিক, টেক্সটাইল, শঙ্কর ধাতুর তৈরি পণ্য, অলঙ্কার, গাড়ি এবং খাদ্যপণ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আমেরিকায় ৭,৪০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে ভারত। এর মধ্যে মুক্তো, অন্য রত্ন এবং গয়নাই ছিল ৮৫০ কোটি ডলারের। এ ছাড়াও গত বছর ৮০০ কোটি ডলারের ওষুধ এবং ৪০০ কোটি ডলারের পেট্রোপণ্য আমেরিকায় রপ্তানি করে একাধিক ভারতীয় সংস্থা। অন্যদিকে, গত বছর ৪,২০০ কোটি ডলার মূল্যের সামগ্রী আমেরিকা থেকে আমদানি করেছিল ভারত। এর মধ্যে কারু শিল্পজাত পণ্য এবং যন্ত্রপাতির উপর ৭ শতাংশ, জুতো এবং পরিবহণ সরঞ্জামের উপর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং খাদ্যদ্রব্যের উপর ৬৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে নয়াদিল্লি। ফলে ঘরোয়া বাজারে এই সামগ্রীগুলির দাম যথেষ্টই চড়া ছিল। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতিতে এই আমদানি-রপ্তানিতে জোর ধাক্কা লাগবে। এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের দাবি, মার্কিন কৃষিপণ্যের উপর ‘সর্বাধিক পছন্দের দেশ’-গুলি (মোস্ট ফেভার্ড নেশনস) গড়ে পাঁচ শতাংশ শুল্ক নিয়ে থাকে। সেখানে ভারতে ওই শুল্কের পরিমাণ ৩৯ শতাংশ। আমেরিকার মোটরবাইকের উপর রয়েছে ১০০ শতাংশ শুল্ক। সেখানে ভারতীয় গাড়ি নির্মাণকারী সংস্থাগুলি মাত্র ২.৪ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আমেরিকার বাজারে বাইক বিক্রি করতে পারে। এই ব্যবধান বদলে দিতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে মার্কিন পণ্যের উপর গড়ে ৯.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যেখানে আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের উপর মাত্র ৩ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে। ট্রাম্প যদি সত্যিই পাল্টা শুল্কনীতি অনুসরণ করেন, তাহলে এই ব্যবধান মুছে যাবে এবং ভারতীয় রপ্তানিকারকদের যে ব্যয়-সুবিধা রয়েছে, তা বিলীন হয়ে যাবে। এতে ভারতীয় পণ্যগুলির প্রতিযোগিতামূলক মূল্য কমে যাবে, রপ্তানি আয় হ্রাস পাবে এবং শ্রমনির্ভর শিল্পগুলিতে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ভারতকে হয় শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়ার জন্য আমেরিকার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে, নয়তো দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। যদি ট্রাম্পের শুল্কনীতি আমেরিকার দেশীয় উৎপাদনকে উজ্জীবিত করে এবং আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়, তাহলে ভারতীয় সংস্থাগুলি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। মজুরি ব্যবধানের কারণেই মার্কিন উৎপাদিত যন্ত্রাংশের দাম ভারতীয় পণ্যের তুলনায় বেশি থাকবে। এও ঠিক, এই শুল্কনীতি সব দেশের জন্য কার্যকর হয়, তাহলে সকলের জন্যই খরচ বাড়বে এবং প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে। দুনিয়াজুড়ে নতুন এক লড়াই শুরু হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি কমে গেলে ভারতের বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মোদির সরকার ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার জন্য কিছু আগাম ছাড় দিয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে আমেরিকা থেকে আমদানি করা বোরবন (হুইস্কিবিশেষ), ওয়াইন ও বৈদ্যুতিন যানবাহনের উপর শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। এমনকী হার্লে-ডেভিডসন বাইকের দামও ভারতে কমানো হয়েছে। এই বাইকে আগে শুল্কের পরিমাণ ছিল ৫০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমিয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, আমেরিকার মন গলাতে আগামী দিনে আমেরিকা থেকে জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধি করার রাস্তায় হাঁটতে পারে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, এই ছাড় কি ট্রাম্পকে শান্ত করতে পারবে? যদি ভারতীয় রপ্তানিকারীরা আমেরিকার বাজার হারান, তাহলে তাঁরা কি বিকল্প বাজার খুঁজে পাবেন?