ভাগ্যিস ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি। নাহলে স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’র আরও একটা কীর্তির কথা প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো চাপা পড়ে যেত! বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশ হওয়ার প্রতিযোগিতায় তাঁর একমাত্র পুঁজি ভারতের বিপুল জনসংখ্যা। সেই শক্তিতে ভর করে তাঁর নেতৃত্বে ভারত আগেই ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো দেশকে পিছনে ফেলেছে। গত শনিবার আইএমএফ-এর তথ্য পেশ করে নীতি আয়োগের সিইও জানান, জাপানকে পিছনে ফেলে ভারত এখন বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে গিয়েছে। এই গতিতে চললে আর তিন বছরের মধ্যে ভারত জার্মানিকে পিছনে ফেলে তৃতীয় হয়ে যাবে। মানে ‘ব্রোঞ্জ মেডেল’। কিন্তু সিইও’র ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ কী কথা শোনা গেল নীতি আয়োগের আর এক অর্থনীতিবিদ সদস্যের মুখে! সোমবার তিনি জানান, আইএমএফ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছে, ২০২৫ সালে জাপানকে ছাড়িয়ে চতুর্থ স্থানে চলে যাওয়ার পথে ভারত। অর্থাৎ এখনও যায়নি। এজন্য বছরের শেষপর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে কি ‘হবে’ টা ‘হয়ে গেছে’ বলে অগ্রিম দাবি করেছেন সিইও? প্রশ্ন সহজ হলেও উত্তর জটিল।
অপারেশন সিন্দুর-এ সেনাবাহিনীর সাফল্যে উদ্ভাসিত দেশের সব মানুষেরই মোদি সরকারের অর্থনীতির শক্তিবৃদ্ধির এই সাফল্যে আনন্দে গা ভাসিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু গলায় যে কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে প্রচারে চাপা পড়ে যাওয়া আসল রহস্যটা। প্রচার হচ্ছে, জাপানকে প্রায় ফটো ফিনিশে পিছনে ফেলে ভারত এখন ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (৪ লক্ষ কোটি ডলার)-এর দেশ হতে চলেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হলেও ভারতের আগে রয়েছে শুধু আমেরিকা (৩০.৫১ ট্রিলিয়ন ডলার), চীন (১৯.২৩ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং জার্মানি (৪.৭৪ট্রিলিয়ন ডলার)। বোঝাই যাচ্ছে, জার্মানিকে টপকে যাওয়া স্রেফ যেন সময়ের অপেক্ষা। অর্থনীতিবিদদের কথায়, কোনও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নির্ধারিত হয় মূলত সেই দেশের মোট জিডিপি দেখে। ভারতের মোট জিডিপি বেশি হওয়ার কারণ দেশের বিপুল জনসংখ্যা। সুতরাং ভারতের পঞ্চম থেকে চতুর্থ বা চতুর্থ থেকে তৃতীয় হতে চলার মধ্যে নরেন্দ্র মোদি সরকারের কোনও হাতযশ নেই। আসল প্রশ্ন হল, বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ মানে সেই দেশের সাধারণ মানুষের গড় জীবনযাত্রার মান, মাথাপিছু আয় কেমন তার বিশ্লেষণ করা। এখানেই দেখা যাচ্ছে, অনেক কম জনসংখ্যার দেশও সাধারণ জীবনযাত্রার মানে এগিয়ে রয়েছে। ভারত তৃতীয় চতুর্থ যাই হোক, আসলে মধ্যআয়ের দেশ। এখানেই দেখা যাচ্ছে, ফানুসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মোদির ভারতের বেআব্রু অবস্থা! মোট জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু জিডিপি, অর্থাৎ সেই দেশের আপামর জনগণের গড় আর্থিক অবস্থার ছবিটা পাওয়া যায়। যেমন, আমেরিকার লোকসংখ্যা ৩৫ কোটি, কিন্তু মাথাপিছু আয় বা জিডিপি প্রায় ৭০ হাজার ডলার। চীনের লোকসংখ্যা ১৪০ কোটির কম হলেও মাথাপিছু আয় প্রায় ১২ হাজার ৬০০ ডলার। জার্মানির জনসংখ্যা ৪৩ কোটি, মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৪ হাজার ডলার। মাত্র ১৩ কোটির দেশ জাপানে মাথাপিছু আয় ৩৪ হাজার ডলার, ব্রিটেনের লোকসংখ্যা ৬৯ কোটি হলেও মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৫ হাজার ডলার। আর ভারতের লোকসংখ্যা ১৪০ কোটি ছাড়ালেও মাথাপিছু আয় মাত্র ২৫৭০ ডলার। এখানেই আসল সত্যটা লুকিয়ে।
এটাই আসল ভারত। এখানে বৈষম্যের কালো ছায়া সর্বত্র। তথ্য বলছে, দেশের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশের বেশি মালিক ১ শতাংশ ধনী। অথচ নীচের দিকের ৫০ শতাংশের হাতে রয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ সম্পদ! শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের আয় নিম্নআয়ের ৫০ শতাংশের তুলনায় ৭৫ গুণ বেশি! মাথাপিছু আয় বিশ্বের ১৯৪টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪৩। আর ২০২২-২৩ সালের মানব উন্নয়ন সূচকে ১৯১টি দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে ১৩২তম স্থানে। তবু চতুর্থ হতে চলার আনন্দে গা ভাসিয়ে দেওয়ার পর সব গোপন কথা গোপনে রাখতে পারছে না সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, ২০৪৭ সালে ‘বিকশিত ভারত’ বা উন্নত অর্থনীতির লক্ষ্যে পৌঁছবে এ দেশ। অবশ্য তখন প্রধানমন্ত্রী কোথায় কেমন থাকবেন তা জানা নেই। আর বিশ্বব্যাঙ্কের মাপকাঠি অনুযায়ী, বছরে মাথাপিছু আয় ১৪ হাজার ডলার হলে তবেই তাকে উন্নত অর্থনীতির দেশ বলা যায়। খোদ এ দেশের কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে, উন্নত অর্থনীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগামী প্রায় আড়াই দশক গড়ে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ হওয়ার প্রয়োজন। এবং তা করতে গেলে কলকারখানায় উৎপাদন ও নতুন লগ্নি বাড়াতে হবে। বাজারে কেনাকাটায় গতি আনতে হবে। এসবের কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি? ২০২৪-২৫-এর অর্থবছরে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশে পৌঁছাবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৯৬ শতাংশ নাকি কমে গিয়েছে। বিদেশি সংস্থাগুলি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অর্থনীতির এই বিবিধ পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, মোদি জমানায় নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য সেই তিমিরেই। শুধুই ‘আই ওয়াশে’র চেষ্টা হচ্ছে।