Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মরছে কৃষক, নীবর দর্শক কেন্দ্র

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) হিসেবে, মোদি জমানার প্রথম ন’বছরে (২০১৪-২২) দেশে লক্ষাধিক কৃষক আত্মঘাতী হয়েছিলেন।

মরছে কৃষক, নীবর দর্শক কেন্দ্র
  • ৪ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) হিসেবে, মোদি জমানার প্রথম ন’বছরে (২০১৪-২২) দেশে লক্ষাধিক কৃষক আত্মঘাতী হয়েছিলেন। অর্থাৎ দৈনিক আত্মঘাতী কৃষকের সংখ্যা ছিল অন্তত ৩০! তারপর কেটে গিয়েছে আরও আড়াই বছর। কিন্তু কৃষকের দুর্দাশার ছবিটার কিছুমাত্র পরিবর্তন হয়েছে কি? কী বলছে সরকারি পরিসংখ্যান? ডাবল ইঞ্জিন রাজ্য মহারাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম তিনমাসেই ৭৬৭ জন কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় খোদ বিজেপির সরকারই এই তথ্য জানিয়েছে।  মহারাষ্ট্রে, মূলত বিদর্ভে কৃষকদের আত্মহত্যার বিষয়ে তথ্য চেয়েছিলেন এক কংগ্রেস বিধায়ক। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধিরও দাবি জানান তিনি। জবাবে দেবেন্দ্র ফড়নবিশ সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রী মারকণ্ড পাতিল জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চে মহারাষ্ট্রে ৭৬৭ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের মধ্যে আর্থিক সাহায্য পেয়েছে ৩৭৬ জনের পরিবার। ওই তিনমাসে শুধু পশ্চিম বিদর্ভেই ২৫৭ জন কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই সরকারি সাহায্য পাননি। এরই মধ্যে বৃদ্ধ কৃষক দম্পতি অম্বাদাস পাওয়ার এবং তাঁর স্ত্রী মুক্তাবাইয়ের চাষের কাজের একটি মর্মান্তিক ভিডিও সামনে এসেছে। তাতে মুখ পুড়েছে বিজেপি সরকারের। ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, সর্বশক্তি দিয়ে লাঙল টানছেন লাতুরের ৭৫ বছরের অম্বাদাস। পিছনে হাল ধরে রেখেছেন তাঁর স্ত্রী। খবরে প্রকাশ, কয়েকবছর ধরে এভাবেই চাষ করছেন তাঁরা। আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে তাঁদের। ফলে পরিবারটি এমন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যে ট্রাক্টর, এমনকী হালের বলদ পর্যন্ত বেচে দিতে হয়েছে। জনমজুর ডাকারও টাকা নেই পরিবারটির। এজন্যই তাঁদের এমন করুণ দশা। অবশ্য এই পাওয়ার পরিবার একমাত্র নয়, মহারাষ্ট্রে বহু কৃষকই আজ এমন দুর্গতিতে পড়েছে। রাজনীতির কারবারিদের যা নীতি—এই ঘটনার দায় যথারীতি মহারাষ্ট্রের কোনও নেতা এবং সরকার নেননি। তাঁরা বরং কৃষকদেরই বিস্তর ফিরিস্তি দিয়েছেন। সেখানে নাকি পিএম কিষান সম্মান প্রকল্পের সফল রূপায়ণ হয়েছে। হতাশাগ্রস্ত কৃষকদের কাউন্সিলিংয়েরও ব্যবস্থা করেছে সরকার। সেচসেবিত জমির পরিমাণ বৃদ্ধির লক্ষ্যেও নিরন্তর কর্মযজ্ঞ চলেছে সেখানে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এই মৃত্যুমিছিলের ব্যাখ্যা কী? কোনও যুক্তগ্রাহ্য জবাব মেলেনি। 

Advertisement

এ তো গেল একটিমাত্র রাজ্যের কথা। বাকি দেশের ছবিটা এখানে পরিষ্কার নয়। এনসিআরবির পরবর্তী রিপোর্ট কিংবা সংসদে এই বিষয়ে সরকারের বক্তব্য এবং বেসরকারি কিছু সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্টের জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে কৃষকের আত্মহত্যার গত একদশকের প্রবণতা আমাদের কোনোভাবেই আশান্বিত করে না। কিন্তু এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? ক্ষমতা দখলের আগে কী বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদি? প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন,  তিনি ক্ষমতা পেলে কৃষকের জীবন বদলে দেবেন। কৃষকদের ‘অন্নদাতা’ নামে সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, তাঁর সরকার ভারতের কৃষকের আয় দ্রুত দ্বিগুণ করে দেবে। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (এমএসপি) নিশ্চয়তার ‘স্বপ্ন’ দেখিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’-এর নেতাও যা বলেছিলেন তা কথার কথা মাত্র। কিছু সাধারণ নেতার মতোই ভোট কুড়নোর সংকীর্ণ কৌশলী রাজনীতি করেই কাটিয়ে দিচ্ছেন মোদি। 
এমএসপি চালুর পরিবর্তে মোদি সরকার এমন তিনটি কৃষি আইন তৈরি করেছিল, যেগুলি ভারতের কৃষকের স্বার্থের পরিপন্থী। ফলে তাদের পক্ষে সেগুলি মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। দেশজুড়ে লাগাতার প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল। আইন তিনটির ব্যাপারে সরকার শেষমেশ পিছু হটতে বাধ্য হলেও এমএসপি নিশ্চিতকরণসহ একঝাঁক ইস্যু এখনও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কৃষকরা আজও আন্দোলনের মধ্যে রয়েছেন। এদেশে কৃষকের দুর্দশার বড় কারণ, আজও অসংখ্য কৃষক মহাজনি ঋণের ফাঁদে পড়ে হাঁসফাঁস করছেন। সকলে সহজ শর্তে এবং কম সুদের হারে ব্যাঙ্কঋণের সুবিধা পান না। ফসল বিমার সুবিধাবঞ্চিত কৃষকের সংখ্যাও বিপুল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত কৃষক পরিবারের ঋণ মকুবের দাবিও পূরণ হয় না এদেশে। অথচ একদল ধনী ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীর হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্কঋণ এই সরকারই মকুব করে দেয় অবলীলায়। এহেন দরাজ সরকারের সৌজন্যে ব্যাঙ্কগুলি অনুৎপাদক সম্পদের (এনপিএ) ভারে নুয়ে পড়লেও ক্ষমতার আসন নির্বিকার। সরকার শুধু কৃষক আর মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দুয়ে নেওয়ার খেলায় চ্যাম্পিয়ান!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ