Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অর্থনৈতিক পরাধীনতা

দেশের মাত্র ৩০০টি পরিবারের হাতে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ কুক্ষিগত। ভারতীয় মুদ্রায় ১৪০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। অঙ্কটি ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ।

অর্থনৈতিক পরাধীনতা
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশের মাত্র ৩০০টি পরিবারের হাতে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ কুক্ষিগত। ভারতীয় মুদ্রায় ১৪০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। অঙ্কটি ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ। বারক্লেজের সহযোগিতায় এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে হুরুন ইন্ডিয়া। তবে এ কোনও বিস্ময়কর খবর নয়, একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা অতীতেও ভারতের এই কদর্য চেহারা নানা আঙ্গিকে তুলে ধরেছে। তবে সবচেয়ে খাঁটি কথাটি হল, ভারতের অর্থনীতির এই হতকুৎসিত চেহারা সম্পর্কে আম আদমি সম্যক অবগত। তাঁদের বারোমাস্যা থেকেই তাঁরা ব্যাপারটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। এই জিনিস বোঝার জন্য কোনও বিশেষজ্ঞ বা তাত্ত্বিকের ‘আবিষ্কার’-এর উপর নজর করার দরকার তাদের পড়ে না। 

Advertisement

অর্থনীতিবিদরা চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করেন। ভারী ভারী রিপোর্ট প্রকাশ করেন। এটা তাঁদের পেশা। সেই তথ্যাদি নিয়ে অ্যাকাডেমিক স্তরে আলোচনা হয়। বড় বড় আসরে বিতর্কের খোরাক জোটে। এসব নিয়ে আইনসভায় বিরোধীরা সরকারকে দু-একদিন সমালোচনা ও কটাক্ষ করতে পারেন। কিন্তু সরকার তা শোনার এবং তার ভিত্তিতে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ করার প্রয়োজনই বোধ করবে বলে মনে হয় না। আমাদের আট দশকের অভিজ্ঞতা এছাড়া অন্যকিছু তো বলে না। যদি এই ধরনের তথ্যাদির ভিত্তিতে সরকার আংশিক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে নিত তাহলে বৈষম্যের ছবিটা সহনশীলতার মাত্রার মধ্যে থাকত। ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারত। প্রায় ৪ লক্ষ কোটি ডলারের জিডিপি আমাদের। সেই হিসেবে ভারতবাসীর মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় ২০ হাজার টাকার আশপাশে। কিন্তু দেশের মুষ্টিমেয় ধনী পরিবারের হাতে ধনসম্পদ জমার হিসেব সামনে এলেই অঙ্কটা আমূল বদলে যায়। দেখা যায় যে, ধনবৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে এবং বীভৎস আকার নিচ্ছে। হুরুন ইন্ডিয়ার রিপোর্ট বলছে, এবছরও দেশের ধনীতম পরিবারের শিরোপা ধরে রেখেছেন রিলায়েন্স গোষ্ঠীর কর্ণধার মুকেশ আম্বানি। তাঁদের মোট সম্পদের পরিমাণ ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বা জিডিপির ১২ শতাংশ! আদানি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ১৪ লক্ষ কোটি টাকার অধিক। অর্থাৎ আম্বানিদের সম্পদ আদানিদের দ্বিগুণ। আরও জানা যাচ্ছে, ৬০ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদের উপর মাত্র পাঁচটি শীর্ষ ধনী পরিবারের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। গত একবছরে আম্বানিদের সম্পদের পরিমাণ ১০ শতাংশ বেড়েছে। এবারও দেশের পয়লা নম্বর সম্পদশালী ব্যবসায়ী পরিবারের শিরোপা অক্ষত রেখেছেন মুকেশ। অন্যদিকে, প্রথম প্রজন্মের শিল্পোদ্যোগী পরিবারগুলির মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন গৌতম আদানিরা। ২০ শতাংশ সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে কুমার মঙ্গলম বিড়লা গোষ্ঠীর। তারা ৬.৪৭ লক্ষ কোটি টাকার মালিক। ২১ শতাংশ সম্পদ বেড়েছে জিন্দালদের। একধাপ উপরে উঠে জিন্দাল পরিবার তৃতীয় স্থানে। তবে একধাপ পিছিয়ে চতুর্থ স্থানে নেমে গিয়েছে বাজাজ পরিবার। শীর্ষ ৩০০টি পরিবার গত একবছরে প্রতিদিন ৭,১০০ কোটি টাকার সম্পদ বাড়িয়ে নিতে পেরেছে। ভারতের ধনাঢ্য শ্রেণির জন্য আরও ‘সুখবর’ হল—১০০ কোটি ডলারের বেশি (প্রায় ৮,৭০০ কোটি টাকা) সম্পদের অধিকারী পরিবারের সংখ্যা ৩৭ থেকে বেড়ে ১৬১ হয়েছে। 
সরকার এবং রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের আকচাআকছি সরিয়ে রেখেও সংগত প্রশ্ন রয়ে যায়, প্রধানমন্ত্রী যে উন্নয়নের নিত্যনতুন দাবি নিয়ে উদ্বাহু হন, তার সারবত্তা কোথায়? গরিবি দূরীকরণ, কৃষকের আয় দ্বিগুণ, শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত আয় বৃদ্ধি, বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় চাকরি বা কর্মসংস্থান হলে ধনবৈষম্যের এই রিপোর্ট প্রকাশ পেত না। এই রিপোর্টেই লেখা হতো অন্য কাহিনি। সীমাহীন বৈষম্যের এই ছবি পরিষ্কার করে দেয়, গরিবের স্বার্থরক্ষায় মোদি সরকার কিছুই করছে না। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের নামে দেশজুড়ে ছেলেখেলা চলছে। শিল্প-বাণিজ্য নীতি পরিচালিত হচ্ছে বৃহৎ পুঁজির মর্জি মেনে। ভারতের আজকের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরেছে ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টরা। এই সরকার শুরু থেকেই হুজুগ তোলা, চমক সৃষ্টি আর বুজরুকিতে হাত পাকিয়েছে মাত্র। এসব আর যাই হোক, একজনেরও পেটের ভাতের জোগান দিতে পারে না। এই পরিস্থিতিকে আম জনতার ‘অর্থনৈতিক পরাধীনতা’ ছাড়া কিছুই বলা যাচ্ছে না। আজ ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসে, এটাই আমাদের চরম আক্ষেপ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ