Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধামাচাপা পড়ে না যেন

১৮০টি দেশের তথ্য নিয়ে তৈরি করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে (সিপিআই) ভারতের র‌্যাঙ্ক ৯৬। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় শূন্য থেকে একশো (০-১০০) স্কেল।

ধামাচাপা পড়ে না যেন
  • ১৯ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

১৮০টি দেশের তথ্য নিয়ে তৈরি করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে (সিপিআই) ভারতের র‌্যাঙ্ক ৯৬। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় শূন্য থেকে একশো (০-১০০) স্কেল। শূন্য স্কোরের অর্থ মারাত্মক দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরের মাহাত্ম্য হল ভীষণ স্বচ্ছ বা কোনোরকম দুর্নীতি নেই। এমন মূল্যায়ন ব্যবস্থায় ২০২৪ সালে ভারতের স্কোর ছিল মাত্র ৩৮! তার একবছর আগে ভারতের স্কোর এবং র‌্যাঙ্ক ছিল যথাক্রমে ৩৯ এবং ৯৩। অর্থাৎ মাত্র একবছরের ব্যবধানে ভারত তিনধাপ নেমে গিয়েছে বা ভারতের সরকারি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা কমেছে, মানে দুর্নীতি বেড়ে গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে জানানো যায় যে, একটি মামলার রায় প্রসঙ্গে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ সরকারি প্রশাসনে যুক্ত কর্মী-অফিসারদের দুর্নীতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করে। সেটাই অবশ্য প্রথম নয়, আমাদের দেশ পরিচালনার সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা দুর্নীতি যে ক্রমে মহামারীর আকার নিচ্ছে, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিচারব্যবস্থা। দুর্ভাগ্য যে চিহ্নিত দোষীদের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও প্রশাসনিক দুর্নীতি বাগেই আনা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনামাত্রই যে ‘কুৎসা’ নয়, তা আদালতের অবস্থানে পরিষ্কার। 

Advertisement

আমাদের বাংলাও যে এই ব্যাধিমুক্ত কোনোভাবেই নয়, তাও সামনে আসে নানা রিপোর্টে ও মামলায়। যেমন এবার সামনে এল সরকারি জমি বেআইনিভাবে হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি কাণ্ড। সরকারি জমি কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাকে বিক্রি করতে গেলে রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। রাজ্য সরকারের অন্যকোনও দপ্তর বা কেন্দ্রীয় কোনও মন্ত্রককে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেওয়া জরুরি। কিন্তু এই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিভিন্ন জেলায় সরকারি জমি ব্যক্তি-মালিকদের বিক্রয় করা হয়েছে কিংবা তাদের লিজ দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে! এই অন্যায় কারবার রাজ্য মন্ত্রিসভা ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না। কিন্তু এই ‘পুকুর চুরি’ সম্ভব হচ্ছে কোন জাদুতে? প্রশাসন সূত্রের খবর, এর নেপথ্যে সক্রিয় কিছু গ্রাম পঞ্চায়েত, পুরসভা এবং রাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রিত একাধিক সংস্থা (প্যারাস্টেটাল সংস্থা)। প্রশ্ন উঠেছে, এসব সংস্থার কতিপয় শীর্ষকর্তার যোগসাজশ ছাড়া কি এই কাণ্ড চলা সম্ভব? স্বভাবতই তাঁদের এই এক্তিয়ারবহির্ভূত ভূমিকা নিয়ে রাজ্য প্রশাসন চিন্তিত। তাই কড়া পদক্ষেপের পথেই হাঁটল নবান্ন। রীতিমতো নির্দেশিকা জারিসহ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। বেআইনিভাবে জমি বিক্রয় এবং লিজ কীভাবে চলছে সেই সম্পর্কে প্রতিটি দপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করেছে নবান্ন। বর্তমানে যেকোনও সরকারি জমির বিক্রয় বা লিজ সংক্রান্ত ‘সেটেলমেন্ট’ হয় ২০১২ সালে গৃহীত ল্যান্ড অ্যালটমেন্ট পলিসির ভিত্তিতে। সরকারি দপ্তর, প্যারাস্টেটাল বডি এবং রাজ্যের সহায়তাপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বশাসিত সংস্থার জমিসহ রাজ্যের সমস্ত সরকারি জমির বিক্রয় বা লিজ প্রদানের ক্ষেত্রে ভূমিসংস্কার এবং অর্থদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ জরুরি। তার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিলমোহর দেয় মন্ত্রিসভা। কিন্তু এই পদ্ধতির মধ্যে না গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরে বোঝাপড়া করেই জমি বিক্রয় চলছে! 
এমন মারাত্মক রিপোর্ট পেয়েই নড়েচড়ে বসে নবান্ন। বেআইনি কারবার বন্ধ করার জন্য ভূমিসংস্কার দপ্তরের নির্দেশিকা জারি হয়েছে গত ২৪ এপ্রিল। অতিরিক্ত মুখ্যসচিব বিবেক কুমারের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকার সাফ কথা, মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়া সরকারি জমি বিক্রয় বা লিজ প্রদান সম্পূর্ণ নিয়মবিরুদ্ধ। এরপরই হুঁশিয়ার করা হয়েছে, যে-ব্যক্তি বা অফিসার এই কাজে জড়িত থাকবেন, তিনি বা তাঁরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়বেন। ইতিমধ্যেই নিজেদের অধীনস্থ সমস্ত বিভাগে চিঠির কপি পাঠিয়ে তথ্য তলব করা হয়েছে। এই অন্যায় কারবারের পিছনে কাদের কারসাজি চলছে সে সম্পর্কে পরিষ্কার হতেই সব তথ্য অবিলম্বে নবান্নে জমা পড়া দরকার। তবে ঠিক কোন কোন জায়গায় এমন বেআইনি জমি বিক্রয় হয়ে গিয়েছে, সেই তথ্য রাজ্য এখনই প্রকাশ্যে আনতে রাজি নয়। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি হওয়ার পরই নবান্ন সামগ্রিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই আপসহীন। আইন ভেঙে জমি হস্তান্তর রুখতে তাঁর প্রশাসন এই যে ব্যবস্থা নিচ্ছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই উদ্যোগ যেন কারও কলকাঠিতে ধামাচাপা পড়ে না যায়। কেননা এই কারবারে জড়িতদের মধ্যে বেনামে কিছু রাজনীতির কেউকেটা থাকা অসম্ভব নয়। এই সাধু উদ্যোগ থামাতে তারা চেষ্টার কসুর করবে না নিশ্চয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ