Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পেট্রলে ইথানল: সমস্যা নীতিতে নয়, চাপিয়ে দেওয়ায়

একমুখ দাড়ি-গোঁফ। টিভিতে মুখ দেখিয়ে ঘোষণা করছেন তিনি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে ছিল কোভিডকাল। সালটা ২০২১। এমনিতেই টিভির সামনে মোদিজি বসলে বুকের বাঁদিকে একটা কাঁপুনি লাগে।

পেট্রলে ইথানল: সমস্যা নীতিতে নয়, চাপিয়ে দেওয়ায়
  • ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: একমুখ দাড়ি-গোঁফ। টিভিতে মুখ দেখিয়ে ঘোষণা করছেন তিনি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে ছিল কোভিডকাল। সালটা ২০২১। এমনিতেই টিভির সামনে মোদিজি বসলে বুকের বাঁদিকে একটা কাঁপুনি লাগে। কী হতে চলেছে? নোটবাতিল? জিএসটি? লকডাউন? সেবার অবশ্য কাঁপুনিটা লাগেনি। পেটের কাছটা খালিও হয়ে যায়নি। কারণ, মোদিজি ঘোষণা করেছিলেন ই-২০ ইথানল পলিসির। সেটা কী? খায়, না মাথায় দেয়? সে ব্যাপারে আম জনতার খুব একটা ধারণা ছিল না। দু’বেলা দু’মুঠো পেটের ভাত যে দেশের ৮০ কোটি মানুষের জুটছে না, তাদের কাছে ইথানল আর ঢেঙ্কানলে খুব একটা ফারাক নেই। সাধারণ মানুষ শুনল মোদিজির ভাষণ, ‘ইথানল ভারতের পরিবহণের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে।’ পেট্রলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ইথানল মিশবে এবার থেকে। তার ফলে বাতাসে দূষণ কমবে। কারণ, ইথানল মিশ্রিত পেট্রল পুড়লে যে ধোঁয়া বেরবে, তাতে কার্বনের পরিমাণ কম থাকবে। অশোধিত জ্বালানি কম আমদানি করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তেলের দাম কমবে। এই একটি জায়গায় নড়েচড়ে বসেছিল ভারত। এই তো একটা কাজে লাগার মতো কথা। তেলের দাম কমলে মানুষের স্বস্তি। সঙ্গে জিনিসপত্রের দামও কমবে। কারণ পরিবহণ খরচে কাটছাঁট হবে। কোভিডের পর যখন গোটা দেশ মূল্যবৃদ্ধির জ্বালায় ধুঁকছে, চাকরি নেই, বেতন কেটে নেওয়া হচ্ছে... এমন অবস্থায় নোট বাতিল নয়, বাঁচানোর ফর্মুলায় স্বস্তি তো আসবেই। চার বছর হয়ে গিয়েছে সেই ঘোষণার। ২০২৫ সালে আমরা ই-২০ পলিসির কাঁধে চেপে ঠিক কোথায় পৌঁছেছি? পরপর সাজিয়ে ফেলা যাক। ১) এখন ভারতের ৯০ হাজারের বেশি পেট্রল পাম্পে ইথানল মিশ্রিত পেট্রল বিক্রি হয়। ২) ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর সমীকরণে আমরা টার্গেটের অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছি। ৩) এবার পেট্রলে ২৭ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্যে ছুটে চলেছি। ৪) পেট্রলের দাম কমেনি। ৫) পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গাদকারির দুই পুত্রের সংস্থা ফুলেফেঁপে উঠেছে। 

Advertisement

এই হল নির্যাস। সবচেয়ে বড় কথা হল, তেলের দাম কমেনি। অথচ, তেমনটা হওয়ার কথা ছিল। নীতিন গাদকারি দাবি করেছিলেন, কাঠের বর্জ্য, আবর্জনা ফিল্টার করে পাওয়া জিনিসপত্র, খাদ্যশস্যের বর্জ্য থেকে ইথানল তৈরি হবে। আর তাতেই পেট্রলের দাম ৫০-৫৫ টাকায় নেমে আসবে। আমরা কিন্তু এখনও ১০৫ টাকার আশপাশের দরে পেট্রল কিনছি। কেন? গত অর্থবর্ষে ভারত ১ লক্ষ ১৪ হাজার কোটি টাকার অশোধিত তেল আমদানি করেছিল। প্রতি বছরই অঙ্কটা ১ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছিই থাকে। কখনও-সখনও সেটা ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটিতেও পৌঁছে যায়। ২০ শতাংশ ইথানল যদি পেট্রলে মেশে, তাহলে সহজ পাটিগণিতের হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়া উচিত! ধরে নেওয়া যাক, ততটা হল না। তাহলেও ৫ হাজার কোটি টাকা তো বাঁচবে! সেই সাশ্রয়ের সুরাহা তাহলে কোথায় গেল? কার পকেটে? মোদিজি তো দাবি করেছিলেন, কৃষকদের আয় বাড়বে। ১০ বছর ধরে জ্বালানির সঙ্গে ইথানল মিশ্রণ শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রথমে ই-১০, অর্থাৎ প্রতি ৯০ লিটার পেট্রলের সঙ্গে ১০ লিটার ইথানল মিক্স। আর এখন ই-২০। মানে, ৮০ লিটার পেট্রলে ২০ লিটার ইথানল। যাঁরা আখ বা ভুট্টার চাষ করে থাকেন, তাঁদের উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে ঠিক। সেটা খবরে আসার মতো নয়। তাঁরা কিন্তু ফলানো ফসলের সিংহভাগই পৌঁছে দিয়েছেন ইথানল প্লান্টে। তার জেরে ঘাটতি হয়েছে ফসলে। ২০২৩ সালে ৫০ লক্ষ টন ভুট্টার ঘাটতি হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছে যে, ভারতকে বিদেশ থেকে ভুট্টা আমদানিও করতে হয়েছে। ই-২৭ বা ই-৩০ পেট্রলে ভারত ঝুঁকলে এই ঘাটতি আরও বাড়বে। কারণ, প্রতিশ্রুতি মতো বর্জ্য থেকে ইথানল এখনও তৈরি হয় না। সেই প্রযুক্তিগত কাঠামোই বানানো হয়নি। তাই সবটাই খাদ্যশস্যের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ একদিকে তেলের দাম তো কমেইনি, উল্টে মাথাচাড়া দিয়েছে শস্য সংকট। এই ব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে ইথানল মিশ্রিত পেট্রল। তাহলে লাভের গুড় কে খেয়েছে? কংগ্রেসের অভিযোগ, পুরোটাই মন্ত্রী নীতিন গাদকারির দুই ছেলের সংস্থা। একটি সায়ান অ্যাগ্রো, নিখিল গাদকারির সংস্থা। এবং মানস অ্যাগ্রো, যার ডিরেক্টর সারঙ্গ গাদকারি। কংগ্রেসের সাফ অভিযোগ ছিল, আখ থেকে তৈরি ইথানলকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কারণই হল নিখিল ও সারঙ্গ গাদকারি। ২০২৪ সালের জুন মাসে সায়ান অ্যাগ্রোর মুনাফা ছিল মাত্র ১৮ কোটি টাকার। আর চলতি বছরের জুন মাসে? ৫২৩ কোটি। শেয়ারের দর গত ছ’মাসে ৩৭ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৩৮ টাকা। এখানেই শেষ নয়, নাম জড়িয়েছে গাদকারির পূর্তি গ্রুপেরও। সংঘ ঘনিষ্ঠ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিজে অবশ্য বলছেন, গোটাটাই পেইড ক্যাম্পেন। টাকা খেয়ে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়া হচ্ছে। কিছু লোক দেশের উন্নতি দেখতে পারে না। তাই...।
বায়ো ফুয়েল পলিসি পরিবেশের জন্য ভালো। যুগোপযোগী। এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ভারত যে এই নীতিতে চলা শুরু করেছে, সেটাও সাধুবাদযোগ্য। বুঝতে হবে, সমস্যা কিন্তু নীতি নিয়ে নয়। তার প্রয়োগ নিয়ে। ব্রাজিল এখন ইথানল মিশ্রিত জ্বালানিতে বিশ্বের এক নম্বর। এই প্রক্রিয়া কিন্তু তারা শুরু করেছিল সাতের দশকের শেষদিকে। ই-১০ থেকে ই-৩০ নীতিতে পৌঁছতে তারা চার দশক সময় নিয়েছে। একই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, ব্রিটেন, এমনকী থাইল্যান্ডও। তার কারণ কী? গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে সময় দেওয়া... যাতে তারা জ্বালানির সঙ্গে গাড়ির ইঞ্জিনকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। যেমন এই মুহূর্তে ২০২৩ সালের আগে প্রস্তুত অধিকাংশ গাড়িই কিন্তু ১০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো করে তৈরি। দ্রুত ই-২০ নীতিতে সরকার চলে যাওয়ায় তাদের এখন টালমাটাল অবস্থা। ইঞ্জিনের কিছু পার্টস ই-২০ জ্বালানির মতো সাপোর্ট দিয়ে বাকি পুরনো মডেলই রাখছে বেশিরভাগ কোম্পানি। আর তাতে ভুগছে আম আদমি। তেলের দাম বেড়েই রয়েছে। কিন্তু গাড়ির মাইলেজ বা ফুয়েল সার্ভিস কমে যাচ্ছে। ই-২০ পেট্রল ব্যবহার করে পুরনো মডেলের গাড়ির তেল সার্ভিস কমে গিয়েছে ৬-৮ শতাংশ পর্যন্ত। মোটরসাইকেলে ৩-৪ শতাংশ। ই-১০ কমপ্যাটিবল ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম। ১ থেকে ২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় কথা, এই তথ্যের সত্যতা স্বীকার করছে পেট্রলিয়াম মন্ত্রক এবং নীতি আয়োগও। কারণ, সাধারণ পেট্রল পুড়িয়ে গাড়ির ইঞ্জিন তৈরি করে ৩২ মেগা জুল শক্তি। এক লিটার ইথানলে সেটাই নেমে আসে ২১.১ মেগা জুলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই একই দূরত্ব যেতে ইথানল মিশ্রিত পেট্রল বেশি খরচ হবে। গড়পড়তা হিসেবে একটি গাড়ির হাজার কিমি যেতে পাঁচ লিটারের মতো পেট্রল বাড়তি লাগবে। মানে প্রায় ৫২৭ টাকা বাড়তি। সেই খরচটা কে দেবে? আপনি এবং আমি। সরকার নয়। কারণ, পেট্রলের দাম কমছে না। আমেরিকায় কিন্তু ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির দাম সাধারণের থেকে এক ডলারের মতো কম। ব্রাজিলে আপনি চাইলে ই-১০, ই-৩০ বা সাধারণ পেট্রল—যে কোনও জ্বালানি গাড়িতে ভরতে পারেন। নীতিগত মুন্সিয়ানায় সব গাড়ি সেভাবেই পথে নামে লাতিন আমেরিকার ওই দেশে। বায়ো ফুয়েল পলিসিতে এগিয়ে যাওয়া অন্য দেশগুলিও এই সমীকরণ মেনে চলে। ব্যতিক্রম ভারত। এখানে গ্রাহকের উপর জ্বালানি চাপিয়ে দেওয়া হয়। নীতি প্রণয়ন হয় দাম কমানোর আশ্বাসে। তারপর মুনাফা ভাগ হয় বাছাই করা এক শ্রেণির মধ্যে। হাতড়ে বেড়ায় মধ্যবিত্ত, আয়করদাতারা। গাড়ির মাইলেজ কমে যায়, ইঞ্জিন ঝাঁকুনি দেয় (নকিং), আর দিশাহারা অবস্থায় তারা ছোটে সার্ভিস সেন্টারে। সেখানেও জানিয়ে দেওয়া হয়, এর থেকে বেশি মাইলেজ পাবেন না। মাঝখান থেকে বদলাতে হয় ইঞ্জিনের পাম্প, ইনজেক্টর, কিংবা রাবার পাইপ। কারণ, ইথানল বাতাসে ভাসমান জলকণা টানে, যা জং পড়ার জন্য যথেষ্ট। ইঞ্জিনের এই তিনটি পার্টস ইথানলের কথা মাথায় রেখে মডিফাই না করলে, পালটাতে হবেই। তাই ই-২০ পলিসি পুরোদমে কার্যকর করার আগে প্রয়োজন টেকসই ইনজেক্টর, ইথানল প্রুফ রাবার পাইপ এবং জং না ধরে, এমন পাম্প। নীতি আয়োগই কিন্তু জানিয়েছিল, পেট্রলে ইথানলের পরিমাণ বাড়ানোর আগে গাড়ি তৈরির কোম্পানিগুলিকে অন্তত চার বছর সময় দেওয়া উচিত। এখনও পুরনো গাড়িতে সেই মডিফিকেশন সম্ভব। তবে তার জন্য ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ। এটা মারুতির গাড়ির ক্ষেত্রে। দামি, বিলাসবহুল গাড়িতে অঙ্কটা বাড়বে।
সমস্যা যে রয়েছে, তার প্রমাণ বিমা কোম্পানিগুলির চুক্তিপত্রেই (যা আমরা অধিকাংশই পড়ে দেখি না)। কয়েকটি সংস্থা যেমন লিখে দিচ্ছে, ‘ভুল জ্বালানি’ ব্যবহারের জন্য যদি ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়, তার খরচ ইনস্যুরেন্সে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, পুরো টাকাটা যাবে গ্রাহকের পকেট থেকে। ‘ভুল জ্বালানি’ বলতে? ইঞ্জিনের সঙ্গে কমপ্যাটিবল নয়, এমন ইথানল মিশ্রিত পেট্রল। তার মানে কি পুরোটাই ধাপ্পা? দুর্নীতি?
না। তা নয়। পরিবেশ বান্ধব জ্বালানির সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আখ থেকে যে ইথানল উৎপাদন হয়, তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হলে ৬৫ শতাংশ কার্বন কম নিঃসরণ হয়। ভুট্টার ক্ষেত্রে অঙ্কটা ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। তাহলে গলদটা কোথায়? স্রেফ প্রয়োগে। অপরিণত প্রয়োগে। ঠিক যেমন হয়েছিল নোট বাতিল, জিএসটি, বা লকডাউনের ক্ষেত্রে। মানুষকে তৈরি হওয়ার সময়ই দেওয়া হয়নি। চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানেও সেটাই হচ্ছে। সরকারের কীসের এত তাড়া? এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। কোটি টাকারও হতে পারে। আর হ্যাঁ, একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। আখ থেকে এক লিটার ইথানল তৈরিতে প্রয়োজন হয় ৩ হাজার ৬৩০ লিটার জল। ভুট্টায় ৪ হাজার ৬৭০ লিটার। পুরোপুরি ই-২০ নীতিতে গেলে আমাদের কী পরিমাণ ইথানল প্রস্তুত করতে হবে? হাজার কোটি লিটার। তখন তার জন্য জল কতটা খরচ হবে? প্রায় ৪০ লক্ষ কোটি লিটার। কর্ণাটক, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে যেখানে জলের সংকট, সেখানে কি এই বিলাসিতা আমাদের সাজে? গাদকারি অবশ্য বলেছেন, কোথাও জলের সংকট নেই। বিতর্ক চলবে। কতদিন? যতদিন না ভারত সেকেন্ড জেনারেশন ইথানলে যেতে পারছে। সেটা কী? খাদ্যশস্য নয়, পুরোটাই তখন তৈরি হবে শস্যের বর্জ্য থেকে। সেক্ষেত্রে খাদ্য সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না, পাশাপাশি পেট্রলের দামও কমবে বলে আশা করা যায়। প্রশ্ন হল, সায়ান অ্যাগ্রোর মতো সংস্থা এই প্রযুক্তির জন্য তৈরি তো?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ