সংবাদদাতা, বালুরঘাট: বনেদিবাড়ির পুজোর দায়িত্ব গ্রামবাসীরা নিলেও দেবীর আরাধনায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। চারশো বছর পরও দেবীর আরাধনা ও আয়োজনে কোনও খামতি নেই। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের কংগ্রেসপাড়ার পালবাড়ির দুর্গাপুজো শুরু করে ছিলেন গৌরী পাল। প্রায় ৪০০ বছর আগে আত্রেয়ীর পাড়ে ওই বনেদিবাড়িতে ধুমধাম করে হতো দেবী দুর্গার আরাধনা। গৌরীর অবর্তমানে প্রায় ১০০ বছর আগে পালবাড়ির এই দুর্গাপুজোর দায়িত্ব নেন প্রতিবেশীরা। তারপর থেকেই বারোয়ারিভাবে প্রতিবেশীরা এই পুজো করে আসছেন।
এই পুজোর বিশেষত্ব নবমী ও দশমীর দিনে দেবীকে পান্তাভাত, বোয়াল মাছ ও আত্রেয়ীর রাইখর মাছের ভোগ দেওয়া। বাকি দিনগুলিতে অবশ্য নিরামিষ ভোগই দেওয়া হয়। পান্তা ভোগ গ্রহণ করতে প্রতিবছরই ভক্তের ঢল নামে। বনেদিবাড়ির সমস্ত নিয়ম রীতি এখনও ধরে রেখেছেন প্রতিবেশীরা। শুধু বালুরঘাট নয়, জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে পুজোর দিনগুলিতে মায়ের দর্শন করতে আসেন ভক্তরা।
পালবাড়ির মন্দির কমিটির সম্পাদক পরিমল মজুমদার বলেন, সামান্য পরিবর্তন ছাড়া এই পুজোর রীতি একইরকম রয়েছে। আগে তান্ত্রিক মতে হলেও এখন বৈষ্ণব মতে পুজো হয়।
আয়োজকদের মধ্যে অন্যতম মাধব সরকার বলেন, গৌরী পালের বংশধরদের পর এখন আমরাই মিলেমিশে দুর্গাপুজো করি। আগে যেভাবে পুজো হতো, সেভাবেই এখনও পুজো হয়।
বালুরঘাট শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে আত্রেয়ী নদী। এই নদীর রাইখর মাছ বিখ্যাত। সুস্বাদু ও জনপ্রিয় আত্রেয়ীর এই মাছ দেবীকে নিবেদন করা হতো। তারপর থেকে প্রতিবারই ভোগে রাইখর মাছ দেওয়া হয়।
এলাকাবাসীরা জানান, ওই পুজোর সূচনা এক তান্ত্রিকের হাত ধরে হয়েছিল। তিনিই আত্রেয়ীর ধারে স্থাপন করেছিলেন পঞ্চমুণ্ডির আসন। সেখানে শুরু হয় শক্তির আরাধনা। সেসময় বালুরঘাটের কংগ্রেসপাড়ার অন্যতম প্রভাবশালী গৌরী পাল। খড় ও টিনের ছাউনিতেই তিনি দেবীর আরাধনা শুরু করেছিলেন। গৌরীর পর তাঁর বংশধররা ওই পুজো করেন। বনেদি বাড়ির প্রতিপত্তি কমার সঙ্গে সঙ্গে এই পুজো বন্ধ হওয়ার মুখে পড়ে যায়। বনেদিবাড়ির উত্তরসূরীরা আর পুজো করতে না পারায় এগিয়ে আসেন প্রতিবেশীরা। দায়িত্ব নেন বনেদিবাড়ির এই দেবীর আরাধনায়। এলাকাবাসীরা চাঁদা তুলে এই পুজো একশো বছরের বেশি সময় ধরে চালিয়ে আসছেন। অন্য পুজোর মত চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা ও আকর্ষণীয় প্যান্ডেল হয় না ঠিকই কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই পুজোয় কোনও খামতি থাকে না।
কথিত রয়েছে, যে কুমারী মেয়েদের বিয়ে হতো না, তারা ওই পুজোর কাজকর্ম করলে বিয়ে হয়। নানা বিগ বাজেটের পুজোর মাঝেও এই পুজো নজর কাড়ে সবার। নবমীতে ভিড় জমে পুজো প্রাঙ্গনে। নবমীর ভোগে থাকে বিশেষত্ব। নয় রকমের ভোগের মধ্যে থাকে রাইখর ও বোয়াল মাছ। তাও পুকুরের রাইখর নয়, ভোগে প্রয়োজন আত্রেয়ীর রাইখর মাছই। পালবাড়ির এই পুজোয় এই রীতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হয়ে আসছে। পালবাড়ির দুর্গামণ্ডপ। - নিজস্ব চিত্র।