Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দ্বিচারিতা!

নরেন্দ্র মোদির ভারতে জন্মদিন হলেই যে কেউ কেক কাটতে পারেন? দেশের সব নাগরিকের সেই অধিকার আছে? প্রবল ক্ষমতাশালী শাসক দলের অনেকে মনে করে, সংবিধান যাই বলুক, সব নাগরিকের সবকিছু করার অধিকার নেই এদেশে! এই অলিখিত সামাজিক নিয়ম যে বা যাঁরা লঙ্ঘন করবেন, তাঁরা ‘স্পর্ধা’ দেখানোর ‘শাস্তি’ পেতে বাধ্য।

দ্বিচারিতা!
  • ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নরেন্দ্র মোদির ভারতে জন্মদিন হলেই যে কেউ কেক কাটতে পারেন? দেশের সব নাগরিকের সেই অধিকার আছে? প্রবল ক্ষমতাশালী শাসক দলের অনেকে মনে করে, সংবিধান যাই বলুক, সব নাগরিকের সবকিছু করার অধিকার নেই এদেশে! এই অলিখিত সামাজিক নিয়ম যে বা যাঁরা লঙ্ঘন করবেন, তাঁরা ‘স্পর্ধা’ দেখানোর ‘শাস্তি’ পেতে বাধ্য। যেমনটা পেয়েছে দিল্লি-লাগোয়া গ্রেটার নয়ডার বছর কুড়ির যুবক অনিকেত। ১৫ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন ছিল। পেশায় গাড়ির মেকানিক, সংসারের একমাত্র সহায় ছেলেটি সেদিন কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরে জন্মদিনের কেক কাটার তোড়জোর করছিলেন। ‘দলিত’ সম্প্রদায়ের অনিকেতের এই ‘সাহস’ দেখানো ভালো চোখে দেখেনি আম্বেদকর মহল্লার উচ্চবর্ণের একদল দুষ্কৃতী। তারা রড, হকি স্টিক নিয়ে হাজির হয়ে অনিকেতকে বেধড়ক মেরে সেখানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। সাতদিন জীবনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে শেষপর্যন্ত হার মানে যুবক। মনে হতে পারে, এটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা। আসলে মোদির ভারতে এমন ‘আচ্ছে দিনের’ নজির ভূরি ভূরি। যদি আপনি দলিত কিংবা আদিবাসী কিংবা পিছিয়ে পড়া কোনও সম্প্রদায়ের মানুষ হন, আপনার পরিচয় যদি মুসলিম বা সংখ্যালঘু হয়, তাহলে সংবিধান, আইন আপনাকে যত অধিকার, সুরক্ষাই দিক, গেরুয়া শাসকবাহিনীর চোখে আপনি বোধহয় এদেশে ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’র নাগরিক হিসাবেই থাকবেন। এর একটাই অর্থ, সব অধিকার আপনার জন্য নয়। উচ্চবর্ণের কাছে আপনাকে মাথানত হয়ে থাকতে হবে। নচেৎ জুটতে পারে ধর্ষণ অথবা মৃত্যু পরোয়ানা, যা পেণ্ডুলামের মতো দোল খাবে। এটাই বাস্তব সত্য। কারণ এই জমানায় একের পর এক দলিত নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে। বলা ভালো, বাড়ছে।

Advertisement

অনিকেতের পেটে হয়তো তেমন বিদ্যে নেই। নিতান্ত ছাপোষা এক যুবক। কিন্তু তাতে কী? মোদির ‘আচ্ছে দিনের’ সরকারে মানুষকে মাপা হবে জাতের বিচারে! সেখানে শিক্ষা, অর্থ, ক্ষমতার কোনও মূল্য নেই। সেই কারণেই নিচুজাতের বলে কর্মক্ষেত্রে দিনের পর দিন চূড়ান্ত হেনস্তা, অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হতে হয়েছে হরিয়ানার এক আইপিএস অফিসারকে! দলিত, আদিবাসী, মুসলিম হওয়ার অপরাধের যেন শেষ নেই। যোগী রাজ্যের মুজফ্‌ফর নগরের পালদি গ্রামের যুবক সানির কথা একবার স্মরণ করা যাক। গত বছরের শেষের দি঩কে এক বিকেলে গ্রামেরই উচ্চবর্ণের প্রধানের সামনে দিয়ে ‘বাইক’ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সানি। নিম্নবর্ণের একজন হয়ে উচ্চবর্ণের সামনে দিয়ে বাইক চালিয়ে যাওয়ার ‘অপরাধে’ তাঁর কপালে জোটে বেধড়ক প্রহার। পরিণতি, ঘটনাস্থলেই সানির মৃত্যু। এবার তিন বছর পিছিয়ে যাওয়া যাক। সাল ২০২২। উত্তরাখণ্ডের আলমোড়া জেলায় দলিত যুবক বিক্রমকুমার ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন। উচ্চবর্ণের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করায় বিক্রমকে অবশ্য প্রাণে মরতে হয়নি। মোদির ‘আচ্ছে দিনে’ মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কখনও অধিকারের প্রশ্ন তুলে, কখনও মিথ্যা অভিযোগে, নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে বিশেষত পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষকে। গত শনিবারও বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের ভিন্দ জেলায় এক দলিত যুবককে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, গেরুয়াবাহিনীর সনাতনী হিন্দুত্বের ভাবনা, আদর্শ ছড়িয়ে দিতে মোদি জমানায় বিশেষত বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে তফসিলি জাতি, দলিত, আদিবাসীদের উপর আক্রমণ ও অত্যাচার বেড়েই চলেছে। কেন্দ্রের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবি’র ২০২২-এর রিপোর্টেই এই তথ্য সামনে এসেছে। রিপোর্টে বলছে, নিন্মবর্ণের উপর অত্যাচারে সবচেয়ে এগিয়ে উত্তরপ্রদেশ। তারপরেই আসছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহারের মতো ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলির নাম। শুধু ২০২২ সালে নিম্নবর্গের উপর মোট আক্রমণের ঘটনার পর ৯৮ শতাংশ সংঘঠিত হয়েছে দেশের ১৩টি রাজ্যে। এরমধ্যে উত্তরপ্রদেশে ২৩.৭৮ শতাংশ, রাজস্থানে ১৬.৭৫ শতাংশ, মধ্যপ্রদেশে ১৪.৯৭ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। চিত্র বদলায়নি পরের দুই বছরেও। এককথায়, ২০১৪ সালের তুলনায় এখন আক্রমণের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বিরোধীদের মতে, এ হল আরএসএস-বিজেপির মনুবাদী ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। আসলে জাতপাত, বিভাজন, মেরুকরণ, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের মধ্যে বিরোধ, বিভেদ তৈরি করাই যাদের রাজনীতির দর্শন—তাদের ‘আচ্ছে দিনের’ প্রতিটি সকাল যে এভাবেই রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হবে—তা বলাই বাহুল্য। নরেন্দ্র মোদির সরকার দেশেরই একটা বড় অংশের মানুষকে বঞ্চিত, অস্পৃশ্য করে রেখে ‘দেশ এগিয়ে’ বলে প্রচার করছে! এর চেয়ে বড়ো অসত্য, দ্বিচারিতা আর হয় না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ