সায়নদীপ ঘোষ, কলকাতা: ঢাকে কাঠি পড়তে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের অপেক্ষা। তারপরেই দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে উঠবে বাঙালি। শহরজুড়ে থিমের লড়াই। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। যোধপুর পার্ক অঞ্চলের বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে দেখা গেল তারই খণ্ডচিত্র। চোখ থাকলে সত্যিই কি আমরা দেখতে পাই? চারদিকে এক মোহময় জগত যেন সবসময় আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অন্যদিকে প্রকৃত দৃষ্টিহীনরা এই সুন্দর জগৎকে দেখতেই পান না। চক্ষুদানের মাধ্যমে তাঁরা দৃষ্টি ফিরে পেতে পারেন। ৬৬তম বর্ষে সেই বার্তাই দিচ্ছে পল্লিমঙ্গল সমিতি (তালতলা)। এবারের বিষয় ‘তিন এ নেত্র’। সৃজনে মধুসূদন দাস ও রিন্টু কোনার। প্রতিমা নির্মাণে শিল্পী পূর্ণেন্দু দে ও সিদ্ধার্থ পাল। মণ্ডপে প্রবেশ করলে প্রথমে একটি বড় চশমা চোখে পড়বে। একটি নকল আবরণ। ঠিক যেন মায়াবী পৃথিবী। কিছুটা এগলেই পাঁচটি দরজা দেখা যাবে, যা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রতীক। তবে দৃষ্টির দরজাটি বন্ধ থাকছে। এরপরেই ভিডিও ও ইনস্টলেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিহীনদের কাহিনি ভেসে উঠবে চোখের সামনে। সবশেষে থাকবেন দেবী। তাঁর হাতেও চোখ। সেই তৃতীয় নেত্র অন্ধকার কাটিয়ে আলোর সন্ধান দেবে।
তালতলা থেকে কিছুটা গেলেই চোখে পড়বে একটি মন্দির। উপরে দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁর জটা থেকে মা গঙ্গার উৎপত্তি। গঙ্গা জল অত্যন্ত পবিত্র। তাই তা পবিত্র রাখার দায়িত্ব সকলের। একইসঙ্গে নিজেদের অন্তরাত্মাকেও গঙ্গা জলের মতো শুদ্ধ করতে হবে। ৭৪তম বছরে সেটাই বলছে যোধপুর পার্ক সর্বজনীন। এবারের থিম ‘আদি অনন্ত হর হর গঙ্গে’। ভাবনায় সুমি মজুমদার। প্রতিমা নির্মাণে পরিমল পাল। মণ্ডপের ভিতরে থাকছে বিভিন্ন ধরনের শিল্পসৃষ্টি। দেখলে মনে হবে, পুরোটাই মহাদেবের সৃষ্টি। সঙ্গে থাকছে আলো ও আবহ সঙ্গীতের সুনিপুণ প্রয়োগ। এভাবেই গঙ্গা ও পৃথিবীকে পরিষ্কার রাখার বার্তা দিচ্ছেন শিল্পীরা।
৯৫ পল্লির মণ্ডপে ঢুকতেই চোখে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের একটি মানচিত্র। কাছে গিয়ে দেখা গেল, মনীষীদের ছবি দিয়ে তা তৈরি হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, সত্যজিৎ রায় থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাংলা সত্যিই রত্নগর্ভা। ৭৬তম বছরে বাংলার সেই উজ্জ্বল ইতিহাসকে স্মরণ করছেন শিল্পী শক্তি শর্মা। এবারের ভাবনা ‘হে বঙ্গ ভাণ্ডারে’। গোটা মণ্ডপজুড়ে থাকছে অজস্র সিন্দুক। ভিতরে দোয়াত, তুলি। ইতিহাসে বারবার প্রতি মুহূর্তে এই রত্ন ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন বহু কৃতী বাঙালি। এটা তারই প্রতীক। লিথোগ্ৰাফি সহ বিভিন্ন শিল্পশৈলীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হবে বিশিষ্ট বাঙালিদের কাহিনি। বিভিন্ন আন্দোলনে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বাঙালি। তাই মণ্ডপের একাংশে থাকছে মশাল। থাকছে বিশিষ্ট বাঙালিদের ছবি দেওয়া কিছু ডাকটিকিট। মাতৃমূর্তিও সিন্দুক থেকেই বেরিয়ে আসছে। দেবী দুর্গা যে বাংলার এক উজ্জ্বল রত্ন। সামনে দাঁড়িয়ে দেবীর আরাধনা করছেন মানবরূপী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীরা। ঝাড়বাতির ক্ষেত্রেও থাকছে চমক। উপর থেকে ঝুলে থাকবে কয়েকটি সিন্দুক। ভিতরে কয়েকজন নারী। সঙ্গে কৃতী বাঙালিদের ছবি দেওয়া রত্ন। সব মিলিয়ে বাংলার গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী থাকবেন দর্শনার্থীরা।