হারাধন চৌধুরী: দুনিয়াসুদ্ধ সবাই জানে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন একজন মার্কেন্টিলিস্ট। মার্কেন্টিলিজম তত্ত্ব শুধু নিজ দেশের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যেই মোক্ষলাভের শিক্ষা দেয়। বাণিজ্যে বাকি সব দেশকে দশ গোল দিয়ে নিজ দেশের সম্পদ এবং শক্তি বৃদ্ধিই এই তত্ত্বের নিহিত দর্শন। জিরো সাম গেম—অর্থাৎ আমার মুনাফা মানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের লোকসান—সোজা কথায় অন্যের ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে আমাকে লাভবান হতে হবে। বিদেশি শ্রমিকের অভিবাসন সংকোচনও এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। একসময় ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস এই নীতির চূড়ান্ত অনুশীলন করেছে। মার্কেন্টিলিজম যে সবক্ষেত্রে সুফলদায়ক হয় না, তার প্রমাণ স্পেন। এজন্য সে-দেশের বস্ত্রবয়ন শিল্পকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল, এমনকি মন্বন্তরও নেমে এসেছিল একটা সময়। বহুবছর বাদে, মার্কিন মুলুক এই অর্থনৈতিক জাতীয়বাদের চাষে মনোনিবেশ করেছে। দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রক্ষমতা হাসিল করতে ট্রাম্প আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’! ‘অবৈধ’ অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্প বরাবরই খড়্গহস্ত। দেশবাসীকে ট্রাম্প বোঝালেন, আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব থেকে অপরাধ, মাদকের উৎপাতসহ যাবতীয় খারাপ ব্যাপারের জন্য অবৈধ অভিবাসীরাই দায়ী। দেশশাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই ১০ লক্ষ ‘অবৈধ’ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খেদানোও ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি! সেইমতো পদক্ষেপ করতে তিনি ‘শনি-মঙ্গলবার’ দেখেননি। তার প্রাথমিক আঁচ ভারতীয় অভিবাসীদের গায়েও পড়েছে মারাত্মকভাবে।
ট্রাম্প সাহেব তাঁর প্রথম দফাতেও কম খেল দেখাননি। তিনি ২০১৭ সালে ৫৭০ জন, ২০১৮ সালে ৭৯০ জন এবং ২০১৯ সালের প্রথম ছ’মাসে ৫৫০ জন ভারতীয় নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া করেছিলেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে প্রতিবছর গড়ে ১,৫৫০ জন ভারতীয়কে খেদানো হয়েছিল। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, ২০২৪ সালে অবৈধ অভিবাসীর তালিকায় মেক্সিকান এবং সালভাদোরানদের পরেই ছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকজন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি একটি মার্কিন সামরিক বিমানে চাপিয়ে ১০৪ জন ভারতীয়কে ফেরত পাঠানো হয়। এতে বহিষ্কারের ভয় পেয়ে গিয়ে প্রবাসী কিছু ভারতীয় পড়ুয়া পার্টটাইম জব পর্যন্ত ছেড়ে দেন। গত আগস্টের হিসেব, ২০২৫-এর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১,৭০৩ জন ভারতীয়কে আমেরিকা ছাড়া করা হয়েছে। সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে গড়ে দৈনিক ৮। বাইডেন জমানায় সেটা ছিল ৩। অর্থাৎ দেশকল্যাণচিন্তায় ট্রাম্প জমানা পূর্বসূরিকে ছাপিয়ে গিয়েছে প্রায় তিনগুণ!
শুধু সংখ্যায় ছাপিয়ে যাওয়া নয়, যেভাবে হাতকড়া পরিয়ে ভারতীয়দের সামরিক বিমানে আনা হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। ব্যাপারটা একইসঙ্গে অমানবিক এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিরোধী। এই ভারতীয়দের কেউই অপরাধী নন, তাঁরা সাগরপারের দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন জীবিকার প্রয়োজনে। অর্থাৎ ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে আমেরিকা যে আচরণ করেছে এরপর অন্তত তাদের মুখে মানবাধিকারের বড়ো বড়ো বুলি সাজে না। ট্রাম্প সাহেবের জিগরি দোস্ত এবং স্বঘোষিত বিশ্বগুরুর চ্যালাদের কিল খেয়ে কিল হজমই করতে হয়েছিল। কিন্তু মুখ বুজে ছিলেন না অন্য ভারতীয়রা। আমেরিকার এই ‘বর্বরতা’র কঠোর সমালোচনাই করেছিলেন তাঁরা।
আর এই প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে সোনালি বিবির ঘটনাটি। দিল্লিতে অবস্থানকালে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ জুটেছিল ‘বাংলাদেশি’ বা ‘বিদেশি’ তকমা। গত ১৮ জুন তাঁকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। এরপরে ছোট্ট ছেলেসহ তাঁকে পুশ ব্যাক করা হয় ওপার বাংলায়। বিএসএফ বাংলাদেশে খেদানোর পর সেখানকার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ওই অন্তঃসত্ত্বা নারী। ফলে তাঁর ঠাঁই হয় জেলে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে পাঁচমাস পর গত ৬ ডিসেম্বর সোনালি বিবি তাঁর বীরভূমের বাড়িতে ফেরেন।
সোনালির মুখেই শোনা গিয়েছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়টির কথা। গত ২৬ জুন দিল্লি পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের দুটি পরিবারের মোট ছ’জনকে জোর করে অসমের ধুবড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছিল। অমিত শাহের পুলিশের দাবি ছিল, তাঁরা অবৈধভাবে ভারতে ঢুকে দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করছিলেন। কিন্তু মানুষগুলি তাঁদের ভারতীয় নাগরিক পরিচয়ের যাবতীয় নথিই দেখিয়েছিলেন পুলিশকে। তবুও তাঁদের রেহাই মেলেনি। এদিকে বাংলায় চলতি এসআইআর পর্বে দেখা গিয়েছে, মুরারই বিধানসভা আসনের ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় সোনালির মা-বাবার, এমনকি তাঁর দাদুরও নাম রয়েছে!
বীরভূমের পাইকর গ্রামের দানিশ শেখ এবং তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী সোনালি বিবি ও তাঁদের পাঁচবছরের ছেলে সাবির শেখকে ওপার বাংলায় খেদানো হয়। একই হাল করা হয় মুরারইয়ের ধীতোরা গ্রামের সুইটি বিবি ও তাঁর দুই সন্তানের। এর বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই সোচ্চার হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকার এবং পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ। এই মানুষগুলিকে ভারতে ফেরানোর দাবিতে মামলা হয় কলকাতা হাইকোর্টে। উচ্চ আদালত চার সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের দেশে ফেরাতে নির্দেশ দিয়েছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আদালতও (চাঁপাই নবাবগঞ্জ) মানুষগুলিকে ভারতীয় হিসেবে শনাক্ত করে। তখন ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশনকে তারা নির্দেশ দেয়, পরিবার দুটির সদস্যদের অবিলম্বে ভারতে ফেরাতে হবে। কিন্তু মোদি সরকার উলটে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানায়! ওই প্রেক্ষিতে ২৫ নভেম্বর ক্ষুব্ধ শীর্ষ আদালতও মোদিবাবুদের আপত্তি খারিজ করে দিয়ে বলে, ওই ছ’জনকেই ভারতে ফেরাতে হবে।
সোনালি দেশে ফেরার পরে শোনান তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মম কাহিনি। অসম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের জঙ্গলে গভীর রাতে তাঁদের ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর পরবর্তী দু’মাস শুধু পালিয়ে বেড়িয়েছেন তাঁরা। ধরা পড়ার ভয়ে নানাদিকে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করতেন। খিদের জ্বালা মেটাতে বাংলাদেশে ভিক্ষা করেছেন রোজ। তাও সবদিন দু’বেলা খাবার জুটত না। সোনালিরা ভারতেও ফেরার চেষ্টা করেছিলেন দু-একবার। কিন্তু ফেরার সুযোগ মেলা দূর, তার বদলে জুটেছিল বেধড়ক মার। শেষমেশ ২০ আগস্ট সোনালিরা ধরা পড়েন বাংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জ থানার পুলিশের হাতে। সেখান থেকে ঠাঁই হয় তাঁদের জেলে। এরপরই শুরু হয় আইনি লড়াই। সোনালিকে আইনি সহায়তা দিতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন তাঁদের প্রতিবেশী যুবক মফিজুল ইসলাম। পাশে ছিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল সাংসদ সামিরুল ইসলাম। বস্তুত বাংলা থেকে ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপেই মোদি সরকার সোনালি বিবিদের দেশে ফেরাতে বাধ্য হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ এবং বিএসএফের জোড়া অত্যাচারের স্মৃতি, দীর্ঘ টানাপোড়েন, মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার কথা সোনালি কোনও দিন ভুলতে পারবেন কি? খুব শীঘ্রই সোনালির সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। সে বড়ো হয়ে অবশ্যই শুনবে এই কাহিনি। এই দেশকে সে কতটা ভালোবাসতে পারবে? দেশের প্রতি যদি তার অশ্রদ্ধা জন্মায় তার পুরো দায় কি রাষ্ট্রের নয়? রাষ্ট্র তার নাগরিকের সঙ্গে যে অপরাধ করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। এই অপরাধ একটু লঘু হতে পারে, যদি সোনালির স্বামী দানিশ এবং অন্যদেরও দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা হয়। দিনগুলি নিশ্চয় এক ট্রমার মধ্যে দিয়েই কেটেছে সোনালিদের। তাই অত্যাচারিত প্রত্যেকের শারীরিক এবং মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবিবেচকের মতো যাকে তাকে বিদেশি ঠাওরাবার বাতিকও ছাড়ুক এইবেলা। না-হলে এই খ্যাপামির জন্য ভবিষ্যতে মারাত্মক মূল্য দিতে হতে পারে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইশ্যুতে আমরা এরপর অন্য দেশের বিরুদ্ধে তর্জনী তুলব কোন অধিকারে? বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান তো ভারতের এই ‘কীর্তি’ সামনে রেখেই আগামী দিনে বিস্তর সাফাই গাইবার সুযোগ নেবে।
ভারতে ‘ভারতবাসী’ কজন? একদল নাকি ‘পাকিস্তানের দালাল’ আর একদল ‘বাংলাদেশি’! অর্থাৎ সবাই ‘বিদেশি’! অপরদিকে, বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশপ্রেমী’ ক’জন? একদল নাকি ‘ভারতের দালাল’ আর একদল ‘রাজাকার (মানে পাকপ্রেমী)’! রাষ্ট্র যতক্ষণ না তার দেশের মানুষকে বিশ্বাস করবে, ভালোবাসবে, বাঁচার মতো বাঁচতে সাহায্য করবে, যাবতীয় নিরাপত্তা দেবে ততক্ষণ সে রাষ্ট্র উন্নতি করতে পারবে না। নিজের মানুষের পিছনে গোয়েন্দাগিরি করেই সময় এবং সম্পদ নষ্ট করছে। অথচ এই মানুষগুলিকে দিয়েই এবং এই অর্থ ও সম্পদেই রাষ্ট্রকে সুন্দরভাবে গড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেসব হচ্ছে কই! সব ঝামেলায় গিয়ে পড়ছে আদালতের ঘাড়ে। ক’জনের কতটুকু সময়, সুযোগ ও সামর্থ্য আছে এই হ্যাপা সামলাবার? ফলে দুর্যোগ দুর্ভোগই ভবিতব্য নিরীহ নির্দোষ নাগরিকের। ক্ষমতার মদে মত্ত লোকজন শুধু যন্ত্রণাই দিতে পারে, তাদের রঙিন ঝুলিতে এর অধিক কিছুই নেই। আসলে এই জিনিস চলতেই থাকবে। দু’দেশে কেউই বাস করতে পারবে না স্বস্তিতে। মাঝখান থেকে দই মেরে যাবে নেপোয়!