সংসার-সাগরে জননীর জীবন জ্বলন্ত এক দৃষ্টান্ত। ছোট-বেলা থেকেই শ্রীশ্রীমা সারদা সংসারের সব ঝামেলা পুইয়েছেন। সংসারের স্বরূপ সারদাদেবী দেখেছেন। সেখানকার স্বার্থপরতার সাংঘাতিক অবস্থা অনুভব করেছেন তিনি। শ্রীশ্রীমায়ের ভাইরা পর্যন্ত সংসারের স্বার্থপর সীমাতে সীমিত ছিলেন। মায়ের মতো মহিমাময়ী দিদিকে দিয়েও তাঁরা নিজেরা নিজেদের সাধ্যমতো স্বার্থ সিদ্ধিতে সচেষ্ট ছিলেন। সেজন্য সারদা মা মনের দুঃখে বলতেন: “এত লোক যে এখানে কত কষ্ট স্বীকার করে কি জন্যে আসে, তা কি ওরা একটুও বোঝে না? সর্বদা টাকা-কড়ি চায়, কখনও তো ভুলেও জ্ঞান-ভক্তি চাইল না।” আবার অনেক সময় সারদাদেবী বড় বেদনায় বলতেন: “ওদের মা-বাপের পুণ্যেই ওদের দিদি হয়ে জন্মেছি।”
১৩২৫ সন সেটা—পৌষ মাসের গোড়ার দিক—বাজে বেলা ১০-১১টা। জয়রামবাটীতে জননী সারদাদেবী সদর দরজার রকে বসে আছেন। সাধু-ব্রহ্মচারীরা বৈঠকখানার বারান্দায় বসে আছেন। সামনে কালীমামা ও প্রসন্নমামার খামারের ধান আসছে। কালীমামা খামারের পথের দিকে একটু রাস্তা চেপে বেড়া বেঁধেছেন। তাতে বরদামামার বড় অসুবিধা হচ্ছে ধানের বস্তা বয়ে আনতে।
এবার এই নিয়ে নিদারুণ বচসা বেঁধে গেল দুই ভাইয়ের মধ্যে। শেষে হাতাহাতি হবার উপক্রম হতেই সারদাদেবী স্থির থাকতে পারলেন না আর। অমনি গিয়ে তাঁদের একজনকে বললেন: “তোর অন্যায়।” আবার অন্য একজনকে হাত ধরে টেনে আনছেন। সারদাদেবী সকলের বড়। তাই তাঁর হস্তক্ষেপে হাতাহাতি হলো না বটে, ঝগড়া কিন্তু কিছুতেই থামে না। সারদাদেবীও সরতে পারছেন না তাঁদের ঐ অবস্থায় ফেলে রেখে। ইতিমধ্যে সাধুরা সেখানে উপস্থিত হওয়ায় দুই ভাইয়ে গর্জাতে গর্জাতে গেলেন চলে যে যাঁর ঘরে। এদিকে সারদাদেবী সক্রোধে স্বগৃহে গিয়ে বারান্দার ওপর বসলেন পা ঝুলিয়ে। মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল রাগ। সংসারের এই লীলায় স্বার্থ-সংঘর্ষের পেছনে যে শাশ্বত শান্তি আছে, সেকথা সারদা মায়ের মনে উদ্ঘাটিত হওয়ায় তিনি হাসতে হাসতে বলে উঠলেন: “মহামায়ার কি মায়া গো। অনন্ত পৃথিবীটা পড়ে থাকবে। জীব এইটুকু আর বুঝতে পারে না?”
পরিমল চক্রবর্তী ও অপর্ণা চক্রবর্তীর ‘শ্রীশ্রীমা সারদা কথামৃত’ থেকে