Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মিথ্যা অভিযোগ, বড় অপরাধ

অপরাধ নতুন কিছু নয়, আদিম ব্যাধি। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের মধ্যে সঞ্চয়প্রবণতা প্রায় নেই। অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জেনেছে, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’

মিথ্যা অভিযোগ, বড় অপরাধ
  • ২৮ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অপরাধ নতুন কিছু নয়, আদিম ব্যাধি। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের মধ্যে সঞ্চয়প্রবণতা প্রায় নেই। অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জেনেছে, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’ দুর্দিনেও যাতে বেঁচে থাকা যায় তার জন্যই মানুষ সঞ্চয় করতে শুরু করে। ‘সভ্য’ সমাজের একটি বলবান অসাধু গোষ্ঠী ‘সঞ্চয়’কে ‘মজুতদারি’র নামান্তর করে তুলেছে। তার ফলে দুর্দিনে দুর্বল শ্রেণির মানুষের কাছে বেঁচে থাকার জরুরি উপকরণগুলি মহার্ঘ হয়ে ওঠে। অর্থলোলুপ প্রতাপশালী গোষ্ঠীর নিষ্ঠুরতা চরমে পৌঁছলে বহু মানুষের জীবনে নেমে আসে মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষের পীড়ন। ছিয়াত্তর এবং পঞ্চাশের মন্বন্তরের নির্মম কাহিনি বাংলার ইতিহাসে দুই কালো অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু অপরাধপ্রবণ মন কেবল সম্পদের দখলদারিতেই থেমে না, তার থাবা প্রসারিত হয় নানা ক্ষেত্রে। চুরি, ডাকাতি, খনু-খারাবি থেকে নারীর সম্ভ্রমহরণসহ বহু ক্ষেত্রেই সে রাজ করতে মরিয়া। এজন্যই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলি ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ নীতি নিয়ে তৈরি করেছে উপযুক্ত আইন। অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করে অভিযোগ প্রমাণ করার দায়িত্ব পুলিসের। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, বহু ক্ষেত্রেই তদন্ত যথাসময়ে এবং যথানিয়মে করা হয় না। তাই তথ্য-প্রমাণ পেশের অভাবে অনেক সময়ই প্রকৃত অপরাধীও ‘বেকসুর’ খালাস হয়ে যায়। প্রশাসন এবং আদালত বা বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে এ কোনও ভালো বিজ্ঞাপন নয়। কেননা, সমাজের একাংশ এর দ্বারা বিরূপ হয়, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি তাদের পুরনো আস্থা টাল খায়। আইনি ব্যবস্থার এই ত্রুটির অপব্যবহারও করতে চায় কেউ কেউ। বিবেকের ঘরে তালা দিয়ে তারা কোনও কোনও সময় দুর্বল মানুষের নামে মিথ্যে অভিযোগ তোলে। মৌখিক অভিযোগ তুলেও ক্ষান্ত হয় না, অভিযুক্তনির্বিশেষে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনেও প্রবৃত্ত হয় তারা। কিছু অবিবেচক মানুষের এমন তাৎক্ষণিক উত্তেজনার পরিণতি কী মারাত্মক হতে পারে, তা বেশিরভাগ সময়েই ভেবে দেখা হয় না। গণপিটুনির মতো সংগঠিত অপরাধ এই ধরনের নির্মমতারই ফসল। 

Advertisement

সম্প্রতি সংঘটিত একাধিক কাণ্ড অপরাধ সংক্রান্ত স্মৃতিরোমন্থনের হেতু। মাস দুই আগের ঘটনা। দোকান থেকে চিপসের প্যাকেট চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক কিশোরকে কান ধরে ওঠবোস করানো হয়েছিল। সেই অপমানে আত্মঘাতীই হয় ওই কিশোর। সুইসাইড নোটে সে লিখে গিয়েছিল, ‘মা, আমি চুরি করিনি।’ পূর্ব মেদিনীপুরে পাঁশকুড়ার এই মর্মান্তিক ঘটনায় চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল অনেকের। ফের সেরকমই এক ঘটনা ঘটল সেই পূর্ব মেদিনীপুরেই! বৃহস্পতিবার কাঁথির পিছাবনিতে ইভটিজিংয়ের অভিযোগ এনে নবম শ্রেণির এক পড়ুয়াকে মারধর এবং চরম অপমান করা হয়। শেষমেশ ছেলেটি আত্মঘাতীই হয়েছে! যে মেয়েটিকে কেন্দ্র করে এত বড় কাণ্ড সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তারা দু’জনেই একই স্কুলের। পুলিস অভিযোগ পেয়েছে, মেয়েটির বাবা স্থানীয় বাজারে ছেলেটিকে আটকে রেখে প্রকাশ্যে মারধর করে। তা শুনে ছেলেটির মা-বাবা ছুটে যান। লজ্জায় অপমানে মাথা হেঁট হয়ে যায় তাঁদের। শুক্রবার ভোরে বাড়ির কড়িকাঠ থেকে ছেলেটির ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। ‘সুইসাইড নোটে’ ওই স্কুলপড়ুয়া কিশোর লিখেছে, ‘বাবা, আমি কিছু করিনি। ... মেয়েটিকে আমি চিনিও না।’ স্থানীয় সূত্রের খবর, অন্যান্য দিনের মতো বৃহস্পতিবারও স্কুলে গিয়েছিল ছেলেটি। সেদিনই বিকেলে স্কুলের বাইরে একদল ছাত্র ওই মেয়েটিকে কটূক্তি করে বলে অভিযোগ। সন্ধ্যার দিকে মেয়েটির বাবা ওই ছেলেটিকে পেয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করে। পরে তার বাবা-মা পৌঁছে ছেলেটিকে বাড়ি নিয়ে গেলে সে জানায়, সে কাউকেই কোনও খারাপ কথা বলেনি। একদল ছাত্রের সঙ্গে সে ছিল মাত্র। সেই ভিড় থেকেই কেউ মেয়েটিকে খারাপ কথা বলে থাকতে পারে। কিন্তু তার দায় তো তার নয়। এই ঘটনায় সে এমন ভেঙে পড়েছিল যে রাতে বাড়িতে খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত করেনি। আরও মর্মান্তিক ব্যাপার, সে নিজেকেই শেষ করে দিয়েছে! 
একমাত্র একজন নির্দোষ নিরপরাধ মানুষই জানে, যখন তারা নির্যাতনের শিকার এবং অপমানিত হয় তখন তার যন্ত্রণা কতটা অসহনীয়। আর যে-দুটি ঘটনার কথা এই লেখায় উল্লেখ করা হল, তার কেন্দ্রে দুটি কোমলমতি কিশোর। কুটিল সমাজের এই কদর্য চেহারার মোকাবিলা কীভাবে করতে হয়, তা শিখে নেওয়ার সময় তারা পায়নি। কিছু লোকের ‘সামান্য’ ভুলের ‘চরম’ মাশুল গুনল দুটি জীবন! এই জিনিস চলতে থাকলে এরপর নারীনির্যাতন কিংবা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন, সন্দেহ থেকে যাবে। তাতে শেষমেশ ক্ষতি হবে নারীসুরক্ষার ধারণা ও ব্যবস্থারই। তাই মিথ্যা অভিযোগ তোলার দায়ও নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। আদালতের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজাও প্রাপ্য। এরা রেহাই পেলে দূষণমুক্ত সমাজগঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ