বাংলার প্রতি বঞ্চনার দিকটি ফের সোমবার বিধানসভায় উত্থাপন করেন পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার। তিনি তথ্যসহ তুলে ধরেন মনরেগা (বছরে ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা) প্রকল্পে বাংলার প্রতি ধারাবাহিক কেন্দ্রীয় বঞ্চনার নির্মম সত্যটি। এরপরই সুর সপ্তমে চড়ান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে বাংলার বরাদ্দ বছরের পর বছর কেন্দ্র আটকে রেখেছে। এমনকী, বাংলার হকের টাকা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্য রাজ্যকে।’ উত্তরপ্রদেশ এবং গুজরাতে এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সংগত প্রশ্ন তোলেন, ‘কিন্তু তার দরুন ওইসব জায়গায় ক’টি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়েছে?’ ব্যাপক অনিয়ম করেও একাধিক ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্য নিয়মিত মনরেগার টাকা পাচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া গুচ্ছের শর্ত মেনে এবং দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের পরও বাংলা ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনার শিকার। মোট ১৫৬টি কেন্দ্রীয় দল মিলে এখানে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি খুঁজে পায়নি, উল্টে ক্লিনচিট দিয়ে গিয়েছে। তারপরও ২০২২-২৫ পর্যন্ত এই খাতে বাংলাকে ৩৮ হাজার কোটি টাকার বঞ্চনা করা হয়েছে।
স্বভাবতই আবার তোপ দাগতে হল মমতাকে। তাঁর সাফ বক্তব্য, মনরেগার ৩৮ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে মোদি সরকার। এই খাতে ২০২২ সালের আগের ৬,৯১৯ কোটি টাকাও তারা দেয়নি। তার মধ্যে জবকার্ড হোল্ডারদের মজুরি ছিল ৩,৭৩১ কোটি টাকা। গরিবের সেই টাকা পরে রাজ্যই মিটিয়েছে। ওইসঙ্গে মনরেগার বরাদ্দ না-থাকায় মমতার সরকার বিকল্প হিসেবে চালু করে ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্প। আবাস এবং সড়ক যোজনায় বাংলার সঙ্গে ধারাবাহিক বঞ্চনা নিয়েও এদিন কেন্দ্রকে একহাত নেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রসঙ্গত, কেন্দ্রের সাম্প্রতিক রিপোর্টে প্রকাশ, শুধুমাত্র মহারাষ্ট্র, বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং তামিলনাডুতে এই খাতে ১৪২ কোটিরও বেশি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। অথচ, ওই রাজ্যগুলির টিকিও ছোঁয়নি দিল্লি, উল্টে তাদেরকেই বাড়তি অর্থ বরাদ্দ করেছে। বাংলার প্রাপ্য টাকাই তাদের পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। হিসেবটা পরিষ্কার, বিহার এবং তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচন অদূরেই। আর গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশ হল বিজেপির ‘নিজের রাজ্য’। তাই বাংলার ‘সর্বনাশ’ দিয়ে ওই রাজ্যগুলিতে ‘পৌষমাস’ উপহার দেওয়া হয়েছে! উল্লেখ্য, ২০১৬ পরবর্তী ছ’বছরে রাজ্যের জন্য মনরেগায় বরাদ্দ করা হয়েছিল ৫০ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকার কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। জানামাত্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। তারপরও বাংলার প্রাপ্য বরাদ্দ মেটানো হয়নি।
বাংলার প্রতি কেন্দ্রের এই নিন্দনীয় ভূমিকা মানা যায় না। একটি নির্বাচিত ও সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজ্য সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির এই আচরণ একাধারে বিমাতৃসুলভ, অগণতান্ত্রিক এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। কেন্দ্রীয় শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক মনোবৃত্তির শিকার বাংলা অতীতেও বারবার হয়েছে। এজন্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গরিব মানুষ এবং উন্নয়ন। এই প্রশ্নে ইন্দিরা-শাহির দিকে আঙুল উঠেছে সবচেয়ে বেশি। এই নীতির নেপথ্যে কাজ করে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সরকারকে বেকায়দায় ফেলা। উন্নয়ন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের আয়ের উপর তার প্রত্যক্ষ বিরূপ প্রভাব পড়ে। সবদিক থেকে মানুষের কষ্ট বাড়ে। অনাবশ্যক কষ্টের জন্য স্থানীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারকেই প্রথমে দায়ী করা হবে। এমন দুর্দশা কেন নেমে আসে, রাজনীতির সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ সবার মাথায় ঢুকবে না এবং তাতে তাদের সুরাহাও তো কিছু নেই। ফলে রাজ্য সরকার এবং রাজ্যের শাসক দলই তখন সহজে জনগণের বিরাগভাজন হয়ে উঠতে পারে। এবংবিধ রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার অনুশীলন থেকে ভোটে বাড়তি সুবিধালাভের মতলব কষে কেন্দ্র। সেই ট্রাডিশন থেকে একটুও বেরিয়ে আসেনি মোদিবাবুদের ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’ এবং ‘সর্বকালের সেরা’ সরকার। বরং হলফ করে বলা যায়, বিরোধী রাজ্যের সঙ্গে বৈরিতা বৃদ্ধিসহ সবধরনের সঙ্কীর্ণতার খেলায় পদ্মপার্টি এবং মোদি সরকারই ‘চ্যাম্পিয়ন’—সর্বকালের সেরা। এমন চ্যাম্পিয়নশিপে জয়-পরাজয় নিয়ে তাদের কী স্বপ্ন এবং প্ল্যান আছে, তা জেনে বঙ্গবাসীর কোনও লাভ নেই। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনুসারে বাংলা তার যাবতীয় অধিকার এবং প্রাপ্য বুঝে নিতে চায়। কোনও দুটি রঙের সরকারের লড়াই নয় এটি। এ বাংলার রুটিরুজি এবং মর্যাদার প্রশ্ন। মোদি সরকারকে এটা পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে। না-হলে বাংলার সব ক্ষেত্র থেকে তাদের চিরবিদায়ের রাস্তাই পরিষ্কার করে দেবে বাংলার মানুষ নির্দয় হাতে। আজকের বাংলার জন্য এও এক ‘স্বাধীনতার লড়াই’। স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে চাপিয়ে দেওয়া এই স্বাধীনতার যুদ্ধে জিততে বাংলার মানুষ ভোটযন্ত্রেই ভরসা রাখবে। এমন আরও একটি দিন কিন্তু ক্রমে নিকটে আসছে।