তন্ময় মল্লিক: ‘এসবই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কুফল। ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ টাকা নিমেষে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। গোটা দেশে জাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ছে। আরও কত কী হয়, দেখুন।’ কথাগুলি বলেই খদ্দেরের দিকে মন দিলেন বর্ধমান শহরের প্রবীণ ওষুধ বিক্রেতা। বাপের আমলের ব্যবসা। দোকানে ভিড় থাকায় কথা এগল না। কিন্তু জাল ওষুধ কারবারের সঙ্গে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সম্পর্কটা ঠিক কী? ভিড় একটু হাল্কা হতেই দোকানের সামনে ঝোলানো ১৫ শতাংশ ছাড়ের সাইনবোর্ডটা দেখালেন। বললেন, ‘সব্বনেশে ছাড়ের প্রতিযোগিতাই সব ছারখার করে দিচ্ছে। বেশি কমিশনের আশায় অনেকেই অনলাইনে ওষুধ কিনছেন। তারই সুযোগ নিচ্ছে ভিনরাজ্যের জাল ওষুধ ব্যবসায়ীরা। ওরা বাংলাকে টার্গেট করেছে।’
শুধু ওষুধ নয়, তেল, ঘি, সিগারেট, মশলা, টুথপেস্ট, যা কিছু জাল হয় তা সবই নামীদামি কোম্পানির। কারণ নামী কোম্পানির প্রোডাক্টের দাম বেশি। তাই নকল করলে লাভ পাওয়া যায় অনেকটাই। তাছাড়া বছরের পর বছর ব্যবহার করে সুফল পাওয়া কোম্পানির প্রোডাক্টের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহও থাকে বেশি। সরকারি নির্দেশ মেনে সরকারি চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে ওষুধের জেনেরিক নাম লেখেন। কিন্তু মুখে নামী ব্র্যান্ডের ওষুধ খাওয়ার পরামর্শই দিয়ে থাকেন। তাই জাল ওষুধ কারবারিদের টার্গেট নামী কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক সহ প্রেসার, সুগার, ক্যান্সার, গ্যাস-অম্বল সহ প্রায় সব ওষুধ। বাজারে পৌঁছে দিলেই তা হট কেকের মতো বিক্রি হয়ে যায়।
ওষুধ মানুষের প্রাণ বাঁচায়। রোগীকে সুস্থ করে। কিন্তু সেই ওষুধ ভেজাল হলে তা হয়ে যায় প্রাণঘাতী। অনেকে মনে করেন, করোনার পর জাল ওষুধ চক্র দেশজুড়ে শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে। করোনার পর মানুষের জীবনযাত্রা, আচরণ বদলে গিয়েছে। এমনকী বেশকিছু ওষুধ আগের মতো কাজ করছে না। তার ব্যাখ্যাও চিকিৎসকরা নানাভাবে দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, করোনার হাত থেকে বাঁচার জন্য অনেকে মুড়িমুড়কির মতো ওষুধ খেয়েছেন। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে। ফলে ‘ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট’ হয়ে গিয়েছে। সেই কারণেই আগে মানবদেহে ভীষণভাবে কার্যকরী কিছু ওষুধ এখন আর কাজ করছে না।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এখন একবার সর্দি, কাশি ধরলে সহজে সারতে চাইছে না। বিশেষ করে যাঁদের বয়স ষাটের উপর। আগে একটা অ্যান্টিবায়োটিকের পাঁচ বা সাতদিনের কোর্স শেষ করলেই রোগী সুস্থ হয়ে যেত। কিন্তু এখন সর্দিকাশি পিছু ছাড়ছে না। ওষুধ যতদিন চলছে, ততদিন কিছুটা সুস্থ থাকছে। বন্ধ হলেই আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। এতদিন এসবই করোনার ঘাড়ে চাপছিল। কিন্তু দেশজুড়ে জাল ওষুধ চক্রের পর্দা ফাঁস হতে জাগছে সংশয়, তাহলে কি ভেজাল ওষুধের জন্যই রোগ সারেনি!
সবচেয়ে বড় কথা, বেশকিছু নামীদামি কোম্পানির ওষুধের মানও নেমে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় ড্রাগ কট্রোল বিভাগের গুণগত মান যাচাইয়ের পরীক্ষায় ফেল করছে বেশকিছু নামী কোম্পানির ওষুধ। জেনেরিক ওষুধের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে তারাও কি তাহলে কোয়ালিটির সঙ্গে সমঝোতা করছে? সেই কারণেই কি গুণগত মান বজায় রাখতে পারছে না? এই প্রশ্ন কিন্তু উঠতে শুরু করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, নিম্নমানের ওষুধ তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও নজির কেন্দ্রীয় সরকারের ঝুলিতে নেই। কেন্দ্রীয় সরকার শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি করলে আম জনতাকে দুশ্চিন্তার পাহাড় মাথায় বয়ে বেড়াতে হতো না।
ওষুধ ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অনলাইনে ওষুধ বিক্রির ফলেই গোটা সিস্টেমটা নষ্ট হতে বসেছে। আগে কোম্পানি থেকে সিএনএফ/ডিপোয় ওষুধ যেত। সেখান থেকে স্টকিস্ট এবং রিটেলার অর্থাৎ খুচরো বিক্রেতার কাছে ওষুধ কিনতেন ক্রেতা। অনলাইনে ওষুধ বিক্রি শুরু হওয়ায় স্টকিস্ট ও রিটেলার থাকছে না। ফলে দু’টি ধাপের কমিশন বেঁচে যাচ্ছে। তাতে দোকানের থেকে কম দামে ওষুধ বিক্রির সুযোগ থাকছে। তাছাড়া বাড়িতে বসেই পাওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনীয় ওষুধ। যে সমস্ত বাড়িতে কেবল বয়স্করা থাকেন তাঁদের জন্য এই সিস্টেম একেবারে ‘লা জবাব’। কিন্তু এই সমস্ত সুযোগকে ‘টোপ’ হিসেবে কাজে লাগিয়েই জাল ওষুধ ব্যবসায়ীরা রমরমিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন ওষুধ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে বেশকিছু বহুজাতিক সংস্থা। পাশাপাশি এমন কিছু সংস্থা
তৈরি হয়েছে যাদের এই ধরনের ব্যবসায় কোনও অভিজ্ঞতা নেই। শোনা যাচ্ছে, ভিনরাজ্যের জাল ওষুধ চক্রের কিছু ঘনিষ্ঠ লোকজন ওষুধ ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছে। তাদের মাধ্যমেই উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে তৈরি জাল ওষুধ অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশি লাভের আশায় সেই ওষুধ বহু দোকানদারও রাখছেন। ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের অফার। তাতেও তাদের লোকসান নেই। কারণ মোড়ক নামী কোম্পানির হলেও ভিতরে থাকছে নিম্নমানের ওষুধ।
বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাংলায় ব্যাপকহারে জাল ওষুধ ঢুকে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। প্রায় প্রতিনিয়ত তাদের সদস্যদের চেকিংয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাতে অনেকে ওষুধ বিক্রেতাদের সন্দেহের চোখে দেখছেন। সংগঠনের রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক পৃথ্বী বসু এই পরিস্থিতির জন্য অনলাইনে ওষুধ বিক্রির রমরমাকেই দায়ী করেছেন। তিনি মনে করেন, অনলাইনে ওষুধ বিক্রির সূত্র ধরেই জাল ওষুধ চক্রের বাড়বাড়ন্ত। এমন কিছু সংস্থা তৈরি হয়েছে যাদের টিকি খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু তারাই অনলাইনে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। যারা জাল ওষুধ তৈরি করছে তারা দেশের শত্রু। তারা মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। এব্যাপারে কড়া আইন করতে হবে। তা করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকেই। কারণ ওষুধের গুণমান যাচাইয়ে ক্ষমতা আছে তাদেরই।
বিসিডিএ-র সাফ কথা, কেন্দ্রীয় সরকার মানুষকে সস্তায় ওষুধ খাওয়াতে চাইছে, খুব ভালো কথা। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু তারজন্য জেনেরিক, ব্রান্ডেড জেনেরিক এবং কোম্পানির ওষুধের প্রয়োজন নেই। সস্তার ওষুধ তৈরি করতে গিয়ে কোয়ালিটির সঙ্গে সমঝোতা করা হচ্ছে। তাতে মানুষের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। তারচেয়ে কেন্দ্র জিএসটি তুলে নিক। তাহলেই ওষুধের দাম অনেকটা কমবে। এক ধরনের ওষুধ তৈরি হলে ডিসকাউন্ট দেওয়ার অসম প্রতিযোগিতাও বন্ধ হবে। অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত বহুজাতিক সংস্থার ছাড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ছোট দোকানদাররা এঁটে উঠতে পারছে না। শুধু বাংলায় নয়, গোটা দেশে ওষুধ বিক্রেতাদের করুণ অবস্থা। অবিলম্বে এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।
বাংলায় কিছু না ঘটলেও শুধু অভিযোগ পেলেই ছুটে আসে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। কথায় কথায় শুরু হয়ে যায় সিবিআই ও ইডি তদন্ত। কিন্তু আন্তঃরাজ্য জাল ওষুধ চক্র নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ‘স্পিকটি নট’। বেশিরভাগ জাল ওষুধের কারখানা চলছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে। সেই কারবারে যারা ফুলেফেঁপে উঠছে ইডি কি তাদের দেখতে পাচ্ছে না? নাকি কারখানা ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যে বলেই চুপ কেন্দ্রীয় এজেন্সি? এরপরেও সিবিআই, ইডি হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আদালত কী বলবে জানা নেই। তবে, আম জনতা একটা কথা বলবেই, কংগ্রেস জমানার ‘তোতাপাখি’ নরেন্দ্র মোদির রাজত্বে হয়ে গিয়েছে শায়েস্তার ‘হাতিয়ার’।
এই মুহূর্তে দেশে কত জাল ওষুধ বাজারে ছড়িয়েছে, তার সঠিক হিসেব নেই। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া হিসেব বলছে, কেবল নামী কোম্পানির নামে ২০ হাজার কোটি টাকার ভেজাল ওষুধ বাজারে রয়েছে। জেনেরিক বা ব্রান্ডেড জেনেরিকের সংখ্যা ধরলে পরিমাণটা আরও বেশি হবে। এই সমস্ত ওষুধের সিংহভাগই তৈরি হচ্ছে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, ওড়িশার মতো কিছু রাজ্যে। বেশিরভাগ রাজ্যেই রয়েছে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। একুশের ভোটে ভ্রষ্টাচার রুখতে নরেন্দ্র মোদি বাংলায় এসে বলেছিলেন, ‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা’। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? ডাবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যেই প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দেওয়ার ‘মহাযজ্ঞ’। ডাবল ইঞ্জিন সরকার হলেই কি সাতখুন মাফ! তবে, এই কাজ যারা চালাচ্ছে এবং চলতে দিচ্ছে তাদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। বারবার কুম্ভস্নানেও ধোয়া যাবে না সেই পাপ।