Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

শ্যামাবুড়ির আদেশে কাশীপুর পঞ্চকোট রাজপরিবারে সূচনা হয় দুর্গা-আরাধনার

পুরুলিয়া জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ কাশীপুর পঞ্চকোট রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো। কাশীপুরের রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে।

শ্যামাবুড়ির আদেশে কাশীপুর পঞ্চকোট রাজপরিবারে সূচনা হয় দুর্গা-আরাধনার
  • ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সজল মণ্ডল, রঘুনাথপুর: পুরুলিয়া জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ কাশীপুর পঞ্চকোট রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো। কাশীপুরের রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল জেলার কল্যাণেশ্বরী (শ্যামাবুড়ির) মায়ের আদেশে  প্রায় ২০০০ বছর আগে কাশীপুরের দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। দিন বদল হয়েছে। তবুও ইতিহাস যেন ফিসফিস করে কথা বলে যাচ্ছে। কাশীপুরের পঞ্চকোট রাজ পরিবারের দুর্গাপুজা তেমনি এক ইতিহাস গাঁথা। বর্তমানে রাজ পরিবারের কুলোদেবী ‘চতুর্ভুজা রাজরাজেশ্বরী দেবী’ এখানে দুর্গারূপে পুজিত হন। প্রতি বছর জিতাষ্টমীর পরের দিন মায়ের পুজো শুরু হয়। এখানে মা ১৬ দিনে ১৬ কল্পে পূজিত হন বলে অনেকে ষোড়শী নামেও ডাকেন। সেই পঞ্চকোট রাজ পরিবারের পুজো এক অপরূপ কাহিনীতে গাঁথা রয়েছে।

Advertisement

রাজ পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, পঞ্চকোটের রাজারা ধার বা ধারনগর থেকে পুরুলিয়া জেলায় এসেছিলেন। সঙ্গে করে তাঁদের কুলদেবী চতুর্ভূজা রাজেশ্বরী দেবীর মূর্তিটি এনেছিলেন। তখন পঞ্চকোটের রাজা ছিলেন কল্যাণপ্রসাদ সিংদেও। তাঁর সাথে রাজা বল্লাল সেনের কন্যা সাধনার বিয়ে ঠিক হয়। অন্যদিকে, সাধনার উপাস্য দেবী ছিলেন শ্যামাবুড়ি। বিয়ের পর সাধনা দেবী শ্যামাবুড়িকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রাজা সেই রাতে রাজকন্যার সঙ্গে দেবীকে নিয়ে যাওয়া স্বপ্নাদেশ পান। রাজা বল্লাল সেন রাজকন্যার সঙ্গে দেবীকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাজা কল্যাণপ্রসাদ ঘোড়ায় চেপে রাজবাড়ি থেকে পঞ্চকোটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে বর্তমানে আসানসোলের কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের কাছে এসে রাজার মনে হয় পিছনে ঘোড়সওয়াররা আসছে। রাজকন্যার সন্দেহ ছিল, তাঁর বাবা রাজা বল্লাল সেন আরাধ্যা দেবীকে নিয়ে যেতে দেবেন না। তাই তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ঘোড়াটি একটি নির্জন জায়গায় বেঁধে পাহাড়ের একটি গুহায় দেবীর মূর্তি লুকিয়ে রাখেন। সেই সঙ্গে তাঁরাও লুকিয়ে পড়েন। কিছু সময় পর তাঁরা দেখেন পিছনে কোনও ঘোড়সওয়ার নেই। তখন আবার মূর্তি নিতে যান। আর তখনই দম্পতি চমকে উঠেন। দেখেন, সেই সামান্য মূর্তি বিশাল আকার ধারণ করে গুহায় অবস্থান করেছে। মূর্তিটিকে কোন ভাবেই সেখান থেকে নডানো যাচ্ছে না। 
এরপর রাজা ও রানি ঠিক করলেন, মূর্তি না নিয়ে তাঁরা পঞ্চকোট রাজ্যে যাবেন না। তাই রাজ দম্পতি উপবাস শুরু করেন। এবং সেখানেই থাকা শুরু করেন। রাতে দেবী তাঁদের স্বপ্নাদেশ দেন। দেবী বলেন, আমি এখানে অধিষ্ঠান করার জন্যই এসেছি। বহু আগে থেকে এই এলাকায় আমার অবস্থান ছিল। তিনি রাজ দম্পতিকে কেবলমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি দেবী বলেন, কল্যাণ প্রসাদ আমাকে আনতে সাহায্য করেছে। তাই তাঁর নাম অনুসারে আমার নাম হবে ‘কল্যাণেশ্বরী’। তিনি রাজাকে আদেশ দেন, পঞ্চকোট রাজ্যে গিয়ে তাঁদের কুলদেবী রাজরাজেশ্বরীকে দুর্গা হিসেবে পুজা করার। এবং কথা দেন, ষষ্ঠীর দিন তিনি নিজে সেখানে যাবেন। দেবীর আগমন রাজপ্রসাদের হয়েছে কিনা তার জন্য তিনি প্রতিবছর মহাষ্ঠমীর দিন পায়ের চিহ্ন রেখে আসবেন। আর সেই থেকে রাজবাড়িতে শুরু হয় দুর্গোৎসব।
রাজবংশের প্রবীণ সদস্য সৌমেশ্বর লাল সিংদেও বলেন, কাশীপুরের রাজবংশের পুজো এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন পুজো। এখানে পুজোয় একটা আলাদা উন্মাদনা থাকে। দেবীর কথামতো দুর্গাষ্টমীর দিন বলির পর সিন্দুর রাখা হয়। সেই সিন্দুরে এখনো দেবীর পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। জিতাষ্টমীর পরের দিন নবমী থেকে দেবীর বোধন শুরু হয়। এখানে দেবীর প্রসাদের সঙ্গে মাছ নিবেদন করা হয়। মন্দিরের পুজারী গৌতম চক্রবর্তী বলেন, রাজবংশের যে যেখানে থাকুক পুজোর সময় সবাই চলে আসেন। হলুদ ছোপানো ধুতি আর গেঞ্জি পরে রাজপুরুষরা মন্দির চত্বরে থাকেন। আজও সেই প্রথা চলছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ