বিজেপির বড় থেকে কুচো নেতারা গর্ব করে বলেন, মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। মোদিই গড়বেন দুর্নীতিমুক্ত ভারত। আর নিজের স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বোঝাতে ২০১৪-তে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী পদে বসার আগে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়াই তাঁর লক্ষ্য। সে সময়ে মোদির বলা জনপ্রিয় স্লোগান ছিল, ‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা।’ মানে সরকারি অর্থ নয়ছয় করব না, করতেও দেব না। মনমোহন সিংয়ের দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির দীর্ঘ তালিকা প্রচার করে বিজেপি বলেছিল, ‘সুশাসন সংকল্প, বিজেপি বিকল্প’। গত ১১ বছরে যে কোনও বক্তৃতায় মোদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রীতিমতো জেহাদ ঘোষণা করতে দেখা গিয়েছে। ভোটের ময়দানে এই দুর্নীতিকে হাতিয়ার করে বিরোধীদের জেলে পোরার ঘটনাকে তিনি প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। দুর্নীতির প্রশ্নে যিনি এমন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা শুনিয়ে চলেছেন, তাঁর আমলেই দেখা গিয়েছে দুর্নীতির চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েছে দেশ! মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারি, পেগাসাস, রাফাল যুদ্ধ বিমান কেনা, নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে মোদির দল ও সরকারের বিরুদ্ধে। ক্যাগ রিপোর্টেও অন্তত আটটি সরকারি প্রকল্পে অর্থ নয়ছয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক নির্মাণ, সরকারি সংস্থা ‘হ্যাল’-এ বিমান তৈরির নকশা, আয়ুষ্মান ভারতের মতো প্রকল্প। বিজেপির দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগকেও অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
এই আবহে এবার সরকারি অর্থ খরচের ‘স্বচ্ছতা’ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের করের টাকায় তৈরি রাজকোষের অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হচ্ছে তার সঠিক হিসাব নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। রাজ্যগুলির মধ্যে করের টাকা কীভাবে বণ্টন করা হবে, তা ঠিক করতে নিয়ম মেনে ষোলোতম অর্থ কমিশন কাজ শুরু করেছে। সেই কমিশনের কাছে রাজস্বের টাকা খরচের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি রিপোর্ট দিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি। তাতে বলা হয়েছে, সরকারের নিজেদের মধ্যে যে অর্থের আদানপ্রদান হয়েছে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। যে কৌশল ও ফর্মুলার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও রাজ্যগুলির মধ্যে কর বা রাজস্ব বণ্টন করা হয়েছে, তাতেও অস্বচ্ছতা স্পষ্ট। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকার চুপিসারে এমন কিছু গোপন ঋণ নিয়েছে যা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। এই অস্বচ্ছতা বা আর্থিক গোলমাল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও সরব হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এই সরকারি রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারিং ফান্ড বা আইএমএফ যে তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে খরচে স্বচ্ছতার প্রশ্নে মোদির ভারত ইউপিএ জমানার তুলনায় ৪০ ধাপ নেমে গিয়েছে। স্বচ্ছতার এই তালিকায় ২০১২ সালে ভারতের স্থান ছিল ১৪ নম্বরে। মোদির হাতযশে ২০২৩-এ তালিকায় ভারতের স্থান হয়েছে ৫৪-তে। আইএমএফ প্রতি দু’বছর অন্তর এই তালিকা তৈরি করে। স্বচ্ছতা নিয়ে সরকারি কমিটির রিপোর্ট বা আইএমএফের তালিকায় কেন্দ্রীয় সরকারের ‘কুকীর্তির’ তথ্যে পরিষ্কার, জনগণের করের টাকায় সমৃদ্ধ রাজকোষে নয়ছয়ের সম্ভাবনা প্রবল। হিসাব মতো, চলতি বছরে আরও একটি তালিকা প্রকাশের কথা আইএমএফের। তাতে কী অপেক্ষা করছে কেউ জানে না। অথচ জনগণের করের টাকা কোথায় কীভাবে খরচ হচ্ছে তা জানার অধিকার আছে আম আদমির। তাঁরাই রয়েছেন অন্ধকারে!
কেবল সরকারি অর্থ খরচের স্বচ্ছতার প্রশ্নে ভারতের অবনমনই নয়, মোদি জমানায় একমাত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি (বিশ্বে এক নম্বর) ছাড়া আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সূচকে তলানিতে ঠেকেছে ভারতের স্থান। যে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর এত হুঙ্কার, তার প্রকৃত ছবিটা হল, সরকারি স্তরে দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এখন ৯৬। এই সূচক নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাশ মার্ক হল ৪৩। ভারত ২০২২-এ পেয়েছিল ৪০, ২০২৩-এ ৩৯। আর ২০২৪-এ ৩৮ নম্বর। শুধু এই তিন বছর নয়, মোদি জমানায় প্রতিবছরই তাঁর এই প্রিয় বিষয়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনে ‘ফেল’ করেছে তাঁর সরকার। মোদির ভারত ক্ষুধা সূচকে ১২৭টি দেশের মধ্যে রয়েছে ১০৫ তম স্থানে। শান্তি সূচকে ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১১৬-তে, সুখের সূচকে ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১২৬-এ, লিঙ্গ বৈষম্যে ১২৯ তম স্থানে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানব উন্নয়নের মাপকাঠিতে ১৯২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩২। তালিকা দীর্ঘ। কথায় আছে, সকাল দেখলে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। মোদি যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন তালিকায় এমন তলিয়ে যাওয়া স্থান যে আরও দীর্ঘ হবে তাতে সন্দেহ নেই। তবু হয়তো আবারও লালকেল্লা থেকে ভাষণ দিতে গিয়ে ‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গার’ কথা বলবেন মোদি! অথবা শুনতে হবে সবকা বিকাশের কথা!