


প্রিয়ব্রত দত্ত: পর্দায় ইতিহাসকে ইচ্ছে মতো চিত্রায়িত করার পরম্পরা বহুকালের। ‘কেশরী চ্যাপ্টার ২, দ্য আনটোলড স্টোরি’ এক্ষেত্রে কল্পনার ইচ্ছে পূরণের ইতিবৃত্ত। যার আধার রঘু পালট ও পুষ্প পালটের লেখা ফিকশন, ‘দ্য কেস দ্যাট শুক দ্য এম্পায়ার’। তবুও এই ছবি দেশাত্মবোধ, আবেগ ও অতিরঞ্জনের মোড়কে ভিন্ন গল্প বলে। অতিরঞ্জন এই কারণে, জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করার জন্য বিবাদী পক্ষের উকিল ‘স্যার’ চেট্টু শঙ্করণ নায়ারের ভূমিকায় অক্ষয় কুমারের আদালতে ‘এন্ট্রি’ যতটা নাটকীয়, প্রকৃত ইতিহাস ততটা নয়।
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরে ইংরেজ সেনানায়ক কর্নেল রেজিল্যান্ড এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ারের নির্দেশে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিনা প্ররোচনায় নির্বিচারে গুলি চালনায় মারা যান প্রায় ১৫০০-র অধিক মানুষ। বাদ যায়নি মহিলা-শিশুরাও। কলঙ্কিত এই অধ্যায়টিকে প্রাথমিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও পরবর্তীতে হান্টার কমিশন অন্তর্তদন্ত করে ডায়ায়ের নিন্দা করে। তবে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সুপারিশ করেনি। পরিচালক কারণ সিং ত্যাগী ডায়ারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। এই ধরনের ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ ছবির একাধিক অংশে রয়েছে, যা ত্যাগীর কল্পনাপ্রসূত।
তরুণী আইনজীবী দিলরিত গিলের ভূমিকায় অনন্যা পান্ডে ভালো কাজ করেছেন। অ্যাডভোকেট নেভিল ম্যাককিনলের ভূমিকায় মাধবনও চমৎকার। অক্ষয়-মাধবনের সেয়ানে সেয়ানে টক্কর উপভোগ্য। তুখোড় অভিনয় তিনজনেরই। তবুও নেগেটিভ অ্যাপিয়ারেন্সে মাধবন কখনও কখনও ছাপিয়ে গিয়েছেন নিজেকেও। অক্ষয় নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন। কিন্তু তাঁর স্টারডমকে ভাঙার সাহস দেখাননি পরিচালক। ফলে ‘শঙ্করণ’ হয়ে উঠলেন মেনস্ট্রিম কমার্শিয়াল হিরো। বরং খেলা দেখানোর সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন মাধবন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ভূমিকায় স্বল্প পরিসরে ছাপ রেখে দিলেন টলিউডের ছেলে সোহন বন্দ্যোপাধ্যায়।
দেবজিৎ রায়ের সিনেমাটোগ্রাফি সময়কে সঠিক আলোয় ও অবয়বে ধরতে পেরেছে বলেই ১০৬ বছরের পুরনো ক্ষতকে নতুন করে রক্তাক্ত করে তুলেছে দর্শক মনে। সেই যন্ত্রণা ও যাপনকে যথাযথ সঙ্গতে মর্মস্পর্শী করে তুলেছে শাশ্বত সচদেব, কবিতা শেঠ, কণিষ্ক শেঠের সঙ্গীত। ‘স্যার’ শঙ্করণ পরবর্তীতে নাইট উপাধি বর্জন করেছিলেন কি না, তা নিয়ে ইতিহাস নীরব। ত্যাগীও। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার প্রতিবাদে ‘স্যার’ উপাধি বর্জন করেছিলেন। সেটা অনুল্লেখই রয়ে গেল গোটা সিনেমায়। কারণ, একমাত্র শঙ্করণের মাতৃভূমি কেরালা ছাড়া গোটা ছবিটাকে পাঞ্জাবের বাইরে বার করেননি পরিচালক কারণ সিং ত্যাগী।