গালভরা গণতন্ত্রের কোনও মূল্য নেই। সেটা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের বেলাতেও সত্য। গণতন্ত্রের কোয়ালিটি নির্ভর করে তার অনুশীলনের ধরনের উপর। আমাদের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংসদীয় গণতান্ত্রিক মডেল উপহার দিয়েছে এবং গণতন্ত্রের অনুশীলনে স্বীকৃত হয়েছে বহু দলের অংশগ্রহণ। বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অঞ্চলের সমন্বয়ে ভারত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন ভারতের এই বহুত্বের সাধনা অক্ষত ও অব্যাহত রাখতে দেশজুড়ে চাই প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা। আমাদের প্রতিটি সরকার (স্থানীয় সরকার, রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার) প্রত্যক্ষ ভোটদানের মাধ্যমে গঠিত হয়। ভারতে এই মুহূর্তে ভোটার সংখ্যা কমবেশি একশো কোটি! এত সংখ্যক দূর, এর সামান্য এক ভগ্নাংশ মানুষের রায় নিয়েও সরকার গঠন করার কথা বহির্ভারত ভাবতেই পারে না। আর এই দুরূহ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ভারতকে প্রতিনিয়ত অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। ভোট জালিয়াতি এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের ভয় পদে পদে। এই বাধা নানা প্রকারে অতিক্রম করে নির্বাচন পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) উপর।
ইসিআই একটি স্বশাসিত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ইসিআই খুব কম সময়েই তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সমর্থ হয়েছে। বস্তুত টি এন সেশনের আগে কোনও নির্বাচন কমিশনার সম্ভবত জানতেনই না, এই সংস্থাটির প্রকৃত ক্ষমতা কী এবং এই সংস্থার উচ্চতা কতটা? ফলে নানা সময়ে শাসক দল ইসিআই’কে তার চাহিদামতো ব্যবহারের অপচেষ্টা করেছে। সেশন অবসর নেওয়ার পর ইসিআই তার রাশ তেমন ধরে রাখতে পেরেছে বলে ভরসা হয় না। কেননা, সাম্প্রতিক অতীতেও (বিশেষত মহারাষ্ট্র বিধানসভার নির্বাচন) কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীরা গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। তার নিরসন হওয়ার পূর্বেই, মাসকয়েক আগে ভোটার তালিকায় কারচুপির ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার তালিকায় একাধিক ভিন রাজ্যের মানুষের নামধাম পাওয়া গিয়েছে। ওই কেলেঙ্কারি ঘটানো হয়েছে একই এপিক (ভোটারের সচিত্র পরিচয়পত্র) নম্বর ব্যবহার করে। সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়ার পূর্বেই দিনকয়েক আগে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও একগুচ্ছ অভিযোগ সামনে এনে একযোগে মোদি সরকার, বিজেপি এবং ইসিআই’কে বিঁধেছেন। এবার সামনে এল আর এক মারাত্মক কাণ্ড: উত্তরপ্রদেশের ভোটার তালিকায় নাম জ্বলজ্বল করছে। তাঁরা গত লোকসভা নির্বাচনে যোগীরাজ্যে ভোটও দিয়েছেন। অথচ বিহারের নতুন খসড়া ভোটার তালিকাতেও তাঁদের নাম! ইন্টেনসিভ রিভিশনের পর বাল্মীকিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের তালিকা পরীক্ষা করে পাঁচ হাজারের বেশি এমন ভোটারের নাম মিলেছে, যাঁরা আগে থেকেই রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকার ভোটার তালিকায়। এর মধ্যে সহস্রাধিক ভোটারের নাম, নিকটাত্মীয়ের নাম ও বয়স দুটি তালিকাতেই হুবহু এক। তাঁদের শুধুমাত্র এপিক নম্বর ও ঠিকানা আলাদা। আর বাকি ভোটারদের নাম ও নিকটাত্মীয়ের নামের কয়েকটি অক্ষর ও বয়স সামান্য বদল করে বিহারের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনের (এসআইআর) পর বিহারের খসড়া ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। এর আগে ‘০’ নম্বর ঠিকানায় বিহারের প্রায় তিন লক্ষ ভোটারের নাম পাওয়া গিয়েছিল। সেই বিতর্ক সামলে ওঠার আগেই যোগ হল এক নয়া কেলেঙ্কারি! নিয়ম অনুযায়ী, একই ব্যক্তির নামে আলাদা এপিক নম্বর থাকার কথা নয়। থাকলেও তা আইনবিরুদ্ধ। অথচ ইউপি’র বহু ভোটারের নাম হঠাত্ চলে এল বিহারের তালিকায়!
এর সদুত্তর নেই কমিশনেরই কাছে। এসআইআরের নামে ভোটার তালিকায় কারচুপি নিয়ে বিরোধীরা অভিযোগ করে চলেছেন গোড়া থেকেই। সন্দেহ জাগছে, স্থানীয় কিছু প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবেই কি ভিন রাজ্যের ভোটারদের নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বিহারের তালিকায়? বিহারে বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ২৪৩। যদি একটিমাত্র কেন্দ্রেই পাঁচ সহস্রাধিক এমন ভূতুড়ে ভোটার আবিষ্কৃত হয়, তাহলে সারা বিহারে কী কাণ্ড হয়েছে তা অনুমেয়! এই কেলেঙ্কারির পর বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কোথায়? দুটি তালিকায় নাম থাকা নিয়ে ইসিআইয়ের দিল্লি ও বিহার অফিসে লিখিত প্রশ্ন করেও জবাব মেলেনি। কমিশনের জনসংযোগ আধিকারিক অশোক গয়াল অবশ্য বলেছেন, ‘অসংগতি যাই থাক, তা নিয়ে আপত্তি জানানোর সময় রয়েছে।’ কমিশনের এই বক্তব্যকে সদুত্তর বলা যাবে না, দায় এড়াবার চেনা কৌশলমাত্র। কমিশন এরপর বাংলায় এসআইআর করার জন্য হাঁকপাঁক করছে। স্বভাবতই উদ্বেগ স্থানান্তরিত হয়েছে আমাদের মনেও। তবে একটাই ভরসা, জননেত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে একজনও প্রকৃত ভোটারকে বঞ্চনা করার চেষ্টা তাঁর দল ও সরকার মানবে না। নিজ নিজ ভোটাধিকার বুঝে নিতে বাংলার প্রতিটি মানুষকেও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।