


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাংলায় অঙ্গদান আন্দোলনে যে সংগঠনের কথা না বললেই নয়, তার নাম হল গণদর্পন। ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলায় মরণোত্তর দেহ ও অঙ্গদানে সচেতনতা বাড়ানোই তাদের পাখির চোখ। পরে ক্যাডাভেরিক অর্গান ডোনেশন বা ব্রেন ডেথ নীতি ঘোষিত হওয়ার পর তা নিয়েও মানুষকে সচেতন করতে শুরু করে তারা। কিন্তু চক্ষুদানের প্রশ্নে বাংলার অসংখ্য মানুষ যেমন এক কথায় রাজি হয়ে যেতেন, ব্রেন ডেথের পর অঙ্গদানের কথা শুনলে তাঁরাই আকাশ থেকে পড়তেন। ‘ব্রেন ডেথ’ বা ‘মস্তিষ্কের মৃত্যু’ বিষয়টি কী, লোকজনকে বোঝাতেই দম বেরিয়ে যেত চিকিৎসকদের।
ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া কেউই এবিষয়ে রাজি হতেন না। একারণে ভুগতেন কিডনি, লিভার বা হার্টের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকা মরণাপন্ন রোগী বা বাড়ির লোকজন। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ময়দান না ছাড়ায় সুফল মিলতে শুরু করেছে। এখন ব্রেন ডেথ ঘোষণা হওয়া ৭০ শতাংশ রোগীর পরিবারই রাজি হচ্ছেন প্রিয়জনের অঙ্গদানে। সরকারি সূত্রে মিলেছে এই তথ্য।
স্টেট অর্গান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্টেশন অর্গানাইজেশন বা সোটো সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত রাজ্যে ১৪৩ জন রোগীর ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষিত হয়েছে। তার মধ্যে করোনা পর্বের হাতেগোনা ক’টি দেহ বাদে দিলে বাকি সবক্ষেত্রেই কোনও না কোনও অঙ্গ ছিল প্রতিস্থাপনযোগ্য। তার মধ্যে ৭০ শতাংশ বাড়ির লোকজনই প্রিয়জনের অঙ্গদানে রাজি হয়েছেন
যাঁরা রাজি হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন? যাঁরা রাজি নন, কেনই বা নন? রাজ্যের একটি নামকরা হাসপাতালের ট্রান্সপ্লান্ট কো অর্ডিনেটর বলেন, এখন মানুষ অনেক সচেতন। অন্যের শরীরে প্রিয়জন বেঁচে থাকবেন, এই যুক্তিতে অনেকে রাজি হচ্ছেন। আবার প্রিয়জনের অঙ্গ থেকে আর পাঁচজন নতুন জীবন পাবেন— এটাও অনেকের রাজি হওয়ার কারণ।
রাজি না হওয়ার অন্যতম কারণ, এক, কুসংস্কার (যেমন, চোখ বাদ গেলে পরের জন্মে অন্ধ হয়ে জন্মাবে, এমন ভ্রান্ত বিশ্বাস), দুই, শরীরজুড়ে কাটাকাটির ক্ষতচিহ্ন থাকার আশঙ্কা। তিন, ‘ব্রেন ডেথ’কে মৃত্যু হিসেবে মানতেই চান না অনেকে। ভাবেন, হার্ট চলছে। নাড়ির গতিও রেকর্ড হচ্ছে। উনি তো মারা যাননি? ওই কো অর্ডিনেটর বলেন, অনেককে বিশ্বাস করানোই যায় না, মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটে গিয়েছে। কৃত্রিম সাপোর্টে আছেন বলে রোগীর নাড়ির গতি রেকর্ড হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চোখের ক্ষেত্রে আমরা কর্নিয়াটুকু গ্রহণ করি। মণি নয়। কর্নিয়া হল মণির উপরে থাকা পাতলা একটি আস্তরণ। অঙ্গ উত্তোলনের পর মৃতদেহকে সম্মান এবং প্রিয়জনের আবেগের কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকরাই ক্ষতস্থানে পর্যাপ্ত সেলাই দেন। তাই এইসব ধারণাগুলি অমূলক। পথ দুর্ঘটনার শিকার ২৩ বছরের ভাইয়ের ব্রেন ডেথের পর তাঁর অঙ্গদানে সম্মত হন হাওড়ার পূজা পাল। সোমবার বলেন, ভাইকে হারানোর শোক ভোলা অসম্ভব। প্রতি মুহূর্তে ওর কথাই মনে পড়ছে। কিন্তু আমরা সবাই মিলে এটাও ভেবেছিলাম, ওকে তো আর ফিরে পাব না, ওর জন্য যদি কয়েকজন নতুন জীবন পান, তার চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। তাই প্রিয়জনের ব্রেন ডেথ হলে অঙ্গদানে পিছিয়ে আসবেন না।