Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্প কি সত্যি যুদ্ধ থামাতে চান?

কেউ বলে, বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরের মাসি! কারও মতে, চোরকে বলে চুরি করতে, গৃহস্থকে সদা সজাগ থাকতে। মধ্যিখানে তরতরিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠে ধনকুবের রাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী অস্ত্র ব্যবসা।

ট্রাম্প কি সত্যি যুদ্ধ থামাতে চান?
  • ২২ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: কেউ বলে, বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরের মাসি! কারও মতে, চোরকে বলে চুরি করতে, গৃহস্থকে সদা সজাগ থাকতে। মধ্যিখানে তরতরিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠে ধনকুবের রাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী অস্ত্র ব্যবসা। সেখানে মোদি, নেতানিয়াহু, আসিম মুনির কিংবা জেলেনস্কি একই সারিতে। ঠিক বন্ধুও নয়, সহযোগীও নয়, প্রত্যেকে স্রেফ আধুনিক সমরাস্ত্রের সম্ভাবনাময় ক্রেতা। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে যুদ্ধের ঝনঝনানি শুরু হলে এটাই মার্কিন প্রশাসনের গড়পরতা দৃষ্টিভঙ্গি। স্ট্যান্ডার্ড এসওপি। কাউকে অস্ত্র বিক্রিই উদ্দেশ্য, কারও ক্ষেত্রে আবার ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিঃশব্দে শত্রুদমন! শ্মশানের শান্তি নয়, হানাহানি বৃদ্ধিতেই হোয়াইট হাউসের আহ্লাদ!

Advertisement

অপারেশন সিন্দুরে আমেরিকার প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া ভূমিকাই বলে দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদি আগাগোড়া বন্ধু চিনতে ভুল করেছেন। ‘হাউডি মোদি’,  ‘নমস্তে ট্রাম্প’ কিংবা ‘আগলি বার ট্রাম্প সরকার’ স্রেফ কথার কথা। বিপণনের ট্যাগলাইন হিসেবে শুনতে ভালো। টেক্সাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে আগাম তাঁর জয়ের ঘোষণা করেও বাড়তি ছিটেফোঁটা আশা করা মূর্খামি। কঠিন এই বাস্তবটাকে ভুলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যতই সোচ্চারে বলার চেষ্টা করুন মার্কিন হস্তক্ষেপে গত ১০ মে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়নি, হোয়াইট হাউস কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত ভাষ্য দিয়ে ভারতের রক্তচাপ বাড়িয়েই চলেছে। ইনিয়ে বিনিয়ে একবার নয়, গত পাঁচ সপ্তাহে অন্তত চোদ্দোবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারত পাক উত্তেজনা থামাতে তাঁর সাফল্যের কথা জাহির করেছেন। এমনকী জি-৭ বৈঠকে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে মোদিজির সঙ্গে ৩৫ মিনিটের দীর্ঘ ফোনালাপের পরও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, তিনিই পরমাণু সংঘাতের মুখ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দুই শক্তিধর রাষ্ট্রকে রক্ষা করেছেন। চেষ্টা করেও বিদেশমন্ত্রক সেই ন্যারেটিভ বদলাতে পারেনি। আপনি যদি যুদ্ধবাজ হন, ইসলামাবাদকে তো প্রয়োজন হবেই!
এফবিআই কি পহেলগাঁও হামলার মূল কারিগরের নাম ট্রাম্পের কানে কানে বলেনি? নাকি ইদানীং তিনি সব ভুলে যাচ্ছেন? পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে বেনজিরভাবে হোয়াইট হাউসে ডেকে দেশটার সর্বময় কর্তা শুধু আপ্যায়নই করেননি, যুদ্ধ থামাতে তাঁর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নন, একজন পাকিস্তানি জেনারেলকে ডেকে এই নাটকের অর্থ বুঝতে দেরি হওয়ার কথা নয়। কে না জানে, ভারতের মাটিতে একের পর এক সন্ত্রাসবাদী হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানি সেনার সরাসরি মদত রয়েছে। সেদেশের সেনা ও আইএসআই একযোগে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ যেমন দেয় তেমনি সীমান্ত পেরিয়ে হামলার ব্লুপ্রিন্টও চূড়ান্ত করে। মার্কিন গোয়েন্দারাও বারে বারে স্বীকার করেন, বিশ্ব সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর পাকিস্তানই। তবু রহস্যজনকভাবে চলতি জুন মাসের শেষ পর্বে পৌঁছেও মার্কিন বিবৃতিতে সেনাপ্রধান মুনিরের সঙ্গে এক পঙ্‌ক্তিতে উচ্চারিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম। এই কি দশবছরে সর্বাধিক ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পকে ‘তোয়াজ’ করার প্রতিদান? কারণে অকারণে ট্রাম্পের কাছে ছুটে যেতে কার্পণ্য করেননি ৫৬ ইঞ্চি। কিন্তু ভবি ভোলবার নয়! উপমহাদেশে ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা জিইয়ে রাখার মধ্যেই মার্কিন অস্ত্র কারবারের বসন্ত! ক্রোয়েশিয়া সফর নির্ধারিত আছে বলে এ-যাত্রায় মোদিজি হোয়াইট হাউসের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন বটে। না-হলে একই দিনে ট্রাম্পের দুয়ারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পাক সেনাপ্রধানের পদচিহ্ন আঁকা হতো, যা নয়াদিল্লির পক্ষে মোটেই খুব স্বস্তির হতে পারে না। পাকিস্তানি সেনার পিঠ চাপড়ানোর আসল উদ্দেশ্য ঘুরিয়ে ভারতকেই চাপে রাখা। এক সময় পারভেজ মোশারফকেও আমেরিকা কম প্রশ্রয় দেয়নি। তবু মোশারফ প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন। আসিম মুনির তো নেহাতই সেনাপ্রধান! 
হোয়াইট হাউসের অজানা নয়, টুইন টাওয়ারে হামলার পর ওসামা বিন লাদেন নিরাপদে আশ্রয় পেয়েছিলেন পাকিস্তানেই। পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন নিরীহ পর্যটক হত্যা নিয়ে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ করেনি ট্রাম্প প্রশাসন। ভারত ও পাকিস্তানের ১০০ ঘণ্টার টানটান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাময়িক ছেদ এলেও দু’পক্ষই প্রতিনিয়ত সম্মুখসমরে। একে অপরের দিকে বাক্যবাণ, গর্জন নিক্ষেপ করেই চলেছে। চীনের মদতে আরও ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করছে মুনিররা। বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডার তলানিতে তবু ঋণ করে প্রতিরক্ষা খরচ বাড়ানো হচ্ছে। ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট, আর্থিক অসুবিধা স্বীকার করেও আরও বড় সংঘাতের জন্য তৈরি হচ্ছে আসিম মুনির ও শাহবাজ শরিফ জুটি। এ কাজে চীন তো বটেই আমেরিকারও প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের কথা অস্বীকার করা যায় না। মুনিরকে ডেকে ট্রাম্প সাহেব ঠিক কী বলেছেন কেউ জানে না। কেউ বলছেন, ইরানে হামলা চালাতে পাকিস্তানকে বেস হিসেবে ব্যবহার করতে চায় হোয়াইট হাউস। যদি তাই হয় সেক্ষেত্রে ইসলামাবাদ কি পাল্টা কাশ্মীর ইস্যুতে ওয়াশিংটনের প্রশ্রয় ও মদত চাইবে না? দু’য়ে দু’য়ে চার হলে তার নিটফল ভারত–পাক সীমান্তে আগামীতে আরও অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি। এক্ষেত্রেও আমেরিকা কী করে দাবি করবে, দাদাগিরি নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠাই তার একমাত্র লক্ষ্য। বেশ বোঝা যাচ্ছে, নিজের প্রয়োজনে পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখতেই গত ১০ মে সংঘর্ষ বিরতির আগাম ঘোষণা করে হোয়াইট হাউস! 
অথচ জঙ্গি দমনের অঙ্গীকার করেই গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার শপথ নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাঁচমাস পর বিশ্বজুড়ে সমরাস্ত্রের আস্ফালন, যুদ্ধ জিগির কমেনি বরং বেড়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, প্রতিটি ক্ষেত্রেই উত্তেজনা বৃদ্ধিতে নিঃশব্দ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে আমেরিকা। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ তিনবছর অতিক্রান্ত হয়ে আরও ভয়ঙ্কর আকার নিচ্ছে। জঙ্গিদের পথপ্রদর্শক পাক সেনাপ্রধান গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজ সম্পূর্ণ করতে পারলেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে শুকনো মুখেই ফিরতে হয়েছে। কথা কাটাকাটির মধ্যেই তাঁকে ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। তিন বছরের যুদ্ধও থামেনি। এর কারণ অত্যন্ত সহজ ও সরল। রাশিয়া বা ইউক্রেন কেউই নিঃশর্ত মার্কিন হস্তক্ষেপ মেনে নিতে রাজি নন। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রশাসন একতরফা ইজরায়েলকে মদত দিয়ে চলেছে। যার ফলে নতুন করে ইরান ও ইজরায়েল যুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ইজরায়েলকে শুধু সাহায্য ও সমর্থন করেই ট্রাম্প থামেননি, খোলাখুলি ইরানের প্রধান খামেনেইকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন। শান্তি চাইলে এভাবে কোনও রাষ্ট্রপ্রধানকে হুমকি দেওয়া যায়? 
ইরানও নাছোড়। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমার বদলে আগুন ছড়াতে বাধ্য। আমেরিকার এই আগুন নিয়ে খেলার বড় মূল্য চোকাতে হবে বিশ্বকে। এমনও প্রচার হচ্ছে, ইজরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ইরানের ৮৬ বছরের বৃদ্ধ নেতা খামেনেইর নাকি স্মৃতিভ্রংশ হয়ে গিয়েছে। তিনি নিজে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেননি, তাঁকে অপসারিত করা হয়েছে। সপরিবারে বাঙ্কারে এখন লুকিয়ে। যদিও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, খামেনেই কোথায় আছেন, তিনি জানেন। একবার বলা হচ্ছে, খামেনেইকে খতম না করে আলোচনার সুযোগ দিতে চান। আবার বলা হচ্ছে, ইরানকে সবক শেখানোর মার্কিন ব্লুপ্রিন্ট তৈরি। শুধু ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষা। তবে কি ইরাকের একদা স্বৈরশাসক সাদ্দাম হুসেনের মতো খামেনেইকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে খতম করতে চায় হোয়াইট হাউস? ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, খামেনেইকে হত্যা করলেই সংঘাতের অবসান ঘটবে। সেটাই কি মার্কিন প্রশাসনের নির্দেশ? জুনিয়র বুশের আমলে সাদ্দাম হুসেনকে খতম করেছে আমেরিকা। সেটা ছিল ২০০৬ সাল। আবার বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে গোপন আস্তানায় ঢুকে ওসামা বিন লাদেনকে নিকেশ করে পেন্টাগন। সেটা ছিল ২০১১ সাল, ৯/১১’র বদলা। এবার কি তাহলে ‌‌ইজরায়েলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে খামেনেইয়ের পালা। তারপরও বলতেই হবে আমেরিকা শান্তির দূত, দু’শো পায়রা ওড়াও!
এই পর্যন্ত ওয়াশিংটনের স্ক্রিপ্টে সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু গোল বাধল রাশিয়া ও চীন বদলে যাওয়া পটভূমিতে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে যাওয়ায়। ক্ষমতার এই নতুন অক্ষরেখা কিন্তু স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইরানে মার্কিন আগ্রাসন হলে তা নিমেষে ব্যাপক আকার নেবে। এই মারাত্মক বিপদ থেকে আমি আপনি কেউই খুব দূরত্ব বাঁচিয়ে থাকতে পারব না। তেলের দাম বাড়বে। তছনছ হবে অর্থনীতি। এমনকী, তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আকারও নিতে পারে! রাশিয়ার পরমাণু শক্তি কর্পোরেশনের প্রধান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইজ়রায়েল হামলা চালালে পরিণতি চেরনোবিলের মতো হতে পারে! প্রায় চারদশক আগে দু’-দু’টি ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চেরনোবিলের পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকায়। মস্কোর স্পষ্ট বক্তব্য, ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামোর উপরে হামলার অর্থ, গোটা দুনিয়াকে বিপর্যয়ের সামনে দাঁড় করানো। বলা বাহুল্য, ইরানের ওই পরমাণু চুল্লি গড়ে উঠেছে রাশিয়ারই সাহায্যে। 
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিশ্চয়ই অজানা নয়, আধুনিক যুদ্ধে কেউ জয়ী হন না। রমরমা অস্ত্র কারবার চলে। মানুষ মরে। সর্বস্ব হারিয়ে গরিব আরও গরিব হয়। রুজি, রোজগার, মাথা গোঁজার আশ্রয় হারিয়ে যায়। শত শত শিশু অনাথ হয়। এই সমস্যা ধনী আমেরিকার নয়, গরিব তৃতীয় বিশ্বের। নিরাপদ দূরত্ব থেকে ধ্বংস আর মৃত্যুমিছিল ভাঙিয়ে মুনাফা কামাতে বাধা কোথায়? তারপরও তিনি হয়তো পাকিস্তানের প্রস্তাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবেন। সবাই বাহবা দেবেন। শাহবাজ, মুনির নেতানিয়াহুরা ছুটে যাবেন বিরাট মালা হাতে। অনেক আহ্লাদ দেখবে বিশ্ব। তবে যুদ্ধ, হানাহানি, ক্ষমতার উলঙ্গ প্রদর্শন যে সহজে থামবে না তা হলফ করেই বলতে পারি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ