Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আমরা কি জুয়েল রানা হতে চাই?

মুসখুরাইয়ে... ইয়ে লখনউ হ্যায়! নবাব-শহরের ব্যাপারে এই প্রবাদটা চিরকালীন। থাকবে নাই বা কেন? এর আড়ালে যে রয়েছে নবাবি সৌজন্য, মুখে লেগে থাকা খানাপিনা, আর শায়েরি।

আমরা কি জুয়েল রানা হতে চাই?
  • ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: মুসখুরাইয়ে... ইয়ে লখনউ হ্যায়! নবাব-শহরের ব্যাপারে এই প্রবাদটা চিরকালীন। থাকবে নাই বা কেন? এর আড়ালে যে রয়েছে নবাবি সৌজন্য, মুখে লেগে থাকা খানাপিনা, আর শায়েরি। ৩০০ বছর আগের মীর তাকি মীর, মির্জা শওক লখনউভি হতে পারেন, কিংবা ঊনবিংশ শতকের মজাজ লখনউভি, হসরত মোহানি, মুনাওয়ার রানা। এই শহরেরই কলম থেকে বেরিয়েছিল অমরত্বের দিকে ধেয়ে চলা দু’টি লাইন—‘জিন্দেগি, ক্যায়সি হ্যায় পহেলি হায়ে...’। সেই গীতিকারের নাম ছিল যোগেশ। এই শহরেই ঘুরতে গেলে সিংহভাগ ট্যুরিস্টের মন আনচান করে আমিনাবাদের জন্য। সেখানে গেলেই মিলবে তুন্ডে কাবাব। লখনউয়ের শান। পেহচানও। আর একবার ইদ্রিশের বিরিয়ানি খেতে যেতেই হবে। কিন্তু যদি সেই গলিতে একবার যাওয়ার মুখেই দেখেন, লম্বা পাহারা? বানানো গল্প নয়। এই বাংলারই এক ট্যুরিস্টের অভিজ্ঞতা। ভেবেছিলেন সপরিবারে যাবেন পুরানো লখনউ চকের ‘ইতর গলি’র দিকে। তুন্ডে কাবাব খেতেই। কিন্তু গলির মুখেই তাঁদের আটকে দেওয়া হল। মাথায় ‘টিকা’, গলায় গেরুয়া উত্তরীয় জাতীয় কিছু। প্রথম প্রশ্ন, ‘হিন্দু তো? তাহলে এদিকে কেন?’ এমন একটা প্রশ্ন সেই ভদ্রলোক আশাই করেননি। তাও উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কাবাবের দোকানে যাচ্ছি।’ মাথা নেড়েছিল সেই ‘পাহারাদার’রা। ‘যাওয়া যাবে না। অন্যদিকে যান। নতুন লখনউ দেখুন। এই এলাকা আপনাদের জন্য নয়।’ আবার ধাঁধা লেগেছিল তাঁর। আমাদের জন্য নয় মানে? হাই সিকিওরিটি? রেস্ট্রিক্টেড জোন? এই দেশে এমন কোনও গলি, কোনও মহল্লা আছে নাকি, যেখানে সাধারণ মানুষ যেতেই পারবে না? সংবিধানে এমন কোনও ধারা আছে নাকি, যেখানে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বাধ্যবাধকতা চাপানো আছে? উত্তর হল, না নেই। তা সত্ত্বেও পাহারাদাররা রক্তচক্ষু বাগিয়ে অলিতে গলিতে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি, সারাদিন ঘোরাঘুরির পর ফিরলে হোটেল মালিকও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করছে, ‘ওই গলিতে গিয়েছিলেন নাকি? কী খেলেন?’ মানে শুধু পাহারাদার নয়, নজরদারও রয়েছে। বাংলা থেকে আসা ট্যুরিস্ট কোথায় গেল, কী খেল... সব দেখছে তারা। ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং।’ এক মুসলিম অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সেই ভদ্রলোক—‘যাবেন পুরানো লখনউ? কোথায় ভালো কাবাব পাওয়া যায়, সেখানে নিয়ে যেতে হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়েছিল ‘তারা’। ঘিরে ধরেছিল অটোওয়ালাকে... ‘কী বলছিলি ওদের?’ মাথা নিচু করে সেই চালক জানিয়েছিলেন, ‘কিছু না। ওঁরাই জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি কোথাও নিয়ে যাচ্ছি না।’ 

Advertisement

এই হল এখন লখনউয়ের চিত্র। এখানে এখন ‘মুসখুরানে’ বা একগাল হাসির মতো অনেক কিছু আর খুঁজে পাওয়া কঠিন। এটাই গোটা উত্তরপ্রদেশের চিত্র। উত্তরাখণ্ডেরও। যোশিমঠ, উখিমঠ, হৃষিকেশ, হরিদ্বার... এই পুরো রুটে আমিষ খাবার খুঁজে পাওয়া যাবে না। সপরিবারে ঘুরতে যাওয়া এক বাঙালি তাঁর মেয়ের জন্য মুরগির মাংস খুঁজে পেয়েছেন পাঁচদিন পর। তাও হৃষিকেশের আগে রাস্তার ধারের এক ধাবায়। ৪০ মিনিট অপেক্ষার পর। গোটা রাজ্যে যেখানেই আমিষ খাবারের কথা তাঁরা জিজ্ঞেস করেছেন, সেখানেই তাঁর দিকে এমনভাবে লোকজন তাকিয়েছে যেন মেশিনগান চাওয়া হচ্ছে। এমনকি হরিদ্বারে দাদা-বউদির হোটেলও এখনও ‘মাছহীন’, সম্পূর্ণ শাকাহারী। মানুষ দেখছে। মাথা নত করে মেনেও নিচ্ছে। কারণ তাদের বাঁচতে হবে। ছেলেমেয়েকে বড় করতে হবে। তার জন্য একঘরে হয়ে গেলে চলবে না। ‘অকাল মৃত্যু’ও কাঙ্ক্ষিত নয়। ডবল ইঞ্জিন মানেই ‘উন্নয়ন’ কতটা জানা নেই, কিন্তু নীতি পুলিশগিরি অবশ্যই। তারা পাহারা দেবে, নজরদারি করবে, আর মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপও। এই জাতীয় প্রাণীদের সামনে বাংলা বলা মানে যে বাংলাদেশি হবে, তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তাই যে ওড়িশা এই দশ বছর আগে পর্যন্তও বাঙালির দ্বিতীয় ঘরবাড়ি ছিল, সেই রাজ্যে আজ প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও বাংলাভাষী আক্রান্ত! কখনও নজরুল ইসলাম, কখনও রফিকুল শেখ, কখনও জুয়েল রানা। কী অপরাধ ছিল তাঁর? রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়েছিলেন ওড়িশার সম্বলপুরে। পলাশ, আরিকদের সঙ্গে ভাড়ায় থাকতেন একই বাড়িতে। সেদিন ঘরে বসেই গল্প করছিলেন তাঁরা। চলছিল রাতের রান্না। হঠাৎ ঘরে ঢুকে আসে জনা পাঁচেক ‘পাহারাদার’। তাঁদের সরাসরি বাংলাদেশি বলে দেগে শুরু হয় গালিগালাজ। পরিচয়পত্র দেখিয়েছিলেন জুয়েল। কিন্তু তারা ‘ওসব’ দেখতে চায়নি। কোনওমতে পালিয়ে যান পলাশ, আরিক। কিন্তু জুয়েল পারেননি। তাই তাঁর পরিণতি মৃত্যু। গণপিটুনিতে। শুধুই কি ওড়িশা? অসম, দিল্লি, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র... বাঙালি মানেই বাংলাদেশি। বাঙালি মানেই ‘ঘুসপেট’। বাঙালি মানেই সেক্যুলার... মডার্ন হিন্দুত্ববাদে যার কোনও জায়গা নেই। বাল্মীকি রামায়ণে রাম আমিষ খেতে পারেন, এখন তিনি নিরামিষাশীই। ধর্মস্থান মানে গোটা রাজ্যে... অন্তত ওই শহরের ১০ কিমি রেডিয়াস পর্যন্ত আমিষ ‘নিষিদ্ধ’ হতেই হবে। ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে। ভূগোলও। বদলে যাচ্ছে শহরের নাম। পরিচয়। সাজসজ্জা। মোগলসরাই হোক বা লখনউ, ঘুরতে যান... কিন্তু নতুন শহর দেখুন। নতুন নাম শিখুন। ‘পাহারাদার’দের বলে দেওয়া খাবার খান। অন্য কিছু ভাবতেও যাবেন না। তাহলে ‘ফল ভালো হবে না’। সনাতন ধর্ম তো এই শিক্ষা দেয় না! হিন্দুধর্ম সহিষ্ণুতা শেখায়, অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়। আর সেটাই হচ্ছে লাগাতার। ডবল ইঞ্জিন এই প্রবণতার ধারক ও বাহক দুটোই। একে অসহিষ্ণুতা বললে কম বলা হয়। বরং অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এই ধারাকে একটাই শব্দে বর্ণনা করা যায়—বর্বরতা। কারণ, এরা শুধু দেশের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা বা খাওয়া-দাওয়া নয়, বেঁচে থাকার অধিকারও কেড়ে নিচ্ছে। অথচ, ডবল ইঞ্জিন প্রশাসন এসবে ‘মাথা ঘামাতে’ নারাজ। ভাবটা এমন, ক্ষতি তো কিছু হচ্ছে না! লোকজন মরে গেলে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু গ্রেপ্তার তো হচ্ছে! ব্যাস! এতেই শেষ? এই প্রশ্ন ঘুরছে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের আকাশে-বাতাসে। যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন গান্ধীজি, আম্বেদকর... এ দেশ কি সেই দেশ? অটলবিহারী বাজপেয়িজিও কি এই দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন? তিনি তো গণতন্ত্রেই বিশ্বাসী ছিলেন। শাসকের সঙ্গে বিরোধীর সমান গুরুত্বে আস্থা ছিল তাঁর। গোধরা পরবর্তী সংঘর্ষের পর গোটা বিশ্বের সামনে তাই তিনি আমাদের আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজধর্ম মনে করিয়ে দিতে পেরেছিলেন। আজকের নতুন ভারতে রাজধর্মের সংজ্ঞাও কি বদলে গিয়েছে? এখন তো সমীকরণ একটাই—আমরা ক্ষমতায়। আমাদেরই মুলুক। এখানে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে চিকেন প্যাটি বিক্রেতাকে পর্যন্ত চরম হেনস্তার মুখে তাই পড়তে হয়। গরিব মানুষের মেহনত, তাঁর পুঁজি ছুড়ে ফেলা হয় মাটিতে। এই বাংলায় ‘পাহারাদার’রা সরকারে নেই... তা সত্ত্বেও। আমরা এরপরও তাদের মধ্যে বিকল্প খুঁজে বেড়াই! সাহস আছে বটে আমাদের। কিন্তু হ্যাঁ, একটা কথা বলতেই হয়... দূরদর্শিতা নেই। এতকিছু দেখার এবং জানার পরও না। এই শ্রেণির কাছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারও তাই দু’চক্ষের বিষ হয়ে যায়। কেন? বাড়ির মা-বোনেদের হাতে কয়েকটা টাকা আসছে বলে? সেই টাকা দিয়েই তো কোনও মায়ের ছেলের বই হয়, কোনও স্ত্রী’র স্বামীর চিকিৎসা। সেটা কেন নজরে আসে না? কন্যাশ্রীর টাকা তারা ঘুষ হিসাবে দেখে। অথচ এই কন্যাশ্রীর জন্য যে কত হাজার ছাত্রী স্কুলছাড়া হল না! সেটা কেন নজরে পড়ে না? সার্বিক উন্নয়ন আমরা সবাই চাই। রাস্তাঘাট, পানীয় জল, বিদ্যুৎ। আর হ্যাঁ, সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা, মহার্ঘভাতাও। কিন্তু তা নিশ্চিতভাবে অস্তিত্ব এবং অধিকার বিপন্ন করে নয়। 
সরস মেলায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার খাবারের স্টল দিয়েছেন তাঁরা। প্রত্যেকেই গৃহবধূ। কেউ ময়দা মাখছেন, কেউ ভাজছেন, কেউ প্যাকিং করছেন। পাঁচ-ছ’জন একসঙ্গে। আর দাঁড়িয়ে সবটা তদারকি করছেন নীলিমা হালদার। বাড়ি লক্ষ্মীকান্তপুর। শুধু তদারকি নয়, মা-বোনদের সঙ্গে কাজে হাতও লাগাচ্ছেন তিনি। শুধোলাম, বাড়ি যাচ্ছেন? নাকি এখানেই থাকছেন? নীলিমাদেবী একগাল হেসে বললেন, ‘বাড়ি যাই না। এখানেই থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সরকার। একেবারে মেলা শেষে যাব।’ কিছুক্ষণ চুপ করেই আবার হাসলেন তিনি... ‘এই যে দেখছেন, এরা সবাই আমার টিমের মেয়ে। সবাই সংসার ছেড়ে এসেছে। আমি না হয় বিয়ে থা করিনি। কিন্তু এদের ফেলে যাই কীভাবে? এরা যে আমার টিম। আমার গোষ্ঠীর লোক। স্বনির্ভর গোষ্ঠী।’
নীলিমা হালদারের ‘আমার টিম’ শব্দদুটো উচ্চারণ করার মধ্যে ফেটে বেরোচ্ছিল একটা অদ্ভুত তৃপ্তি। গর্ব। তাঁরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। স্বনির্ভর হয়েছেন। লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে নিউটাউন এসেও অবাধে ব্যবসা করছেন তাঁরা। আয় করছেন। সংসার টানছেন। আমরা কি এঁদেরও দেখতে পাই না? হিন্দি-উর্দু এলে এঁরা কিন্তু অকপটে বলতে পারতেন... ‘মুসখুরাইয়ে, ইয়ে ডবল ইঞ্জিন নেহি হ্যায়।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ