মৃণালকান্তি দাস: পাকিস্তানের করাচি বন্দরে যেদিন পৌঁছেছিল তুরস্কের যুদ্ধজাহাজ ‘টিসিজি বুয়ুকদা’, সেদিনই ভারত চিনে নিয়েছিল এক ‘গদ্দার’ রাষ্ট্রকে। খবর এসেছিল, আঙ্কারার নির্দেশে ততক্ষণে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছ’টি সি-১৩০ হারকিউলিস সামরিক পরিবহণ বিমান অবতরণ করেছে ইসলামাবাদে। ভারত-পাকিস্তান ‘যুদ্ধে’ খোলাখুলিভাবে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক।
অথচ, তুরস্কের দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারতই। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারাত্মক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল দক্ষিণ ও মধ্য তুরস্কের বিস্তীর্ণ এলাকা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.৮। কম্পনের জেরে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশটির একাধিক শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ওই সময় সেখানে উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছিল ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে চলা ওই মানবিক সাহায্যের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন দোস্ত’। ভারত থেকে তুরস্কে গিয়েছিল উদ্ধারকারী দল, ওষুধ এবং ত্রাণসামগ্রী। এরও আগে ১৯৯৯ সালে তুরস্কে আরও একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সেবারও বন্ধুর মতোই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ভারত। আবার করোনার ভয়াবহ দাপটের সময় তুরস্ককে ১০০ মিলিয়ন ডলারও দিয়েছিল ভারত। ভ্যাকসিন থেকে পিপিই কিট— অতিমারীর মোকাবিলায় প্রকৃত বন্ধুর কাজই করেছিল নয়াদিল্লি। এরপরও ভারতের সঙ্গে এহেন বিশ্বাসঘাতকতায় মুখোশ খুলে গিয়েছে ‘উগ্র ইসলামপন্থী’ প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোগানের।
ইতিহাস বলছে, তুরস্ক-পাকিস্তান সম্পর্ক শীতল যুদ্ধের সময় থেকে শুরু, যখন উভয় দেশই সেন্টোর মতো পশ্চিমী নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ ছিল। এই প্রাথমিক জোট সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করেছিল। ১৯৬৪ এবং ১৯৭১ সালে সাইপ্রাস সংঘাতের মতো সংকটের সময় পাকিস্তান তুরস্ককে সমর্থন করেছিল এবং তুরস্কও ভারতের সঙ্গে যে কোনও বিরোধে পাকিস্তানকে সমর্থন করে প্রতিদান দিয়েছে। মনে রাখবেন, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে তুরস্ক পাকিস্তানকেই সমর্থন করেছিল। আজও বদলায়নি সেই অবস্থান। কেন? পাক সেনাবাহিনী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আয়েশা সিদ্দিকা সংবাদপত্র ‘ডন’-এ লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতি এরদোগানের সমর্থন কৌশলগত এবং আদর্শগত।’ একই কথা বলেছেন, ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিক তালমিজ আহমেদ। সংবাদসংস্থা বিবিসিকে তালমিজ বলেছেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের মতাদর্শগত মিত্রতা রয়েছে। এরদোগান পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর পুরনো বন্ধুত্ব ঝালাই করছেন। মনে রাখবেন, গোটা দুনিয়ায় এরদোগান নিজেকে একজন ইসলামিস্ট নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন। এরদোয়ান তুরস্কের ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।’ ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিক নভোদীপ সুরির কথায়, ‘পাকিস্তানের সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের গোটা বাজারও দখলে নিতে চাইছে তুরস্ক।’
আর সেই কারণেই, ভারতের সঙ্গে সংঘাতের আবহে পাকিস্তানকে বাঁচাতে দু’রকম ড্রোন পাক সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল তুরস্ক। সেগুলি হল, অ্যাসিসগার্ডের সোঙ্গার এবং প্রেসিডেন্ট এরদোগানের জামাইয়ের সংস্থার বায়রাক্তার-টিবি ২। এর মধ্যে প্রথমটি নজরদারিতে সক্ষম এবং ‘সোয়ার্ম’ ক্যাটাগরির। সংঘাতের ঠিক মুখে ইসলামাবাদ হাতে পেয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০টি তুর্কি সোঙ্গার। এই দুই মানববিহীন যানের সাহায্যে মোট ৩৬টি জায়গাকে নিশানা করেছিল পাক সেনা। তবে ইসলামাবাদের ড্রোন হামলার পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে দেয় ভারতীয় বাহিনী। ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’কে (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) কাজে লাগিয়ে সেগুলিকে মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ভারত থেকে ফি বছর অ্যালুমিনিয়াম পণ্য, গাড়ি নির্মাণ, টেলিকম ও বিমানের যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম আমদানি করে তুরস্ক। এ ছাড়াও ভারত থেকে রপ্তানি হয় ব্যাটারি, রিসিভার, ভিডিও ট্রান্সমিটার এবং অ্যান্টেনা। অত্যাধুনিক ফৌজি ড্রোন তৈরিতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। সেগুলি হল, ইলেকট্রনিক স্পিড কন্ট্রোল, ফ্লাইট কন্ট্রোল মডিউল, ক্যামেরা, প্রপেলার, মোটর, ফ্রেম এবং কন্ট্রোলার। এই সরঞ্জামগুলিও বিপুল পরিমাণে ভারত থেকে আমদানি করে তুরস্ক। এসবই ড্রোন উৎপাদনের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহারের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
তুরস্কের বিরুদ্ধে সন্দেহ দানা বেঁধেছে আরও একটি কারণে— ২০২১ সালে ভারতে লগ্নি করে তুরস্কের ড্রোন নির্মাণকারী সংস্থা জাইরন ডায়ানামিক্স। কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যেই নয়াদিল্লিকে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত রপ্তানির উপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করে আঙ্কারা। পাশাপাশি, ওই সময় থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ২০২১ সালে যৌথ অস্ত্র উৎপাদন চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে চীনের পর তুরস্ক এখন পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী। ২০২৩ সালে ডনের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ১.৫ বিলিয়ন ডলারের ড্রোন চুক্তি করেছে পাক-তুরস্ক। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে তুরস্কের অস্ত্র রপ্তানির মূল্য ৫.১৬ মিলিয়ন ডলার। অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে, মিলজেম-শ্রেণির স্টিলথ কর্ভেট এবং এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন জেট থেকে শুরু করে বায়রাক্তার-টিবি ২ ড্রোন এবং কেমানকেজ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। তুরস্ক থেকে উন্নত প্রযুক্তির বায়রাক্তার ড্রোন কিনতে চেয়েছিল ভারতও। কিন্তু ভারতে ড্রোনের জোগান দিতে সরাসরি ‘না’ করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আমেরিকা এবং ন্যাটোকে সন্তুষ্ট রাখতে সেই একই ড্রোন তুরস্ক থেকে ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছিল। যা রুশ বাহিনীকে ঘায়েল করতে কাজে লেগেছিল। বুঝতে অসুবিধে হয় না, এরদোগান আসলে কী চান!
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এরদোগানের এই পাকিস্তান-প্রেমের নেপথ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পোড়খাওয়া কূটনীতিক তালমিজ আহমেদ মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল, এখন ধর্মের ভিত্তিতে সেটি দৃঢ় করার চেষ্টা চলছে। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি বিশ্বের মাতব্বর হতে চাইছে, যা সৌদি আরবের বাধার মুখে সম্ভব হয়নি। একসময় তুরস্ক থেকেই গোটা আরব দুনিয়াকে শাসন করতেন ইসলামীয় ধর্মগুরু ‘খলিফা’। ইতিহাসের পাতায় ধূসর হয়ে যাওয়া তুরস্কের সেই প্রতাপ ফিরিয়ে আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন সেখানকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ইতিমধ্যেই তুরস্ককে ইসলামীয় শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করেছেন তিনি।
তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক ছিলেন সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী নেতা। ক্ষমতায় বসেই এরদোগান তুরস্কের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মীয় শিক্ষার অন্ধকূপে ডুবিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। বছর ছয়েক আগে, এরদোগান যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর ইচ্ছে দেশের নতুন প্রজন্ম ধার্মিক হয়ে উঠুক! কেউ যেন আশা না করে যে একটা রক্ষণশীল ও গণতান্ত্রিক দল যুবসম্প্রদায়কে নাস্তিক হতে মদত দেবে। এরদোগানের ধর্মীয় স্কুলের নতুন নামকরণ হয়েছে— ইমাম হাতিপ স্কুল। ১৫ বছর আগের ৪৫০টা থেকে বেড়ে এখন ৪৫০০টা ধর্মীয় স্কুল হয়েছে। যদিও ইস্তানবুলের ইউরোপের দিকের জেলা বেসক্যাটাস-এর মা-বাবারা সন্তানদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা চালু রাখার দাবিতে পথে নেমেছেন। কিন্তু সে দাবিতে কে-ই বা কান দেয়! নিজের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে নরেন্দ্র মোদি যেভাবে প্রাচীন ‘হিন্দু’ ভারতের ঐতিহ্যের গল্প শোনান, ট্রাম্প শোনান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এর কল্পকাহিনি, সেভাবেই এরদোগান অটোমান সাম্রাজ্যের উচ্চ প্রশংসা করেন। এবং জনতার মনে এই বিশ্বাস তুলে ধরেন যে, তাঁর শাসনে তুরস্ক ও তার মুসলিম সমাজ আবার মহান হয়ে উঠবে। ভোগ করবে অটোমান সাম্রাজ্যের গৌরব। পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, কাতারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইসলামিক দুনিয়ায় নেতৃত্ব সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির থেকে ছিনিয়ে নিতে চান এরদোগান। নিজে স্বপ্ন দেখেন অটোমান সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার।
তুরস্ক এটাও জানে, মধ্যপ্রাচ্য এবং গালফ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ইজরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরানের। এসব দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যথেষ্ট উষ্ণ। তাই বিকল্প পথে এগতে চায় তুরস্ক। সৌদি আরব ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ওআইসিকে নিয়ন্ত্রণ করে, এর বিপরীতে একটি সংগঠন করতে চেয়েছিলেন এরদোগান। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া, ইরান এবং পাকিস্তানকে নিয়ে একটি জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় পাকিস্তানকে আটকে দেয় সৌদি আরব। পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে অতীতে বেশ কয়েকবার সাহায্য করেছে সৌদি আরব। তুরস্ক সৌদি আরবের মতো কখনওই সেভাবে এগিয়ে আসেনি।
কিন্তু পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরস্পরকে সমর্থন দিয়ে আসছে দুই মৌলবাদী দেশ— তুরস্ক ও পাকিস্তান। যেমন ধরুন, আজারবাইজান-আর্মেনিয়া ইস্যুতে। ২০২০ সালে নাগোর্নো-কারাবাখের দখলকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মধ্য এশিয়ার দুই দেশ, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। এই যুদ্ধে আজারবাইজানের পাশে ছিল তুরস্ক ও পাকিস্তান। আঙ্কারার পাঠানো বায়রাক্তার-টিবি ২ ড্রোনের আঘাত সহ্য করতে পারেনি আর্মেনীয় ফৌজ। ফলে ‘বিতর্কিত’ এলাকা নাগোর্নো-কারাবাখের বেশ কিছুটা অংশ হারাতে হয় তাদের। পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ যে আর্মেনিয়াকে এখনও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়নি। আজারবাইজান বিতর্কিত অঞ্চল নাগার্নো-কারাবাখের কর্তৃত্ব দাবি করে এবং তুরস্ক সেই দাবি সমর্থন করে। পাকিস্তানের অবস্থানও একই। আর তার প্রত্যুত্তরে এরদোগান কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে সমর্থন করে ধর্মীয় উন্মাদনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক অতীতে একাধিকবার রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশনে এরদোগানের মুখে ভারতের সমালোচনা শোনা গিয়েছে। পাক অধিকৃত কাশ্মীর সম্পর্কে ভারতের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন তিনি। এমনকী তুরস্কের সামরিক বাহিনী ‘সাদাত’কে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে মোতায়েন করার কথাও বলেছেন। কে না জানে, এই ‘সাদাত’-এর সঙ্গে পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। এরদোগান যে ভারতের শুধু ক্ষতিই চান এখন তা আরও স্পষ্ট।
একনায়ক, স্বৈরাচারী, মৌলবাদী রাষ্ট্রনেতা এরদোগানের পতন ঘটবে ইতিহাসের নিয়ম
মেনেই। ইতিহাস তাঁকে ধিক্কার জানাবে, এই ক্লান্ত বিশ্বে ইসলামিক উগ্রবাদকে নতুন করে ইন্ধন জোগানোর জন্য!